পূজার ছুটিতে চাঙা পর্যটন-অর্থনীতি

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  গাজী মুনছুর আজিজ

শারদীয় দুর্গাপূজার টানা পাঁচ দিনের ছুটিতে সমুদ্র, পাহাড় ও হ্রদঘেরা পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের ঢল নেমেছে। কক্সবাজার ও কুয়াকাটার বিস্তীর্ণ সৈকত, খাগড়াছড়ি ও সাজেকের মেঘে ঢাকা পাহাড় এবং রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশি ঘিরে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে অবকাশ কাটাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা। পর্যটকদের এ বাড়তি উপস্থিতিতে দর্শনীয় স্থানগুলো যেমন মুখর হয়ে উঠেছে, তেমনি গতি ফিরেছে পর্যটননির্ভর এলাকার হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়।

প্রকৃতির বৈচিত্রময় সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি ছুটির এ সময়ে পর্যটকদের কাছে বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছে সমুদ্রস্নান, নৌ-ভ্রমণ, পাহাড়ি পথে ঘোরাঘুরি এবং স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়া। কোথাও সৈকতে ঢেউয়ের সঙ্গে আনন্দে মেতেছেন দর্শনার্থীরা, কোথাও পাহাড়ের বাঁকে দাঁড়িয়ে মেঘের ভেলা দেখছেন, আবার কোথাও কাপ্তাই হ্রদের বুকে নৌযানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সবমিলিয়ে দুর্গাপূজার ছুটি দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটনে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি করেছে।

কক্সবাজার : দেশের প্রধান পর্যটন গন্তব্য কক্সবাজারে এখন উৎসবের আমেজ। নীল সমুদ্র, বিস্তৃত বালুকাবেলা ও ঢেউয়ের গর্জন উপভোগ করতে প্রতিদিনই আসছেন নানা বয়সী মানুষ। কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সমুদ্রস্নানে ব্যস্ত, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলছেন, আবার কেউ সৈকতে বসে উপভোগ করছেন নোনা বাতাসের স্নিগ্ধতা। পর্যটকদের আগমনে শহরের হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও বিনোদনকেন্দ্র গুলোতে বেড়েছে ব্যস্ততা। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, পূজার ছুটিতে কক্সবাজারে কয়েক লাখ পর্যটকের সমাগম হতে পারে। অনেক হোটেলে কক্ষের অগ্রিম বুকিং ৮০ থেকে ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন ভ্রমণ নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় রাখা হচ্ছে। পর্যটকরা যাতে নিরাপদে সময় কাটাতে পারেন, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

কুয়াকাটা : দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটাতেও বেড়েছে পর্যটকদের আনাগোনা। একই সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার বিরল অভিজ্ঞতা নিতে সেখানে যাচ্ছেন ভ্রমণপিপাসুরা। দীর্ঘ সৈকতে হাঁটাহাঁটি, সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ, স্থানীয় খাবারের স্বাদ গ্রহণ এবং বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্রে সময় কাটিয়ে ছুটি উপভোগ করছেন তারা।

খাগড়াছড়ি : সমুদ্রের পাশাপাশি পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্র গুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে ছুটির আনন্দ। খাগড়াছড়ির আলুটিলা গুহা, রিছাং ঝরনা ও মায়াবিনী লেকসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে পর্যটকদের ভিড় দেখা যাচ্ছে। পাহাড়ি পথ, ঝরনার জলধারা ও সবুজ প্রকৃতির সান্নিধ্যে নগরজীবনের ব্যস্ততা ভুলে সময় কাটাচ্ছেন দর্শনার্থীরা। অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়দের আগ্রহ বাড়ছে জিপলাইন ও জায়ান্ট সুইংয়ের মতো বিনোদনমূলক কার্যক্রমেও।

সাজেক : মেঘে ঢাকা পাহাড়, আঁকাবাঁকা পথ ও মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্য পরিচিত সাজেক ভ্যালিও পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। সাজেকের রিসোর্ট ও কটেজ মালিকদের সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, পূজার ছুটিকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ আবাসনকেন্দ্রে আগাম বুকিং বেড়েছে। পর্যটকদের এ উপস্থিতিতে স্থানীয় পরিবহন, খাবারের দোকান ও অন্যান্য সেবামূলক ব্যবসায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

রাঙামাটি : পাহাড়, সবুজ অরণ্য ও কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশির মেলবন্ধনে অনন্য রাঙামাটিতেও পর্যটকদের পদচারণায় প্রাণচাঞ্চল্য বেড়েছে। জেলা শহরের অন্যতম আকর্ষণ ঝুলন্ত সেতুতে সকাল থেকেই ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। কেউ সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে পাহাড় ও হ্রদের দৃশ্য উপভোগ করছেন, কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ছবি তুলছেন। অনেকে ভাড়া করা পর্যটকবাহী নৌযানে কাপ্তাই হ্রদ ঘুরে দেখছেন। হ্রদের জলরাশি পেরিয়ে সুবলং ঝরনার দিকে যাত্রাও পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। বাড়তি পর্যটকের চাপে শহরের হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টগুলোতেও ব্যস্ততা বেড়েছে।

রাঙামাটি পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা জানান, দুর্গাপূজার ছুটিকে ঘিরে তাদের আবাসনকেন্দ্রের কক্ষগুলোর চাহিদা বেড়েছে। পর্যটকদের আগমন অব্যাহত থাকায় সামনের দিনগুলোতেও ভালো ব্যবসার প্রত্যাশা করছেন তারা।

পর্যটকদের বাড়তি উপস্থিতি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের পাশাপাশি রেস্তোরাঁ, স্থানীয় পরিবহন, নৌযান, পর্যটকবাহী জিপ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গুলোতে কাজের চাপ বেড়েছে। পর্যটননির্ভর এসব ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় পরিবার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ি জনপদগুলোতে পর্যটন মৌসুম অনেক মানুষের জীবিকা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।