নারীস্বাস্থ্য খাতে বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব ও উদ্ভাবনী অর্থায়নের আহ্বান
জুবাইদা রহমান
প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
নারীস্বাস্থ্য খাতে টেকসই বিনিয়োগে বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব ও উদ্ভাবনী অর্থায়নের আহ্বান জানিয়েছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট জুবাইদা রহমান। জার্মানির রাজধানী বার্লিনে সোমবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে বক্তব্যে এই আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, "নারীর স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ শুধু স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয় নয়। আমাদের জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী। নারীর স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ মানে মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং জাতিগুলোর ভবিষ্যতের ওপর বিনিয়োগ। একটি সুস্থ ও অধিক সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ গড়ে তোলার যে স্বপ্ন, তার কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে এই বিশ্বাস। "প্রচলিত উন্নয়ন সহায়তা দিয়ে আমাদের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন উদ্ভাবনী অর্থায়ন, জাতীয় পর্যায়ে অঙ্গীকার, সহজ শর্তে বিনিয়োগ, অনুদানভিত্তিক কারিগরি সহায়তা এবং টেকসই অভ্যন্তরীণ সম্পদের সমন্বয়।"
বাংলাদেশ সরকারের নারী স্বাস্থ্যসেবার পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী জুবাইদা রহমান বলেন, "তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে গঠিত বর্তমান সরকার নারীর স্বাস্থ্যে নতুন প্রজন্মের রূপান্তরমূলক বিনিয়োগ এগিয়ে নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই উদ্যোগ শুধু মাতৃস্বাস্থ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিটি মেয়েশিশু যেন শিক্ষিত, পুষ্টিসমৃদ্ধ ও ক্ষমতায়িত হয়ে বেড়ে উঠতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।"
বার্লিনে গত ১১ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই সম্মেলনে 'দ্য মোমেন্ট ইজ নাও: আনলকিং নিউ ক্যাপিটাল ফর উইমেন্স হেলথ বিয়ন্ড এইড' শীর্ষক সেশনে বাংলাদেশের নারী স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থার উন্নয়ন, নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিতকরণ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বক্তব্য দেন জুবাইদা রহমান। অধিবেশনে তিনি সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এতে সরকার, উন্নয়ন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা প্রচলিত সহায়তার বাইরে নারীস্বাস্থ্য খাতে নতুন অর্থায়নের সুযোগ নিয়ে আলোচনা করেন।
জুবাইদা রহমান বলেন, "বাংলাদেশে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ নারীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথ সুগম করছে। কিশোরীদের রক্তস্বল্পতা, মাতৃ অপুষ্টি, প্রতিরোধযোগ্য মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যু এবং নারীদের মধ্যে প্রাণঘাতী ক্যান্সারের ক্রমবর্ধমান বোঝা মোকাবিলায় সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
"এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো উদ্যোগ নয় বরং বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী লাখ লাখ নারীর জীবন চক্র জুড়ে নেওয়া পরস্পর সম্পর্কিত বিনিয়োগ। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা বিশেষভাবে কিশোরী ও নারীবান্ধব হবে, তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা দেবে, মর্যাদার প্রতি সম্মান জানাবে এবং তাদের বাড়ির কাছাকাছি স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেবে।" নারী ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপও তুলে ধরেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পরিকল্পনা তুলে ধরে জুবাইদা রহমান বলেন, "বর্তমান সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার হল মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবায় রূপান্তর ঘটানো। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশজুড়ে মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করতে এক লাখ কমিউনিটি ও কল্যাণকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, যাদের প্রায় ৮০ শতাংশই নারী। পাশাপাশি আরও ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ বা ধাত্রী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
''ইনশাআল্লাহ, রাজনৈতিক অঙ্গীকার, উদ্ভাবনী অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের সমন্বয়ে কীভাবে নারীস্বাস্থ্যের উন্নয়ন ঘটানো যায়, বাংলাদেশ তা করে দেখাবে।"
নারীস্বাস্থ্য সেবা জোরদারে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে আন্তর্জাতিক অংশীদার, উন্নয়ন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান, দাতব্য সংস্থা ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের প্রতি আহ্বান জানান জুবাইদা রহমান। বক্তব্যের শুরুতে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) এবং ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের (ইআইবি) প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। জুবাইদা রহমান তিনি বলেন, "বাংলাদেশের প্রতিটি মেয়ে নিরাপদ শৈশবের অধিকারী। দেশের প্রতিটি পরিবারের প্রতিটি মা নিরাপদে সন্তান জন্ম দেওয়ার অধিকারী। আর গ্রাম ও শহরের প্রতিটি নারীর দীর্ঘ ও উৎপাদনশীল জীবন যাপনের সুযোগ পাওয়া উচিত।"
নারী স্বাস্থ্য উদ্যোগে ২৫ কোটি ইউরোর ঋণ পুনর্বিন্যাস : ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের (ইআইবি) ২৫ কোটি ইউরোর একটি সার্বভৌম ঋণ বাংলাদেশের নারীস্বাস্থ্য উদ্যোগে ব্যবহারের জন্য পুনর্বিন্যাসের বিষয়ে একটি চুক্তির ঘোষণা এসেছে। ঋণ পুনর্বিন্যাসের এ উদ্যোগ বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের অংশগ্রহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই উদ্যোগের আওতায় ২০২৭ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ নারী ও কিশোরীকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। উদ্যোগটি বাস্তবায়নে সরকারের সঙ্গে অংশীদার হিসেবে কাজ করবে ইউএনএফপিএ।
অধিবেশনে ইউএনএফপিএর নির্বাহী পরিচালক দিয়েন কেইতা, ঘানার স্বাস্থ্যমন্ত্রী কোয়াবেনা মিনতাহ আকানদোহ, ইআইবির ভাইস প্রেসিডেন্ট মারেক মোরা, জার্মানির অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়নবিষয়ক ফেডারেল মন্ত্রণালয়ের বির্গিট পিকেল এবং প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন। সম্মেলনের পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল টেকসই স্বাস্থ্য অর্থায়ন এবং মিডওয়াইফারি খাতে সহযোগিতা নিয়েও আলোচনায় অংশ নেয়। এ ছাড়া নারীস্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে প্রতিনিধি দলটি আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের অংশীদারদের সঙ্গে বৈঠক করে।
