সুসংবাদ প্রতিদিন

তরমুজ চাষে সফল কৃষক আব্দুস শহীদ

প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মামুন চৌধুরী

বাড়ি নির্মাণের জন্য চারদিকে পাকা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা প্রায় ১৫ শতক জমি। সেখানে পড়ে থাকার কথা ছিল নির্মাণকাজ শুরুর অপেক্ষায় থাকা এক টুকরো পতিত জমি। কিন্তু কৃষকের ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম আর কৃষি বিভাগের সঠিক পরামর্শ বদলে দিয়েছে সেই জমির চিত্র। প্রাচীরঘেরা জমির ভেতরেই মাচা তৈরি করে মালচিং পেপার পদ্ধতিতে চাষ করা হয়েছে উন্নত জাতের তরমুজ। গাছে গাছে ঝুলছে হলুদ ও কালো রঙের অসংখ্য তরমুজ। কোথাও ছোট, কোথাও বড়-ফলভারে নুয়ে পড়েছে লতাগুলো। ব্যতিক্রমী এই দৃশ্য দেখে যে কারও মন জুড়িয়ে যাবে। এমনই এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগের মাধ্যমে অসময়ে তরমুজ চাষ করে সাফল্যের স্বপ্ন দেখছেন হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার কামারগাঁও গ্রামের কৃষক আব্দুস শহীদ। বাড়ি নির্মাণের আগে জমিটুকু কাজে লাগানোর চিন্তা থেকেই শুরু হয়েছিল তার এই উদ্যোগ। এখন চার শতাধিক গাছে ঝুলছে হাজারের বেশি ছোট-বড় তরমুজ। আর কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হবে বিক্রি। সবকিছু অনুকূলে থাকলে এই ক্ষেত থেকেই লাখ টাকার বেশি বিক্রির আশা করছেন তিনি।

কৃষক আব্দুস শহীদের এই সাফল্য শুধু তার নিজের স্বপ্ন পূরণের সম্ভাবনাই তৈরি করেনি, আশপাশের কৃষকদের মধ্যেও নতুন ফসল চাষের আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। পতিত জমি কিংবা সীমিত জায়গা যে পরিকল্পিত উদ্যোগ ও আধুনিক কৃষিপদ্ধতির মাধ্যমে আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে, তার ক্ষেত যেন সেই সম্ভাবনারই বাস্তব উদাহরণ।

সরেজমিনে কামারগাঁও গ্রামে দেখা যায়, বাড়ি নির্মাণের জন্য প্রস্তুত করা প্রায় ১৫ শতক জমির চারপাশে পাকা প্রাচীর। সেই প্রাচীরের ভেতরে মাচা তৈরি করে চাষ করা হয়েছে ইউনাইটেড কোম্পানির 'মধুমালা' ও 'ব্ল্যাকবেবী' জাতের তরমুজ। ফ্রিপ প্রকল্পের আওতায় মালচিং পেপার প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে এ চাষ করা হয়েছে। অল্প জায়গার মধ্যে সুশৃঙ্খলভাবে বেড়ে উঠেছে তরমুজের গাছ। গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে নানা আকারের হলুদ ও কালো রঙের ফল। পুরো ক্ষেতজুড়ে এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।

কৃষক আব্দুস শহীদ জানান, বাড়ি নির্মাণের উদ্দেশ্যে জমির চারপাশে পাকা প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন তিনি। বাড়ির কাজ শুরুর আগ পর্যন্ত জমিটি পতিত পড়ে থাকার কথা ছিল। এমন সময় মাঠ পরিদর্শনে এসে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শামিমুল হক শামীম তাকে জমিটি ফেলে না রেখে তরমুজ চাষের পরামর্শ দেন। তাঁর পরামর্শে আগ্রহী হয়ে উন্নত জাতের তরমুজ চাষের উদ্যোগ নেন আব্দুস শহীদ।

তিনি বলেন, বাড়ি নির্মাণের আগে জমিটা যেন পতিত পড়ে না থাকে, সেই চিন্তা থেকেই তরমুজ চাষ শুরু করি। কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে অল্প জায়গায় মাচা তৈরি করে তরমুজ লাগিয়েছি। চাষাবাদে আমার প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখন গাছে গাছে প্রচুর তরমুজ ধরেছে। ছোট-বড় মিলিয়ে হাজারেরও বেশি তরমুজ রয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই বিক্রি শুরু করতে পারব বলে আশা করছি। ফলন ভালো থাকলে লাখ টাকার বেশি বিক্রি হতে পারে। তিনি আরও জানান, অসময়ে তরমুজ চাষ করলেও গাছে ভালো ফলন এসেছে। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ফলন আরও ভালো হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। নিজের উদ্যোগে এমন ফলন পেয়ে তিনি আশাবাদী। তরমুজ বিক্রি করে ভালো আয় করতে পারলে ভবিষ্যতে কৃষিকাজে নতুন পরিকল্পনা নেওয়ারও সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন তিনি।

স্থানীয় কৃষকদের চোখেও আব্দুস শহীদের এই উদ্যোগ এখন আলোচনার বিষয়। তাদের মতে, কৃষিকাজে আগ্রহ, পরিশ্রম ও সঠিক পরামর্শ থাকলে সীমিত জমিতেও ভালো কিছু করা সম্ভব। প্রচলিত ফসলের বাইরে নতুন জাতের তরমুজ চাষ করে আব্দুস শহীদ সেই সম্ভাবনা দেখিয়েছেন।

স্থানীয় কয়েকজন কৃষক বলেন, "চেষ্টা থাকলে কঠিন কাজও সহজ করা যায়-আব্দুস শহীদের ক্ষেত তার প্রমাণ। অল্প জায়গায় তিনি যেভাবে তরমুজ চাষ করেছেন এবং ফলন পেয়েছেন, তা আমাদের উৎসাহিত করেছে। তার কাছ থেকে এ জাতের তরমুজ চাষ সম্পর্কে পরামর্শ নিয়েছি। ভবিষ্যতে আমরাও এভাবে তরমুজ চাষ করার পরিকল্পনা করছি। তারা মনে করেন, কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শ ও আধুনিক চাষপদ্ধতি সম্পর্কে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে এলাকার কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে বাড়ির আশপাশের অব্যবহৃত জমি, পতিত জায়গা কিংবা সীমিত কৃষিজমি পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো গেলে কৃষকের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। এই সাফল্যের পেছনে কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শামিমুল হক শামীম বলেন, কৃষকদের পাশে থেকে কাজ করতে আমার ভালো লাগে। মাঠে গিয়ে কৃষকদের পরামর্শ দিতে পারলে মনে আনন্দ আসে। মাঠ পরিদর্শনে গিয়ে আব্দুস শহীদকে জমি পতিত না রেখে তরমুজ চাষের পরামর্শ দিয়েছিলাম। তিনি সেই পরামর্শ অনুযায়ী চাষ করে ভালো ফলন পেয়েছেন।