গুলিস্তান-ফুলবাড়িয়ার বাস টার্মিনাল সরছে
* যানজট কমানোর বড় পরিকল্পনা * তিন মাসের মধ্যে চুনকুটিয়ায় অস্থায়ী টার্মিনাল * ১০ একর জায়গায় ডিপো * স্থায়ী টার্মিনালের জন্য আরও ৭৫ একর জমি * দক্ষিণবঙ্গের ১৯ জেলার বাস-ট্রাকও যাবে সেখানে
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর যানজট ও পরিবহন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে গুলিস্তান ও ফুলবাড়িয়ার বাস টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ার ঝিলমিল প্রকল্প এলাকায় অস্থায়ীভাবে এই দুই টার্মিনালের বাস স্থানান্তর করা হবে। এ জন্য সেখানে ১০ একর জায়গায় ডিপো তৈরির কাজ এরইমধ্যে শুরু হয়েছে। স্থায়ীভাবে টার্মিনাল ও ডিপো নির্মাণের জন্য পরবর্তী সময়ে আরও প্রায় ৭৫ একর জায়গা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু গুলিস্তান ও ফুলবাড়িয়ার বাস নয়, ভবিষ্যতে দক্ষিণবঙ্গগামী ১৯ জেলার সব পরিবহন, ট্রাক এবং বাদামতলী আড়তের পণ্যবাহী ট্রাকও চুনকুটিয়ায় স্থানান্তরের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ জন্য সেখানে একটি মাল্টিমডেল ট্রান্সপোর্ট হাব গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে থাকা আন্তঃজেলা পরিবহনগুলোকে এই হাবে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ গতকাল শনিবার রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনালের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন কার্যক্রম পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।
ডিএমপি কমিশনার বলেন, চুনকুটিয়ার ঝিলমিল প্রকল্পে ১০ একর জায়গায় ডিপো তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। কাজ শেষ হলেই গুলিস্তান ও ফুলবাড়িয়ার বাসগুলো সেখানে স্থানান্তর করা হবে। আপাতত স্থায়ী টার্মিনাল ও ডিপো নির্মাণের আগ পর্যন্ত ওই ১০ একর জায়গা অস্থায়ীভাবে ব্যবহার করা হবে। গুলিস্তান ও ফুলবাড়িয়ার বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের সময়সীমা সম্পর্কে জানতে চাইলে মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেন, 'আমরা সর্বোচ্চ তিন মাস সময় নিয়েছি। আশা করছি, সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে কাজটি সম্পন্ন হবে। কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুলবাড়িয়া ও গুলিস্তানের বাস সেখানে স্থানান্তর করা হবে।'
স্থায়ী টার্মিনালের জন্য ৭৫ একর : ডিএমপি কমিশনার জানান, চুনকুটিয়ার ঝিলমিল প্রকল্প এলাকায় ডিপো তৈরির জন্য ১০ একর জায়গা পাওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে এরই মধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। এর বাইরে রাজউকের মাধ্যমে আরও প্রায় ৭৫ একর জায়গা পাওয়া যাবে। ওই জায়গায় স্থায়ীভাবে টার্মিনাল ও ডিপো নির্মাণ করা হবে। তিনি বলেন, 'চুনকুটিয়াতে ঝিলমিল প্রজেক্টে ডিপো হিসেবে ১০ একর জায়গা পাওয়ার কথা রয়েছে। আমরা সেখানে ডিপোর কাজ শুরু করেছি। রাজউকের মাধ্যমে সেখানে আরও প্রায় ৭৫ একর জায়গা পাওয়া যাবে, যেখানে স্থায়ীভাবে টার্মিনাল এবং ডিপো করা হবে।' স্থায়ী টার্মিনাল নির্মাণের এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর ভেতরে আন্তঃজেলা বাস রাখার প্রয়োজন অনেকটাই কমে আসবে। বর্তমানে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বাস টার্মিনাল ও পরিবহনের অবস্থানের কারণে সড়কে বাড়তি চাপ তৈরি হয়। নতুন হাবের মাধ্যমে বাসগুলোকে রাজধানীর কেন্দ্রীয় অংশের বাইরে রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
এক হাবে দক্ষিণবঙ্গের ১৯ জেলার পরিবহন : চুনকুটিয়ার প্রস্তাবিত পরিবহন হাবকে শুধু বাস টার্মিনাল হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। দক্ষিণবঙ্গের ১৯ জেলার বাসের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের পরিবহন সেখানে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পণ্যবাহী ট্রাক এবং বাদামতলী আড়তের ট্রাকও পর্যায়ক্রমে সেখানে স্থানান্তরের কথা বলা হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার বলেন, 'সেখানে দক্ষিণবঙ্গগামী ১৯ জেলার সব পরিবহন, ট্রাক এবং বাদামতলী আড়তের ট্রাকসহ স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।' তিনি আরও বলেন, 'চুনকুটিয়াতে মাল্টিমডেল একটি ট্রান্সপোর্ট হাব হবে। দক্ষিণবঙ্গের ১৯ জেলার বাস থেকে শুরু করে সকল পরিবহন পর্যায়ক্রমে সেখানে নিয়ে যাওয়া হবে।'
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই হাব চালু হলে বিভিন্ন ধরনের পরিবহনের জন্য আলাদা আলাদা ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার সুযোগ থাকবে। আন্তঃজেলা বাস, পণ্যবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন পরিবহনকে একটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে আনা গেলে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে তাদের অবাধ চলাচল ও অবস্থান নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।
আপাতত ১০ একরে অস্থায়ী ব্যবস্থা : স্থায়ী টার্মিনাল নির্মাণ সময়সাপেক্ষ হওয়ায় তার আগেই গুলিস্তান ও ফুলবাড়িয়ার বাসগুলো চুনকুটিয়ায় নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এজন্য ১০ একর জায়গায় অস্থায়ীভাবে বাস রাখার ব্যবস্থা করা হবে। ডিপোর কাজ শেষ হলে সেখানে বাস স্থানান্তর শুরু হবে। ডিএমপি কমিশনারের বক্তব্য অনুযায়ী, স্থায়ী টার্মিনাল ও ডিপো তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এই অস্থায়ী ব্যবস্থাই ব্যবহার করা হবে। ফলে গুলিস্তান ও ফুলবাড়িয়ার বর্তমান টার্মিনাল এলাকা থেকে বাস সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া স্থায়ী অবকাঠামো তৈরির আগেই শুরু হবে। তিন মাসের সময়সীমার মধ্যে অস্থায়ী ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে জমি প্রস্তুত, ডিপোর অবকাঠামো তৈরি, বাস পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্ট পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে সমন্বয়ের কাজ একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হবে।
মহাখালীতেও শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ : গুলিস্তান ও ফুলবাড়িয়ার টার্মিনাল স্থানান্তরের পাশাপাশি মহাখালী বাস টার্মিনালের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এ জন্যই গতকাল মহাখালী টার্মিনালের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন কার্যক্রম পরিদর্শন করেন ডিএমপি কমিশনার। মহাখালী টার্মিনালের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেন, সবকিছু শৃঙ্খলাবদ্ধ নিয়মের মধ্যে পরিচালিত হোক, সেটিই তাঁরা চান। কেউ অনিয়মের চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাজধানীর বিভিন্ন টার্মিনাল ও সড়কে বাসের যত্রতত্র অবস্থান এবং যাত্রী ওঠানো-নামানোর কারণে যান চলাচলে যে বিঘ্ন তৈরি হয়, সেটি নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগের ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।
পর্যায়ক্রমে অন্য টার্মিনালেও পরিবর্তন : এ সময় সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস বলেন, রাজধানীর অসহনীয় যানজট ও সড়ক পরিবহন খাতের বিশৃঙ্খলায় নগরবাসী অতিষ্ঠ। এ পরিস্থিতির পরিবর্তন চান সবাই। তিনি বলেন, মহাখালী বাস টার্মিনালে যে পরিবর্তন আনা হচ্ছে, পর্যায়ক্রমে তা ফুলবাড়িয়া, গুলিস্তান, সায়েদাবাদ ও গাবতলী টার্মিনালেও করা হবে। অর্থাৎ রাজধানীর প্রধান বাস টার্মিনালগুলোকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে মহাখালী, গুলিস্তান, ফুলবাড়িয়া, সায়েদাবাদ ও গাবতলী— এই টার্মিনালগুলোকে কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক বাস প্রতিদিন রাজধানীতে প্রবেশ ও বের হয়। এসব টার্মিনালের ব্যবস্থাপনা ও অবস্থান নগরীর সামগ্রিক যান চলাচলের ওপরও প্রভাব ফেলে।
যত্রতত্র বাস দাঁড় করানো বন্ধের ঘোষণা : রাজধানীর সড়কে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানো-নামানো এবং সড়ক আটকে বাস দাঁড় করিয়ে রাখার সমালোচনা করেন সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। তিনি বলেন, 'এ ব্যবস্থা কেউ চায় না, আমরাও চলতে দেব না।' রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে নির্ধারিত টার্মিনালের বাইরে বাস দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানোর ঘটনা নিয়মিতই দেখা যায়। বিশেষ করে ব্যস্ত ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে বাসের এমন অবস্থানের কারণে একদিকে সড়কের কার্যকর প্রশস্ততা কমে যায়, অন্যদিকে যানবাহনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় যাত্রীদের রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে বাসের অপেক্ষা করা এবং বাস থামানোর সময় পেছনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হওয়ার মতো পরিস্থিতি। নতুন ব্যবস্থাপনায় এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
যানজট কমানোর বড় পরিকল্পনা : রাজধানীর যানজট নিরসনে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে। আন্তঃজেলা বাসগুলো রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকায় প্রবেশ করে যাত্রী ওঠানো-নামানো ও পার্কিং করার কারণে অনেক ক্ষেত্রে একই সড়কে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ তৈরি হয়। পণ্যবাহী ট্রাকের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা দেখা যায়। চুনকুটিয়ায় বড় পরিসরে পরিবহন হাব গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আন্তঃজেলা বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনকে রাজধানীর কেন্দ্রীয় অংশের বাইরে রাখার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে টার্মিনাল থেকে যাত্রীদের সহজে গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা, বাস রুটের সমন্বয়, গণপরিবহনের সংযোগ এবং টার্মিনালের ভেতরের ব্যবস্থাপনার ওপর।
বর্তমানে গুলিস্তান ও ফুলবাড়িয়া রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত পরিবহনকেন্দ্র। এসব এলাকায় বাসের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক যাত্রী, দোকানপাট ও বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের চাপ রয়েছে। ফলে টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ শুধু বাসের অবস্থান পরিবর্তন নয়, ওই এলাকার সামগ্রিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায়ও প্রভাব ফেলতে পারে।
অস্থায়ী থেকে স্থায়ী ব্যবস্থায় যাওয়ার লক্ষ্য : চুনকুটিয়ায় প্রথম ধাপে ১০ একর জায়গায় ডিপো তৈরি করে গুলিস্তান ও ফুলবাড়িয়ার বাস সরিয়ে নেওয়া হবে। পরে প্রায় ৭৫ একর জায়গায় স্থায়ী টার্মিনাল ও ডিপো নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের ১৯ জেলার বাস এবং অন্যান্য পরিবহনও পর্যায়ক্রমে সেখানে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে তিন মাসের মধ্যে গুলিস্তান ও ফুলবাড়িয়ার বাস স্থানান্তর হবে প্রাথমিক পদক্ষেপ। এর পরের ধাপে চুনকুটিয়ায় স্থায়ী পরিবহন অবকাঠামো গড়ে তোলার কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, চুনকুটিয়ার হাবকে কেন্দ্র করে দক্ষিণবঙ্গের আন্তঃজেলা পরিবহন ব্যবস্থাকে নতুন কাঠামোর মধ্যে আনা হবে। বাসের পাশাপাশি ট্রাক ও অন্যান্য পরিবহনও সেখানে স্থানান্তর করা গেলে রাজধানীর কেন্দ্রীয় সড়কগুলোতে আন্তঃজেলা ও পণ্যবাহী যানবাহনের চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে এই বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জমি ও অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে সমন্বয়, যাত্রীদের জন্য সংযোগব্যবস্থা এবং নতুন টার্মিনালে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আপাতত তিন মাসের মধ্যে ১০ একর জায়গায় অস্থায়ী ডিপো প্রস্তুত করে গুলিস্তান ও ফুলবাড়িয়ার বাস সেখানে নেওয়াই কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য।
