রূপপুরে সফল পারমাণবিক বিক্রিয়া
বিদ্যুৎ উৎপাদনে আরেক ধাপ অগ্রগতি
প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে এক ধাপ এগিয়ে গেল দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে গতকাল রোববার বেলা ৩টা ৩৪ মিনিটে সফলভাবে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এর মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের পূর্বে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির রিয়্যাক্টর প্রাথমিক 'ক্রিটিক্যাল' (সংবেদনশীল) পর্যায়ে প্রবেশ করল। চূড়ান্তভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যে চারটি প্রধান ধাপ অতিক্রম করতে হয়, এটি তার প্রথম। পারমাণবিক বিক্রিয়া বা চেইন রিয়্যাকশনের মাধ্যমে রিয়্যাক্টর কোরের ভেতরে ইউরেনিয়াম পরমাণু বিভক্ত হয়ে পারমাণবিক শক্তি তীব্র তাপ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। পরবর্তী ধাপগুলোতে এই তাপ শক্তি স্থানান্তর, যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তর এবং সর্বশেষ ধাপে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, 'প্রয়োজনীয় সব কমপ্লায়েন্স নির্দেশিকা, কারিগরি প্যারামিটার ও বাহ্যিক সনদপত্র যাচাইয়ের পর এই প্রক্রিয়াটি শুরু করা হয়েছিল।' তিনি বলেন, 'গতকাল (রোববার) বেলা ৩টা ৩৪ মিনিটে আমরা সফলভাবে চেইন রিয়্যাকশন সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছি। সমস্ত প্যারামিটার কাঙ্ক্ষিত সীমার মধ্যেই ছিল এবং রিয়্যাক্টরটি যথেষ্ট স্থিতিশীল ছিল।'
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বাষ্প তৈরি, টারবাইন ঘোরানো এবং শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় তীব্র তাপ তৈরির লক্ষ্যে রিয়্যাক্টর কোরের ভেতরে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই চেইন রিয়্যাকশন নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এটি রিয়্যাক্টরের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়ার সূচনা হলেও এখনই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হচ্ছে না। প্রক্রিয়াটি শুরুর পূর্বপ্রস্তুতি সম্পর্কে আনোয়ার হোসেন জানান, গত রাত থেকেই সংশ্লিষ্ট দল প্রয়োজনীয় সব প্রোটোকল মেনে তাদের কাজ শুরু করে এবং রোববার বিকেলে সফলভাবে কাজ সম্পন্ন করে। এই ঐতিহাসিক ও জটিল প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ এবং রিয়্যাক্টরের সার্বিক পারফরম্যান্স মূল্যায়নে সেখানে রাশিয়ান বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশি প্রকৌশলী ও কারিগরি টিমের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তারা পুরো বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে রূপান্তর প্রক্রিয়াটি সফল হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন। তিনি আরও জানান, রিয়্যাক্টরে পারমাণবিক জ্বালানি আগেই লোড করা হয়েছিল এবং এর মাধ্যমে মূল ফিশন (পরমাণু বিভাজন) প্রক্রিয়া চালু হলো। বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার আগে প্ল্যান্টটিকে আরও বেশ কিছু কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ধারাবাহিক নিরাপত্তা প্রোটোকলের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর ক্ষেত্রে 'ক্রিটিক্যালিটি' অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যায়। এ সময়ে প্রকৌশলীরা নিউট্রনের তৎপরতা ও অন্যান্য পরিচালনগত প্যারামিটারসমূহ সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেন, যাতে করে পারমাণবিক চেইন বিক্রিয়াটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত ও স্থিতিশীল থাকে। নিয়ম অনুযায়ী ইউনিটটিকে পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরবর্তীতে জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করার পূর্বে প্রয়োজনীয় আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও কারিগরি তদারকি অব্যাহত থাকবে। মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, 'কারিগরি টিমসমূহ নির্ধারিত প্রতিটি ধাপের নিরাপত্তা মানদণ্ড ও বিধিমালা যথাযথভাবে মেনে দ্রুততম সময়ে অবশিষ্ট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।'
উল্লেখ্য, পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে রাশিয়ার প্রযুক্তিনির্মাণ প্রতিষ্ঠান রোসাটমের সার্বিক সহযোগিতায় দুটি 'ভিভিইআর-১২০০' প্রেশারাইজড ওয়াটার রিয়্যাক্টর ইউনিট স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট, অর্থাৎ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২,৪০০ মেগাওয়াট।
বিক্রিয়া শেষ করতে লাগবে ৩০ থেকে ৪০ দিন
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্র বলছে, পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর পর পর্যায়ক্রমে কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হবে। এ পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে ৩০ থেকে ৪০ দিন সময় লাগতে পারে। এরপর ধাপে ধাপে চুল্লিপাত্রের ভেতর শক্তি উৎপাদনের ক্ষমতা বাড়ানো হবে। পারমাণবিক জ্বালানির বিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হবে তাপশক্তি উৎপাদন। এ তাপ দিয়েই বাষ্প তৈরি করে ঘোরানো হবে টারবাইন, উৎপাদন হবে বিদ্যুৎ। চুল্লিপাত্রে শক্তি উৎপাদন শুরুর পর উৎপাদন ক্ষমতা ধাপে ধাপে বেড়ে ৩০ শতাংশে উন্নীত হলেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এরপর ৩০০ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। এটি ডিসেম্বরে হতে পারে।
