জোরদার হচ্ছে পুলিশের বলপ্রয়োগ ও মানবাধিকারবিষয়ক প্রশিক্ষণ

প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

বলপ্রয়োগ, মানবাধিকার, পেশাগত নীতি ও সততা বিষয়ে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ জোরদার করছে বাংলাদেশ পুলিশ। পুলিশিং ব্যবস্থাকে অধিকতর সেবামুখী, জবাবদিহিমূলক ও সংবেদনশীল করার পাশাপাশি অতিরিক্ত বা অসঙ্গতিপূর্ণ বল প্রয়োগের ঝুঁকি কমানোর জন্য গৃহীত একটি বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বল প্রয়োগ-বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও গণআন্দোলন চলাকালে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা মানবাধিকার উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে এ উদ্যোগ নেওয়া হলো। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জাতিসংঘ মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্য রেখে 'সর্বনিম্ন বল প্রয়োগের' মূলনীতি সম্পর্কে পুলিশ কর্মকর্তাদের ধারণা স্পষ্ট করতে ৩০টি ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের মাধ্যমে ৯০০ জন পুলিশ সদস্যকে পাঁচ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ৯০.৮৯ শতাংশ অর্জিত হয়েছে এবং এ পর্যন্ত ৮১৮ জন পুলিশ সদস্য বল প্রয়োগ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক গাজী জসিম উদ্দিন বলেন, দৈনন্দিন পুলিশিং কার্যক্রমে বল প্রয়োগের মূলনীতিগুলোর ওপর এ প্রশিক্ষণে জোর দেওয়া হচ্ছে। অর্পিত দায়িত্ব পালনের সময় কখন এবং কীভাবে বল প্রয়োগ করা উচিত, তা কর্মকর্তাদের অনুধাবন করতে সাহায্য করাই এই প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন ধাপে ৮১৮ জন সদস্যকে এ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো— নিয়মিত পুলিশিংয়ের পাশাপাশি সম্ভাব্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে কর্মকর্তারা যাতে আইনানুগ, সংগতিপূর্ণ ও পেশাদার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সেই সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। 'সর্বনিম্ন বল প্রয়োগের' ওপর এ গুরুত্ব আরোপের বিষয়টি একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টা তুলে ধরে। এটি নিশ্চিত করে যে পুলিশের পরিচালনা কার্যক্রম কেবল কাজের প্রয়োজনেই নয়, বরং প্রয়োজনীয়তা, সামঞ্জস্যতা, জবাবদিহিতা ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধার নীতি দ্বারা পরিচালিত হতে হবে। উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও, এ কার্যক্রম রূপায়নের প্রতিবেদনে জনবল সংকট এবং অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ তহবিলকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ উদ্যোগ বাস্তবায়নের প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রশিক্ষণ উদ্যোগটিকে টিকিয়ে রাখা এবং এর পরিধি বাড়ানোর জন্য পুলিশ কর্মকর্তারা জনবল বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দের সুপারিশ করেছেন। তারা বলেন, নির্দিষ্ট মেয়াদের প্রশিক্ষণে সীমাবদ্ধ না রেখে নিয়মিত এ কার্যক্রম অব্যাহত রাখা এবং অধিক সংখ্যক পুলিশ সদস্যের কাছে পৌঁছানোর জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ অপরিহার্য।

কার্যক্রম পরিচালনায় পরিবর্তনশীল চাহিদা, জনগণের প্রত্যাশা এবং আধুনিক পুলিশিং মানদণ্ডের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পুলিশ সদস্যদের নিরবচ্ছিন্ন পেশাগত উন্নয়ন প্রয়োজন। তাই এ সম্পদের সীমাবদ্ধতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কর্মকর্তারা মনে করেন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করা, প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো এবং পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে ট্রেনিং কোর্সে শেখানো নীতিগুলো দৈনন্দিন পুলিশিং কাজে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হবে।

বল প্রয়োগ সংক্রান্ত এ উদ্যোগকে আরও সুসংহত করতে মানবাধিকার, পেশাগত নীতি ও সততার ওপর কেন্দ্র করে পৃথক একটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে। সেই কর্মসূচির অধীনে এ পর্যন্ত ৮০৪ জন পুলিশ সদস্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন, যা বাহিনীর অভ্যন্তরে পেশাদারিত্বের মান উন্নয়নে একটি সমান্তরাল প্রচেষ্টা বলে ধরা হয়।

এ সামগ্রিক প্রশিক্ষণ পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো— কর্মকর্তাদের শুধু আইন প্রয়োগকারী হিসেবে নয়, বরং পুলিশিংকে একটি জনসেবা হিসেবে দেখতে উৎসাহিত করা; যার জন্য প্রয়োজন পেশাদারিত্ব, সংযম, নিরপেক্ষতা এবং নাগরিকদের অধিকার ও মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা। বিশেষ করে যেসব পরিস্থিতিতে কর্মকর্তাদের চাপের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হয় এবং একই সঙ্গে জননিরাপত্তা, আইন প্রয়োগের দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়, সেখানে এই ধরনের প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাস্তবায়ন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালে প্রতিটি ব্যাচে ১,২৪০ জন করে আরও দুটি অতিরিক্ত পাঁচ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ ব্যাচ পরিচালনার কথা রয়েছে। প্রস্তাবিত এ সেশনগুলোতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), পুলিশ ট্রেনিং একাডেমি এবং ৩০টি ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের সদস্যরা অংশ নেবেন। প্রশিক্ষণ কর্মসূচির এ সম্প্রসারণ ইঙ্গিত দেয় যে প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে পুলিশ বাহিনীর বৃহত্তর অংশের কাছে এই প্রশিক্ষণ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

আইনানুগ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ বল প্রয়োগের নীতিগুলো যেন কর্মকর্তাদের পেশাগত অনুশীলনের স্থায়ী অংশ হয়ে ওঠে, সে জন্য নিয়মিত রিফ্রেশার (পুনর্বিন্যাস) প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে জোর দিয়েছেন কর্মকর্তারা।

বল প্রয়োগ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণটি অন্যান্য পুলিশ সংস্কার ও সক্ষমতা বৃদ্ধিমূলক উদ্যোগের পাশাপাশি পরিচালিত হচ্ছে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সাধারণ নাগরিক-বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রতি আরও সংবেদনশীল করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নারী, শিশু ও বয়স্কদের সহায়তায় নিয়োজিত সার্ভিস ডেস্কগুলোতে কর্মরত কর্মীদের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ। এ ধরনের উদ্যোগগুলোর উদ্দেশ্য হলো— কর্মকর্তারা কীভাবে অভিযোগ গ্রহণ করবেন, ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন এবং যাদের অতিরিক্ত সুরক্ষা বা সহায়তা প্রয়োজন তাদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করবেন, সেই ব্যবস্থার উন্নতি ঘটানো। ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীগুলোর ওপর এ বিশেষ নজর মূলত নাগরিক কেন্দ্রিক পুলিশিংয়ের দিকে এক বৃহত্তর পরিবর্তনের প্রতিফলন।