শুক্রবারের বিশেষ খবর

বিশ্ববাজারে কক্সবাজারের 'পোয়া শুঁটকি'

প্রকাশ : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  গাজী মুনছুর আজিজ

বাঁকখালী নদী তার দীর্ঘ পথচলা শেষ করে নীল জলরাশির বঙ্গোপসাগর স্পর্শ করেছে, সেই মোহনার নাম নুনিয়াছড়া। পর্যটন নগরী কক্সবাজারের অন্যতম প্রবেশদ্বার। জলপথের এ মুখটি একদিকে যেমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা, অন্যদিকে তেমনি মানুষের নিরন্তর কর্মব্যস্ততায় মুখর। একদিকে বিশাল সমুদ্রের গর্জন আর অন্যদিকে নদীর শান্ত প্রবাহের এক অদ্ভুত মিতালী। এখানে ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয় মানুষের আনাগোনা। ট্রলারের ইঞ্জিনের শব্দ আর জেলেদের হাঁকডাকে জেগে ওঠে পুরো এলাকা। এখানকার মানুষের সুখ-দুঃখ, স্বপ্ন আর জীবিকা— সবই এ লোনা পানি আর রুপালি মাছকে ঘিরে। দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রও এ গ্রামেই অবস্থিত। সাগর থেকে আসা তাজা মাছের গন্ধে ম ম করে চারপাশ। শুধু তাজা মাছই নয়, নুনিয়াছড়ার উত্তরদিকে গড়ে উঠেছে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ডিহাইড্রেটেড শুঁটকি শিল্প। এখানকার রপ্তানিযোগ্য পোয়া শুঁটকি বিশ্ববাজারে বাংলার এক নতুন পরিচয় তুলে ধরছে।

পোয়া মাছকে স্থানীয়ভাবে 'পোপা' বা 'পোমা' মাছও বলা হয়। এ মাছ কয়েক প্রজাতির হয়ে থাকে, যেমন : কালা পোয়া, সোনালি পোয়া, লাল পোয়া, গুটি পোয়া, লেইজ্যা পোয়া ও রোপা পোয়া। পোয়া মাছের পেটের ভেতরে থাকা বায়ুথলী অত্যন্ত উচ্চমূল্যে বিদেশে রপ্তানি করা হয়; যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে সার্জিক্যাল সুতা ও বিভিন্ন মূল্যবান কসমেটিক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। তবে আমার আলোচনার মূল বিষয় 'লাল পোয়া'। মূলত এই এক প্রকার মাছকে কেন্দ্র করেই দেশে একটি বিশাল রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে উঠেছে। পোয়া শুঁটকি রপ্তানি করে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। উপকূলীয় অর্থনীতিতে এ প্রজাতিটি শুধু একটি সাধারণ সামুদ্রিক সম্পদ নয়, বরং জাতীয় আয় বাড়াতে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী।

জেলেরা সমুদ্রে লাল পোয়া মাছ ধরার পর সেগুলোতে বরফ ব্যবহার না করে মাছের পেট চিরে লবণ দিয়ে ফিশিং বোটে সংরক্ষণ করেন। কারণ বরফ লাগলে মাছের স্বাবভাবিক পেশি ও শুঁটকির রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। কয়েকদিন মাছ শিকার শেষে তারা কারখানায় এসে মাছ বিক্রি করেন। শুঁটকির জন্য মাছের গুণগত মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে বড়শি দিয়ে ধরা লাল পোয়া মাছের গুণগত মান সবচেয়ে ভালো হয়। জাল দিয়ে ধরা মাছে অনেক সময় আঘাতের দাগ পড়ে বা রক্ত জমে যায়, যা আন্তর্জাতিক বায়ারদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না।

কারখানায় আনার পর মাছের আঁশ এবং ভেতরের পচনশীল অংশ (নাড়িভুঁড়ি ইত্যাদি) বের করে ফেলা হয়। এরপর জীবাণুমুক্ত করার জন্য মাছকে প্রায় ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়। পুনরায় ধোয়ার পর মাছগুলোকে কিছুক্ষণ পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। রোদে শুকানোর সময় মশা, মাছি বা পোকামাকড়ের উপদ্রব থেকে রক্ষা করতে বড় আকারের মশারির খাঁচা ব্যবহার করা হয়। এ পদ্ধতিতে কোনো প্রকার রাসায়নিক বা কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না। বর্তমানে সময় ও শ্রম বাঁচাতে বিভিন্ন কৃত্রিম ড্রায়ার (ব্যাসিনেট, কেবিন বা টানেল ড্রায়ার) ব্যবহার করা হচ্ছে। মাছগুলো বাঁশের তৈরি মাচার ওপর রেখে ভালোভাবে শুকানো হয়। বিদেশে রপ্তানিযোগ্য পোপা শুঁটকি উৎপাদন করতে হয় বিশেষ পদ্ধতিতে। মানসম্পন্ন না হলে এ শুঁটকি রপ্তানির জন্য অযোগ্য ঘোষিত হয়। বিদেশি ক্রেতারা (বায়ার) কারখানায় উপস্থিত থেকেই শুঁটকির গুণমান ও আর্দ্রতার মাত্রা সরাসরি তদারক করেন।

?সবশেষে শুঁটকি তৈরি হয়ে গেলে মান বা গ্রেড অনুযায়ী ১৫ কেজি করে প্যাকেটজাত করে হিমাগারে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়। এরপর গ্রেড অনুযায়ী প্যাকেজিং করা হয়। তারপর ৫ থেকে ১০ ডিগ্রি টেম্পারেচারে কোল্ড স্টোরেজে রাখা হয়। সেখান থেকে কার্টনে ভরে শিপমেন্টের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানো হয়।

পোয়া শুঁটকির উদ্যোক্তা সাইয়্যিদ মঞ্জু বলেন, খুলনা নিবাসী মোখলেছুর রহমান প্রথম হংকং ও সিঙ্গাপুরে লাল পোয়া শুঁটকির বিপুল চাহিদার খবর দেন। এ সংবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে কিছু ব্যবসায়ী কক্সবাজার থেকে এ ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগ থেকে পোয়া শুঁটকি রপ্তানি শুরু হয়। এ ব্যবসার পথপ্রদর্শক হিসেবে আবদুল মতিন ও হামিদের নাম উল্লেখযোগ্য। তখন বাঁকখালী নদীর পশ্চিম তীরে নুনিয়াছড়ায় অনেক কারখানা গড়ে ওঠে।

?প্রথম দিকের উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো হলো : আজিম মন্নান সি ফুড লিমিটেড, বে অব বেঙ্গল পাইওনিয়ার ফিশিং সোসাইটি লিমিটেড, বেক্সিমকো ফুডস লিমিটেড, বেগম অ্যান্ড কোম্পানি, কনস্পেসান সি ফুড লিমিটেড, কক্সি মেরিন প্রোডাক্টস লিমিটেড, লিয়াং সেঙ্গ মেরিন প্রোডাক্টস, এম. এ. মতিন অ্যান্ড কোং, নূর মোহাম্মদ অ্যান্ড কোং, শওকত আজীম অ্যান্ড কোং, সাহাবুদ্দীন অ্যান্ড কোং, সি ফিশিং কর্পোরেশন, ট্রেড ফায়ার ইন্টারন্যাশনাল ও জিয়া হাসান অ্যান্ড কোং ইত্যাদি। ১৯৮৩-৮৪ সালে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ ৯৩ হাজার টাকার প্রক্রিয়াজাত পোয়া শুঁটকি রপ্তানি করা হয়েছিল। এ খাত ক্রমে প্রসারিত হয়ে ২০০৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে। পরবর্তীতে মহেশখালী ফিশিং, কোয়ালিটি সি ফুডস, নয়ন ফিশারিজ, কর্ণফুলী ফিশিং, দরবার ফিশিং, এস আলম সি ফুড, আল্লাহ মালিক ফিশিং ও ফিস মার্কের মতো নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। অনেকে ভারতসহ দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা যেমন— টেকনাফ, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী ও মহিপুরে তাদের শাখা প্রসারিত করেন।

?মাছ কেনার তীব্র প্রতিযোগিতায় উচ্চমূল্যে কাঁচামাল সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানের মুখে পড়ে। অতীতে সক্রিয় থাকা প্রায় ২২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বর্তমানে কেবল নূর মোহাম্মদ অ্যান্ড কোং দৃশ্যমানভাবে টিকে আছে। তবে মহেশখালীর কৃতী সন্তান আবদুল শুক্কুর (সিআইপি)-এর 'মহেশখালী ফিশিং' বর্তমানে 'মেসার্স সাগর ফিশিং' নামে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে। তাকে এখন এ ব্যবসার অন্যতম অভিভাবক বলা যেতে পারে।

দীর্ঘ সময় এ খাতের সঙ্গে জড়িত নূরুল আমিন, আমির হোসেন সওদাগর, আনছারুল করিম, সৈয়দ আলম ও সাইয়্যিদ মঞ্জু। তারা ২০২৩ সালে 'মেসার্স শাহীন ফিশিং' নামে একটি নতুন প্রতিষ্ঠানের যাত্রা করান। পরের বছর আলাউদ্দিন তাদের সঙ্গে যুক্ত হন। তারা হংকংয়ের পাশাপাশি চীনা ব্যবসায়ীদের এ বাজারে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়; যা বাংলাদেশের জন্য একটি বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। এ যাত্রায় 'কক্সবাজার সি ফুড' তাদের সার্বক্ষণিক সহযোগিতা প্রদান করেছে। এরইমধ্যে সাগর ফিশিং ও তাদের পোয়া শুঁটকি চিনে রপ্তানি হচ্ছে। উদ্যোক্তারা জানান, তিন কেজি কাঁচা পোয়া শুঁটকি করলে ১ কেজির মতো হয়। এক মণ কাঁচা পোয়া মাছে শুঁটকি হয় ১৬ কেজি। বিদেশে পোপা শুঁটকির চাহিদা অনেক, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের তীব্র সংকটের কারণে অনেক সময় চাহিদানুযায়ী সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। ফলে সাময়িকভাবে রপ্তানির পরিমাণ কিছুটা কম দেখা যায়। হংকং ও চীনে প্রতি কেজি পোপা শুঁটকির বর্তমান দাম ৮ থেকে ১২ ডলার। পোয়া শুঁটকির দাম সোনার মতো প্রতিদিন আন্তর্জাতিক চাহিদা ও জোগানের ওপর ভিত্তি করে ওঠানামা করে।

?২০২৩ সালে তারা যখন উৎপাদন শুরু করেন, তখন কক্সবাজারে বড়শি দিয়ে মাছ ধরা বোটের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৫টি। এক সময় যা শত শত ছিল। কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জেলেরা এ পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। কারণ বড়শির টোপ বা আধার সংগ্রহ করা বেশ ব্যয়বহুল। তবে পোয়া মাছের কারখানায় বাজার মূল্যের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দামে মাছ কেনা শুরু হওয়ায় জেলেরা পুনরায় বড়শি বোটের দিকে ঝুঁকছেন। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বর্তমানে কক্সবাজারে বড়শি বোটের সংখ্যা একশ ছাড়িয়ে গেছে।

এ খাতের আধুনিকায়নে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণসুবিধা এবং বন্দরভিত্তিক দ্রুত কাস্টমস ছাড়পত্রের ব্যবস্থা করা জরুরি বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা। তারা জানান, পোয়া শুঁটকির আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং নিশ্চিত করতে পারলে কেবল এশিয়ান দেশ নয়, ইউরোপ ও আমেরিকার বিশ্ববাজারেও নতুন ক্রেতা তৈরি সম্ভব। উদ্যোক্তারা জানান, রপ্তানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা গেলে পোয়া শুঁটকি থেকে বছরে হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব।