মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ক্ষতি ৫০ হাজার কোটি টাকা
ক্ষতিপূরণ চায় বাংলাদেশ
প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সাত মাসে জ্বালানি ও সার আমদানিতে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৪১২ কোটি ডলার। প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে দেশীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রতি মাসে এই দুই পণ্যের আমদানিতে বাড়তি ব্যয় আরও প্রায় ৬০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। এই বিপুল আর্থিক চাপ সামলাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাইছে বাংলাদেশ। একইসঙ্গে যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অথচ সংঘাতে সরাসরি জড়িত নয়— এমন দেশগুলোর ক্ষতির দায় নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্ষতিপূরণের প্রশ্নও সামনে এসেছে।
থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার ফাঁকে গতকাল শুক্রবার উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষয়ক্ষতি ও আন্তর্জাতিক সহায়তা নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিষয়টি তুলে ধরা হয়। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সেখানে জ্বালানি ও সার আমদানিতে বাড়তি ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পাশে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বাড়তি ব্যয়ের সমপরিমাণ অর্থাৎ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ পাওয়ার প্রশ্নটি আলোচনায় থাকলেও, বাংলাদেশ এই পরিমাণ অর্থ ক্ষতিপূরণ হিসেবে পাবে—এমন কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের কাছ থেকে বাড়তি অর্থায়ন পাওয়ার উদ্যোগ চলছে। তবে ঋণ, অনুদান বা জরুরি সহায়তার মাধ্যমে পাওয়া অর্থকে সরাসরি যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
যুদ্ধের ধাক্কায় বাড়ছে আমদানি ব্যয় : বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অভিঘাত সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে জ্বালানি ও সার আমদানির ব্যয়ে। জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও শিল্পকারখানার পরিচালন ব্যয় বেড়ে যায়। একইভাবে সারের দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদনের খরচ এবং সরকারের ভর্তুকির চাপও বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত এই ব্যয়ের একটি অংশ পণ্য ও সেবার দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে জ্বালানি ও সার আমদানিতে প্রতি মাসে প্রায় ৬০ কোটি ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধের মেয়াদ যত বাড়বে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।এমনিতেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে দুর্বলতা ও আর্থিক খাতের সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এর মধ্যে আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান নিশ্চিত করা এবং সরকারি বাজেটের ভারসাম্য রক্ষা আরও কঠিন হতে পারে।
বাংলাদেশের যুক্তি, যুদ্ধের সিদ্ধান্তে সরাসরি অংশ না নিলেও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বড় আর্থিক ক্ষতি বহন করতে হচ্ছে। ফলে এসব দেশের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোর বাড়তি ব্যয় সামলাতে সহজ শর্তে অর্থায়ন, অনুদান ও জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা করা জরুরি।
৩০-৪০ দেশের জন্য সহায়তার প্রস্তুতি বিশ্বব্যাংকের : মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাতে ৩০ থেকে ৪০টি দেশের সঙ্গে সম্ভাব্য জরুরি সহায়তা নিয়ে আলোচনা করছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি জানান, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে সংকট মোকাবিলায় সহায়তার পরিমাণ সর্বোচ্চ ১০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ২৫ বিলিয়ন ডলারের একটি সংকটকালীন তহবিলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি চলমান ও অনুমোদিত প্রকল্পের অর্থ পুনর্বিন্যাস করেও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য বিশ্বব্যাংকের এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে সম্ভাব্য অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে দেশের প্রয়োজন, অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনা এবং অর্থায়নের শর্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে জ্বালানি ও সার আমদানির বাড়তি ব্যয় সামলাতে অর্থায়ন পাওয়া গেলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে। এদিকে নিয়মিত সহায়তার বাইরে আগামী ৩ বছরে বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন চেয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি আইএমএফের সঙ্গে নতুন তিন বছর মেয়াদি ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা চলছে। এসব অর্থায়ন যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে নির্ধারিত নয়; বরং অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা ও পুনরুদ্ধারের বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ।
