কৃষিজমির টপসয়েল রক্ষায় নতুন উদ্যোগ
খাল খননের মাটি যাবে বৈধ ইটভাটায়
প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
কৃষিজমির উর্বরতা রক্ষা ও ফসল উৎপাদন কমে যাওয়া ঠেকাতে ইটভাটায় কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটির (টপসয়েল) ব্যবহার বন্ধে নতুন পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ পরিকল্পনার আওতায় সারাদেশে খাল খননের পর পাওয়া উদ্বৃত্ত মাটি সংগ্রহ করে তা বৈধ ইটভাটায় ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এতে একদিকে খনন করা মাটির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে ইট তৈরিতে কৃষিজমির টপসয়েল ব্যবহারের প্রবণতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম এ তথ্য জানান।
খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে কৃষিজমির টপসয়েল সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি উল্লেখ করে শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, অপরিকল্পিতভাবে ইটভাটায় কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি ব্যবহারের কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ উর্বর মাটি কৃষিজমি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এতে জমির উৎপাদনশীলতা কমার পাশাপাশি দেশের খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, 'আমরা নতুন করে একটি পাইলট প্রজেক্ট নিয়েছি। আশা করি, এ বছর পাইলট প্রজেক্ট শুরু করলেও আগামীতে এটাকে আরও ব্যাপক পরিসরে সম্প্রসারণ করা হবে।'
প্রতিমন্ত্রী জানান, অক্টোবরের শেষ অথবা নভেম্বরের শুরুতে সারাদেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হতে পারে। যেসব এলাকায় খাল খনন হবে, সেসব এলাকার জেলা প্রশাসকদের বৈধ ইটভাটার মালিকদের এ কর্মসূচির আওতায় আনার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। খনন শেষে উদ্বৃত্ত মাটি নির্ধারিত ইটভাটায় সরবরাহ করা হবে। এতে ইট তৈরির জন্য কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি সংগ্রহের প্রবণতা কমার পাশাপাশি খাল খননের মাটিরও পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত হবে।
তিনি বলেন, 'টপসয়েল নষ্ট করতে দেব না— এটা সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর সিদ্ধান্ত। আমাদের ফার্টাইল ল্যান্ডকে রক্ষা করতে হলে ইটভাটায় টপসয়েলের ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করতে হবে।'
ইটভাটার মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দকে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে উল্লেখ করে শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ইটভাটাগুলোর তথ্য সংগ্রহ করে তাদেরকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি দেশে ব্লক ইটের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে প্রচলিত ইট উৎপাদনে মাটির ব্যবহার কমার পাশাপাশি ইটভাটাগুলো ধীরে ধীরে ব্লক ইট উৎপাদনের দিকে যাবে। দক্ষিণাঞ্চলের কিছু এলাকায় নদী ও খাল খননে বাস্তব জটিলতা থাকলেও দেশের অধিকাংশ এলাকায় এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান বলেন, টপসয়েল হচ্ছে কৃষিজমির উপরিভাগের পুষ্টিকর মাটি, যেখানে জৈব পদার্থের পরিমাণ বেশি থাকে। এই জৈব পদার্থ ও প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান উদ্ভিদের বৃদ্ধি এবং মাটির উর্বরতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। টপসয়েল সরিয়ে নেওয়া হলে দীর্ঘমেয়াদে জমির উৎপাদনশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত জমিকে আবার উৎপাদন উপযোগী করতে অতিরিক্ত সার ও অন্যান্য উপকরণের প্রয়োজন হতে পারে, যা কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ায়।
স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে টপসয়েল রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রায় আট হাজার ইটভাটায় কৃষিজমির টপসয়েল ও এর নিচের মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। টপসয়েল অপসারণের পর তা পুনরুদ্ধারে ১৫ থেকে ২০ বছর সময় লাগে। এতে কৃষি উৎপাদন ও মাটির উর্বরতা কমার পাশাপাশি অনেক জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, যা খাদ্যনিরাপত্তাকেও হুমকিতে ফেলে।
তিনি বলেন, পোড়ানো ইটের পরিবর্তে ব্লক ইট ব্যবহারে সরকার ২০১৯ ও ২০২৫ সালে পরিপত্র জারি করলেও নানা জটিলতায় তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। অসমাপ্ত পরিকল্পনাটি আবার কার্যকর করে সরকারি কাজে পোড়ানো ইটের ব্যবহার কমিয়ে ব্লক ইট নিশ্চিত করা গেলে টপসয়েল উত্তোলন, মাটির ক্ষয় ও বায়ুদূষণ কমানো সম্ভব।
তার মতে, টপসয়েল রক্ষা করা হলে একই সঙ্গে মাটি সংরক্ষণ, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত ও বায়ুদূষণ কমানোর 'থ্রি ডাইমেনশনাল' সুফল পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, ইট তৈরির প্রধান উপাদান মাটি। কৃষিজমির টপসয়েল কেটে নেওয়ার ফলে মাটির প্রয়োজনীয় পুষ্টি নষ্ট হয় এবং জমির উর্বরতা ও ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়। তাই কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থে টপসয়েল রক্ষার বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিজমি সুরক্ষা আইন-২০২৬ অনুযায়ী কৃষিজমি থেকে মাটি উত্তোলন নিষিদ্ধ। তবে নগদ লাভের আশায় অনেক কৃষক ইটভাটার মালিকদের কাছে টপসয়েল বিক্রি করেন। আইন অনুযায়ী টপসয়েল কাটার শাস্তির বিধান কার্যকর করার পাশাপাশি কৃষকদের সচেতন করা জরুরি।
আলমগীর কবির আরও বলেন, সারাদেশে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচিতে উত্তোলিত মাটি ব্যবহারের জন্য একটি নীতিমালা প্রয়োজন। খাল থেকে উত্তোলিত মাটি যথাযথভাবে ব্যবহার করা গেলে তা অপচয় রোধের পাশাপাশি ইটভাটায় কৃষিজমির মাটির ব্যবহারও কমাতে পারে।
সরকারের নতুন পরিকল্পনায় খাল খননের মাটিকে ইটভাটার বিকল্প কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। খননের পর যথাযথ ব্যবস্থাপনায় ওই মাটি কাজে লাগানো গেলে কৃষিজমির টপসয়েলের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি উদ্বৃত্ত মাটির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাও সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ উদ্যোগ সফল করতে বৈধ ইটভাটার তালিকা, মাটি সরবরাহের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং মাঠপর্যায়ে নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এর আগে ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর 'ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৩'-জাতীয় সংসদে পাস হয়। এই আইনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া আবাদযোগ্য জমির উপরি স্তর কাটলে তার সাজা হবে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড। দেশে কৃষিজমির পরিমাণ সীমিত হলেও জনসংখ্যা ও খাদ্যের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে।
