শুক্রবারের বিশেষ খবর

কক্সবাজারের নাপ্পি, রপ্তানিতে খুলবে সম্ভাবনার দুয়ার

প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  গাজী মুনছুর আজিজ

কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চলে সাগর থেকে ধরা ছোট চিংড়ি ও সামুদ্রিক মাছ দিয়ে তৈরি হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী খাবার নাপ্পি। একসময় পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের খাদ্যতালিকায় বিশেষ স্থান ছিল এর। সেই ঐতিহ্যবাহী খাবার এখন আর শুধু স্থানীয় চাহিদা পূরণে সীমাবদ্ধ নেই; বাণিজ্যিক উৎপাদন ও রপ্তানির মাধ্যমে তৈরি হয়েছে আয়ের নতুন ক্ষেত্র। কক্সবাজারের নাজিরারটেক, চৌফলদণ্ডী ও মহেশখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় নাপ্পি উৎপাদনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ব্যবসা। দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশের বাজারে পৌঁছানো এ পণ্য উপকূলের মানুষের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

ঐতিহ্যবাহী খাবার, এখন বাণিজ্যিক পণ্য : কক্সবাজারের নাপ্পি তৈরির উদ্যোক্তা সাইয়্যিদ মঞ্জু বলেন, নাপ্পি মূলত ছোট মাছ ও চিংড়ি গাঁজন করে তৈরি একধরনের মৎস্যজাত খাবার। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা ও মারমা জনগোষ্ঠীর রান্নায় এর ব্যবহার দীর্ঘদিনের। বিশেষ স্বাদ ও গন্ধের কারণে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরিতে নাপ্পি ব্যবহৃত হয়। সময়ের সঙ্গে এ খাবারের চাহিদা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বিদেশে বসবাসরত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এ ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবারের বাজার রয়েছে। কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চলে শুঁটকি উৎপাদনের পাশাপাশি নাপ্পি তৈরি হওয়ায় স্থানীয় মৎস্যসম্পদের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সহজলভ্য ছোট চিংড়ি ও অন্যান্য উপযোগী সামুদ্রিক মাছ প্রক্রিয়াজাত করে এ পণ্য তৈরি করা যায়। ফলে স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে বাড়তি মূল্য সংযোজনের পাশাপাশি নতুন ব্যবসার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।

উৎপাদন থেকে কর্মসংস্থান : নাপ্পি উৎপাদনের প্রচলিত পদ্ধতি তুলনামূলক সহজ। সাধারণত ছোট চিংড়ি ও অন্যান্য উপযোগী ছোট মাছের সঙ্গে পরিমিত লবণ মিশিয়ে নির্দিষ্ট সময় গাঁজন করা হয়। এরপর রোদে শুকানো ও বারবার পেষাইয়ের মাধ্যমে মাছের মিশ্রণকে ঘন পেস্টে পরিণত করা হয়। পরে চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন আকারে তৈরি করে সংরক্ষণ ও বাজারজাত করা হয়।

এ কাজে বড় শিল্পকারখানা বা জটিল যন্ত্রপাতি ছাড়াও ক্ষুদ্র উদ্যোগ গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় এরইমধ্যে নাপ্পি উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন উদ্যোক্তারা। এ শিল্পে কাঁচামাল সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, শ্রম, মোড়কজাতকরণ, পরিবহন ও বিপণন—বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে জেলে পরিবার ও স্থানীয় নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে উপকূলের পরিবারগুলোতে বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

এ শিল্পের আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো— স্থানীয় মৎস্যসম্পদের ব্যবহার বাড়ানো। বাজারে তুলনামূলক কম দাম পাওয়া যায়, এমন উপযোগী ছোট মাছ ও চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রয়যোগ্য পণ্যে রূপান্তর করা সম্ভব। এতে কাঁচামালের মূল্য বাড়ে এবং মৎস্যনির্ভর অর্থনীতিতে নতুন সংযোজন ঘটে।

বিদেশের বাজারে কক্সবাজারের পণ্য : নাপ্পির বাণিজ্যিক সম্ভাবনার গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজার। ভারত, চীন ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে এ পণ্যের রপ্তানি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের তথ্য থেকে জানা যায়। ফলে স্থানীয়ভাবে পরিচিত একটি খাবার বিদেশের বাজারে বিক্রির মাধ্যমে বৈদেশিক বাণিজ্যের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। কক্সবাজারের উৎপাদকদের জন্য এটি শুধু পণ্য বিক্রির সুযোগ নয়, বরং স্থানীয় মৎস্যসম্পদকে আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী পণ্যে রূপান্তরেরও একটি উদাহরণ।

মান বাড়লে বাড়বে সম্ভাবনা : উদ্যোক্তা সাইয়্যিদ মঞ্জু বলেন, বিদেশের বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে নাপ্পি উৎপাদনে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ, নিরাপদ কাঁচামাল, নিয়ন্ত্রিত গাঁজন প্রক্রিয়া এবং মানসম্মত সংরক্ষণব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। পণ্যের গুণগত মান পরীক্ষা, খাদ্যনিরাপত্তা অনুসরণ, উপযুক্ত মোড়ক ও পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন এ শিল্পের বাজার সম্প্রসারণে সহায়ক হবে। পাশাপাশি উৎপাদকদের প্রশিক্ষণ, সহজশর্তে ঋণ, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা এবং রপ্তানিকারকদের সঙ্গে বাজারসংযোগ তৈরিতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।

উদ্যোক্তা সাইয়্যিদ মঞ্জু বলেন, স্থানীয় ঐতিহ্য ও সহজলভ্য মৎস্যসম্পদ কাজে লাগিয়ে নাপ্পির বাণিজ্যিক উদ্যোগ গড়ে তোলা সম্ভব। এ খাতের উদ্যোক্তারা মানসম্মত উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা পূরণে সক্ষম হলে নাপ্পি আরও বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। এতে একদিকে উপকূলের মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে, অন্যদিকে বাংলাদেশের মৎস্য প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানি ঝুড়িতেও যুক্ত হবে নতুন সম্ভাবনাময় একটি নাম— নাপ্পি।