সাজেকের পথে 'সশস্ত্র গোষ্ঠীর' সঙ্গে সেনাবাহিনীর গোলাগুলি
প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাঙামাটির জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে স্থানীয় দুই সংগঠনের অবরোধের মধ্যে আটকে পড়া পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়ার সময় পাহাড়ের এক 'সশস্ত্র গোষ্ঠীর' সঙ্গে সেনাবাহিনীর গোলাগুলি হয়েছে।
পুলিশ বলছে, গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সাজেকের পথে উজো বাজার এলাকায় গোলাগুলি শুরু হয়। ঘণ্টাখানেক পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।
সাজেক থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন বলেন, সকালে উজো বাজার এলাকায় পর্যটকদের গাড়িবহর আটকে দেন অবরোধকারীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে অবরোধকারীরা ঢিল ছোড়েন।
পরে সড়ক থেকে অবরোধকারীদের সরিয়ে দিয়ে পর্যটকদের নিরাপদে উজো বাজার এলাকা পার করে দেওয়া হয়। তবে অবরোধকারীদের ছোড়া ঢিলে কয়েকজন পর্যটক আহত হন বলে জানান তিনি।
ওসি বলেন, 'একপর্যায়ে সশস্ত্র গোষ্ঠী ইউপিডিএফ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। সেনাবাহিনী তখন পাল্টা গুলি চালায়। কিছু সময় গোলাগুলি চলে।'
পরে বিকালে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা স্থানীয়দের 'জোরপূর্বক মানবঢাল' হিসেবে ব্যবহার করে সড়ক অবরোধ এবং পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর গুলিবর্ষণ করে। এ সময় সেনাবাহিনীর টহল দল আত্মরক্ষা ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পাল্টা গুলি চালালে সশস্ত্র ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।
পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বিত প্রচেষ্টায় অবরুদ্ধ পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয় জানিয়ে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এদিকে দুপুরে রাঙামাটি পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এসপি মুহম্মদ আব্দুর রকিব বলেন, পর্যটকদের নিরাপদে চলে যাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে থেমে থেমে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত গোলাগুলি চলে।
এরপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং বর্তমানে সাজেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে জানিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা রকিব বলেন, এ ঘটনায় কোনো পর্যটক আহত হননি। তবে অবরোধকারীদের ইটের আঘাতে সেনাবাহিনীর চার থেকে পাঁচজন এবং পুলিশের দুজন সদস্য আহত হয়েছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-সন্তু লারমা) 'সশস্ত্র' সদস্যদের বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালি থেকে সরিয়ে নেওয়াসহ তিন দফা দাবিতে সেখানে আন্দোলন চালিয়ে আসছে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন।
এর অংশ হিসেবে বুধবার বিকালে সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ ঘোষণা করে সংগঠন দুটি। সেই সঙ্গে সাজেক থেকে পর্যটকদের চলে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়।
এ পরিস্থিতিতে পর্যটকদের নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে জেলা প্রশাসন। পর্যটকদের বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টার মধ্যে নিরাপদে সাজেক ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
গত বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে সাজেক সড়কের উজো বাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় গাছের গুঁড়ি ফেলে পিকেটিং শুরু করেন অবরোধকারীরা। এদিকে সেনাবাহিনী ও পুলিশের পাহারায় আটকে পড়া পর্যটকদের সাজেক থেকে খাগড়াছড়িতে সরিয়ে নেওয়ার কাজও শুরু হয়।
সাজেক পর্যটনকেন্দ্রের লাইনম্যান হেপিং ত্রিপুরা বলেন, সকালে সাড়ে ৮টার দিকে প্রায় সাড়ে চার শতাধিক ছোট-বড় গাড়ি নিয়ে পর্যটকরা সাজেক ত্যাগ করেন। গাড়িবহরটি সাজেক ভ্যালি থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে উজো বাজার এলাকায় পৌঁছালে অবরোধকারীরা গাড়িবহর আটকে দেন। তাতে প্রায় সোয়া দুই হাজার পর্যটক সেখানে আটকা পড়েন।
সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটির সভাপতি বাবুধন চাকমা সে সময় বলেন, "আমরা শান্তিপূর্ণ অবরোধ পালন করছি। পর্যটকের গাড়িসহ কোনো ধরনের গাড়ি চলতে দেওয়া হবে না। 'আমরা সড়কে অবস্থান নিয়েছি পর্যটকবাহী গাড়িগুলো ছেড়ে দেওয়ার কোনো চিন্তাভাবনা নেই।'
সাজেক থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন সে সময় জানান, তারা অবরোধকারীদের সঙ্গে কথা বলে পর্যটকদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা লাঠিপেটা করলে অবরোধকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাহারায় পর্যটকদের গাড়িবহর বেলা ১১টার দিকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে উজো বাজার এলাকা ত্যাগ করে। এরপর সাড়ে ১১টার দিকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোলাগুলি শুরু হয় বলে পুলিশের ভাষ্য।
তবে গোলাগুলির ওই খবর 'সর্বৈব মিথ্যা ও বানোয়াট' বলে দাবি করেছে পাহাড়ের সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)।
সংগঠনের মুখপাত্র অংগ্য মারমা এক বিবৃতিতে বলেছেন, 'কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে নিরাপত্তা বাহিনীর গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে, সেখানকার জনগণের সঙ্গে কথা বলে এমন খবরের সত্যতার বিন্দুমাত্র প্রমাণ মেলেনি।'
"মূলত জেএসএস সন্তু গ্রুপের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়ার ন্যায্য দাবিতে সাজেকবাসীর চলমান শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধ কর্মসূচি বানচাল করার অপচেষ্টার অংশ হিসেবে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নিজেরা একতরফা বিভিন্ন দিকে গুলিবর্ষণ করেছে।'
শান্তিপূর্ণ অবরোধকারীদের ওপর 'বর্বর হামলা, লাঠিচার্জ, ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের' অভিযোগ তুলে এর নিন্দা জানান অংগ্য মারমা।
তিনি অবিলম্বে সাজেকবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের 'ন্যায্য দাবি' মেনে নিয়ে ওই এলাকা থেকে জেএসএস (সন্তু লারমা)-এর 'সশস্ত্র' সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানান।
সেনাবাহিনীর সহায়তায় সাজেক থেকে নিরাপদে ফিরেছেন পর্যটকরা :
সেনাবাহিনীর সহায়তায় সাজেকে আটকে পড়া পর্যটকদের গাড়িবহর খাগড়াছড়ি শহরে পৌঁছেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর পৌনে ১টার দিকে পর্যটকবাহী গাড়ির বহরটি খাগড়াছড়ি শহরে এসে পৌঁছায়। এর আগে সকাল পৌনে ৯টার দিকে তারা সাজেক থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথে বিভিন্ন স্থানে অবরোধের মুখে পড়লেও সেনাবাহিনীর সহায়তায় নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছান তারা। পর্যটকরা জানান, সাজেকে চলমান আন্দোলন ও সড়ক অবরোধের কারণে তারা আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন। ফেরার পথে কয়েকটি স্থানে অবরোধকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে। তবে এ ঘটনায় পর্যটকদের কোনও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
ঢাকা থেকে সাজেকে বেড়াতে আসা পর্যটক আবুল কাশেম বলেন, আমরা দুই রাত তিন দিনের ট্যুরে বুধবার সাজেকে গিয়েছিলাম। সেখানে পৌঁছে সন্ধ্যায় জানতে পারি, আন্দোলন চলছে। আজ (গতকাল) আমাদের সাজেক থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিন দিনের জন্য গাড়ি ভাড়া করে অগ্রিম টাকা দিয়েছি। এখন গাড়িভাড়ার বিষয়টি কীভাবে সমাধান হবে, তা দেখতে হবে। এ ছাড়া ঢাকায় ফেরার বাসের টিকিটও দুই দিন পরের। এখন বাস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
অয়ন নামে আরেক পর্যটক বলেন, সাজেক থেকে সেনাবাহিনীর এস্কটের মাধ্যমে পর্যটকবাহী গাড়িগুলো খাগড়াছড়িতে নিয়ে আসা হয়। পথে দুটি স্থানে প্রায় আধাঘণ্টা করে অপেক্ষা করতে হয়েছে। আন্দোলনকারীরা সড়ক অবরোধ করে রাখায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী আমাদের নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে এসেছে। কয়েকটি স্থানে অবরোধকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সড়কের ওপর অসংখ্য ভাঙা ইট ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। তবে পর্যটকদের কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
হবিগঞ্জ থেকে বেড়াতে আসা পর্যটক অপু বলেন, ঘুরতে এসেছি আনন্দ করতে। কিন্তু এখানে এসে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছি। আমরা গতকাল সাজেকে গিয়েছিলাম। আন্দোলনের কারণে ভালোভাবে সাজেক ঘুরে দেখতে পারিনি। সন্ধ্যা থেকে বিভিন্ন ধরনের আন্দোলনের খবর শুনছিলাম। নিরাপদে ফিরতে পারবো কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলাম। শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় নিরাপদে খাগড়াছড়িতে পৌঁছেছি। তিনি জানান, ফেরার পথে দুটি স্থানে আটকে পড়েছিলেন তারা। তাদের গাড়িবহরের আগে সেনাবাহিনীর কয়েকটি গাড়ি ছিল। আন্দোলনকারীরা সেনাবাহিনী ও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। পরে নিরাপত্তা বাহিনী অবরোধকারীদের সড়কের দুই পাশে ছত্রভঙ্গ করে পর্যটকবাহী গাড়িগুলো দ্রুত ওই এলাকা পার করে দেয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার রাতে সাজেকে ২ হাজার ৬০০ জনের বেশি পর্যটক অবস্থান করছিলেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে তাদের মধ্যে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে সেনাবাহিনী সহযোগিতা করে।
