সড়ক নিরাপত্তা আইন

বিনামূল্যে চিকিৎসা ও বারবার অপরাধে দ্বিগুণ শাস্তির প্রস্তাব

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জরুরি মুহূর্তে বিনামূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করা, সাহায্যকারী পথচারীদের আইনি সুরক্ষাদান, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের জন্য 'ডিমেরিট পয়েন্ট' ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং বারবার অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে দ্বিগুণ শাস্তির বিধান রেখে 'সড়ক নিরাপত্তা আইন ২০২৬'-এর খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ (আরটিএইচডি) প্রস্তুতকৃত প্রস্তাবিত এই আইনের মূল লক্ষ্য হলো— সড়ক দুর্ঘটনা রোধ, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা, যানবাহন ও সড়ক অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দুর্ঘটনাকবলিত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসাসেবা প্রদান করার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামো গড়ে তোলা। খসড়া আইনটিতে মোট ১৫টি অধ্যায়, ১১১টি ধারা এবং ২টি তফসিল রয়েছে।

'জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবস ২০২৬' উপলক্ষে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সংস্থাপন শাখার উপ-সচিব আল-আমীন মো. নুরুল ইসলাম বলেন, 'আমরা আইনের খসড়াটি চূড়ান্ত করেছি, যা শিগগিরই মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।'

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর হাজারও প্রাণহানি : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জন মানুষ প্রাণ হারান। তবে বিআরটিএ'র হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ৫ হাজার ৪৯০ জন, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমানের চেয়ে প্রায় ছয় গুণ কম। প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় সড়ক দুর্ঘটনাকে ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী শিশু ও তরুণদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের একটি হিসাব উদ্ধৃত করে এতে বলা হয়, বাংলাদেশের মতো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনার কারণে জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।

২০২৭ সালের মধ্যে সমন্বিত আইনের বৈশ্বিক অঙ্গীকার : বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত 'সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ'-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০২৭ সালের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মরক্কোর মারাকেশে অনুষ্ঠিত সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক আন্তর্জাতিক মন্ত্রীপর্যায়ের সম্মেলনে অঙ্গীকার করেছিল বাংলাদেশ। চলতি বছরের ২০-২১ জুলাই নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এই অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক সেরা অনুশীলন এবং অন্যান্য দেশের আইন পর্যালোচনা করে খসড়া প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। গত ১৪ অক্টোবর আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মন্ত্রী আবারও জানান, ২০২৭ সালের মধ্যে আইনটি চূড়ান্তভাবে প্রণয়ন করতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়া চলতি বছরের মধ্যে একটি গতি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল এবং হেলমেট ব্যবহারের নির্দেশিকা প্রস্তুত করার পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে সরকার।

নিরাপদ সড়ক ও আধুনিক প্রযুক্তি : প্রস্তাবিত খসড়া আইনে সড়ক নেটওয়ার্ক ও মোড়গুলো আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ডিজাইন করা, পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয় সাধন এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ বা 'ব্ল্যাক স্পট' এলাকাগুলো নিয়মিত চিহ্নিত ও সংশোধন করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

আইনে পথচারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব অবকাঠামো— যেমন পর্যাপ্ত ফুটপাত, র‍্যাম্প বা লিফটসহ ফুটওভার ব্রিজ এবং নিরাপদ রিফিউজ আইল্যান্ড নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া নারী, অন্তঃসত্ত্বা, শিশু, বয়স্ক এবং প্রতিবন্ধীদের গণপরিবহনে গমনাগমন সহজ করার জন্য পরিবহন পরিচালনাকারীদের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। গতি নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য গতি পরিমাপক ক্যামেরা, স্পিড হাম্প, রাম্বল স্ট্রিপ এবং 'ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম' (আইটিএস) বসানোর প্রস্তাব করা হয়েছে খসড়ায়। সেই সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত 'স্টার-রেটিং সিস্টেম', পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত সার্বিক নিরাপত্তা অডিট এবং পরিদর্শনের বিধানও রাখা হয়েছে।

মনোযোগহীন অবস্থায় গাড়ি চালানো, শিশুদের নিরাপত্তা : খসড়া আইন অনুযায়ী, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল বা একই ধরনের ডিভাইস ব্যবহার করা, ধূমপান করা, খাবার খাওয়া কিংবা উচ্চ শব্দে গান শোনা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। চালকের মনোযোগ বিচ্ছিন্ন বা বিভ্রান্ত করে— যাত্রীদের এমন কোনো আচরণ করাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। চালক এবং যাত্রী উভয়ের জন্যই সিটবেল্ট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। ১৪ বছরের কম বয়সী শিশু অথবা ১৩৫ সেন্টিমিটারের চেয়ে কম উচ্চতার শিশুদের সামনের সিটে বসা নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং তাদের জন্য উপযুক্ত সুরক্ষামূলক 'রেস্ট্রেইন্ট সিস্টেম' ব্যবহার আবশ্যক করা হয়েছে। মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রয়োজনে পুলিশ ও অনুমোদিত কর্মকর্তারা ব্রেথঅ্যালাইজার টেস্ট কিংবা ল্যাবরেটরি পরীক্ষা চালাতে পারবেন।

হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক : মোটরসাইকেল চালক এবং আরোহী— উভয়ের জন্যই বিএসটিআই-অনুমোদিত মানসম্মত হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে ছয় বছরের কম বয়সীদের মোটরসাইকেলের যাত্রী হিসেবে যাতায়াত নিষিদ্ধের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

যেখানে রাস্তার অবস্থা অনুকূল, সেখানে সাইকেলের জন্য আলাদা লেন নির্দিষ্ট করা এবং সাইকেল চালকদের জন্য হেলমেটসহ অন্যান্য প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জাম পরা বাধ্যতামূলক করার কথা খসড়ায় বলা হয়েছে। পথচারীদের জন্য বিদ্যমান ফুটপাত ব্যবহার করা এবং জেব্রা ক্রসিং ও রিফিউজ আইল্যান্ডসহ নির্ধারিত স্থান দিয়ে রাস্তা পারাপার হওয়া বাধ্যতামূলক হবে।

ডিমেরিট পয়েন্ট ও অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে দ্বিগুণ শাস্তি : প্রস্তাবিত 'ডিমেরিট পয়েন্ট' ব্যবস্থার আওতায় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের কারণে চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পয়েন্ট কাটা যাবে। নির্দিষ্ট পরিমাণের পয়েন্ট কাটা গেলে বা পয়েন্ট জমা হলে ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিলের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া একই ব্যক্তি একই অপরাধ দ্বিতীয় বা পরবর্তী সময়ে করলে সর্বোচ্চ নির্ধারিত শাস্তি বা জরিমানা দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে খসড়া আইনে।

প্রস্তাবিত ৭৪ ধারা অনুযায়ী, কোনো পথচারী ফুটপাত ব্যবহারে ব্যর্থ হলে প্রথমবার অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার সম্মুখীন হবেন।

'গোল্ডেন আওয়ারে' বিনামূল্যে জরুরি চিকিৎসা : খসড়া আইনটির অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো— দুর্ঘটনার পরপরই সংকটপূর্ণ সময় বা 'গোল্ডেন আওয়ারে' আহতদের জন্য বাধ্যতামূলক বিনামূল্যে জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা। খসড়ায় উল্লেখ করা হয়, অগ্রিম টাকা বা টিকিট ছাড়া হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে তাৎক্ষণিক জরুরি চিকিৎসা প্রদানের কঠোর ও বাধ্যতামূলক বিধান না থাকা বিদ্যমান আইনি কাঠামোর বড় একটি ঘাটতি। তাই নতুন আইনে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর জন্য এই সংকটময় মুহূর্তে বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা প্রদান আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, যা দুর্ঘটনাকবলিতদের জীবন রক্ষার সম্ভাবনা অনেকাংশে বাড়িয়ে দেবে।

স্বেচ্ছাসেবী উদ্ধারকারীদের আইনি সুরক্ষা : পুলিশি হয়রানি, ফৌজদারি মামলা এবং আদালত চালানের ভয়ে সাধারণ মানুষ প্রায়ই দুর্ঘটনাকবলিতদের উদ্ধারে এগিয়ে আসতে দ্বিধাবোধ করেন। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে খসড়ায় স্বেচ্ছাসেবী বা উদ্ধারকারীদের দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা থেকে পূর্ণ আইনি সুরক্ষা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। আইনি জটিলতার ভয় ছাড়া সাধারণ মানুষ যেন এগিয়ে এসে জীবন বাঁচাতে উৎসাহিত হন, সেজন্যই এই সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ডাটাবেস ও গবেষণা তহবিল : আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, প্রকাশ ও সংরক্ষণের জন্য একটি 'সমন্বিত কেন্দ্রীয় ডাটাবেস সিস্টেম' গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিত ও সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করবে।

বৈজ্ঞানিক গবেষণা জোরদার, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি উন্নয়ন এবং সড়ক নিরাপত্তার উদ্যোগগুলোতে অর্থায়নের জন্য একটি আলাদা 'গবেষণা তহবিল' গঠনের কথা বলা হয়েছে।

প্রস্তাবিত আইনে চালকদের প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনের নিরাপত্তা, দুর্ঘটনা তদন্ত, দুর্ঘটনা পরবর্তী চিকিৎসা খরচ এবং যাত্রী বীমার মতো বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আইনের দু'টি তফসিলে দুর্ঘটনা পরবর্তী সেবা প্রদান এবং অ্যালকোহল বা অন্য কোনো মাদকদ্রব্য সেবন করে যানবাহন চালানো সম্পর্কিত বিধিবিধান যুক্ত করা হয়েছে।

 

কেন এই পৃথক আইন : খসড়ায় বলা হয়েছে, 'সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮'তে আরও সংশোধনী আনলেও রোড ইঞ্জিনিয়ারিং, যানবাহনের মান নির্ধারণ, গতি ব্যবস্থাপনা, পথচারীদের সুরক্ষা, জরুরি চিকিৎসা সেবা, গবেষণা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের মতো বিষয়গুলো পর্যাপ্তভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়।

তাই বৈশ্বিক 'সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ'-এর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে একটি পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন আইনটি প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু দুর্ঘটনা পরবর্তী ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দুর্ঘটনা প্রতিরোধমূলক পুলিশিং ও ব্যবস্থাপনার দিকে এগিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।