১৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ
নাব্যসংকটে ধুঁকছে পায়রা সমুদ্রবন্দর
প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৩ বছরে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পরও পায়রা সমুদ্রবন্দরের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ রাবনাবাদ চ্যানেলে পলি জমে যাওয়ায় বড় জাহাজ সরাসরি বন্দরে প্রবেশ করতে পারছে না। ফলে মিলছে না বিপুল সরকারি বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল।
চ্যানেলটির মূল খননকাজে (ক্যাপিটাল ড্রেজিং) এরই মধ্যে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এরপরও চ্যানেলের গভীরতা কমে যাওয়ায় পণ্য খালাস ও পরিবহনে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত ধাপ, বেড়েছে পরিবহন খরচ। এতে পায়রা ও আরপিসিএল-নরিনকো তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা সরবরাহও ব্যাহত হচ্ছে।
অন্যদিকে, বন্দরের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে দুটি হপার ড্রেজার কেনা এবং চ্যানেলের রক্ষণাবেক্ষণ খননকাজের জন্য প্রায় ৪ হাজার ৬৬২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নিয়েছিল বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে প্রকল্পটির ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় একনেকে উপস্থাপনের আগেই তা নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল সৈয়দ সাইফুল ইসলাম বলেন, খননকাজের মাধ্যমে চ্যানেলের প্রয়োজনীয় গভীরতা ফিরিয়ে আনা গেলে বন্দরের সক্ষমতা বাড়বে। তখন কয়লাবাহী মাদার ভেসেলসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যবাহী বড় জাহাজ সরাসরি বন্দরে প্রবেশ করতে পারবে।
তিনি আরও বলেন, নাব্যসংকট যাতে বারবার ফিরে না আসে, সে জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ।
গত ১২ অক্টোবর জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের উপস্থাপিত প্রতিবেদনে চ্যানেলের নাব্য ও বন্দরের কার্যক্রম পরিচালনার নানা চ্যালেঞ্জ উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পায়রা বন্দরে টার্মিনাল, জেটি, ইয়ার্ড, সড়কসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগের পরও চলমান নাব্যসংকট চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমানো এবং দক্ষিণাঞ্চলে শিল্পায়ন এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
পায়রা বন্দরকে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে রাবনাবাদ চ্যানেল। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীব্যবস্থার বিপুল পরিমাণ পলি দক্ষিণাঞ্চলের নদী ও মোহনা দিয়ে বঙ্গোপসাগরে প্রবাহিত হয়। নদী ও মোহনার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় রাবনাবাদ চ্যানেলে পলি জমার প্রবণতা বেশি।
পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, উজান থেকে আসা ২০ শতাংশ পলিমিশ্রিত পানি পায়রা বন্দরের রাবনাবাদ চ্যানেল ও আশপাশের অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে একবার খনন করে গভীরতা বাড়ানো হলেও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া তা ধরে রাখা কঠিন।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের আগস্টে শুরু হওয়া চ্যানেলের মূল ও রক্ষণাবেক্ষণ খননকাজ ২০২৪ সালের এপ্রিলে শেষ হয়। এতে চ্যানেলের গভীরতা ১০.৫ মিটারে উন্নীত করা হয়েছিল। ফলে ২০০ মিটার পর্যন্ত দৈর্ঘ্য, ৩০ মিটার প্রস্থ এবং ১০.৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ চলাচলের সুযোগ তৈরি হয়।
তবে পরবর্তী সময়ে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ খননকাজের ঘাটতিতে চ্যানেলের বিভিন্ন অংশের গভীরতা কমে গেছে বলে জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এতে বড় জাহাজের প্রবেশ সীমিত হয়ে পড়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের ২০২৬ সালের মে মাসের তথ্যচিত্র অনুযায়ী, চ্যানেলের গড় গভীরতা কমে ৫.৪ থেকে ৫.৯ মিটারে নেমে এসেছে। চ্যানেলের কিছু অংশে জাহাজ চলাচলের জন্য সর্বোচ্চ প্রায় ৬.৫ মিটার ড্রাফট পাওয়া যাচ্ছে। অথচ মূল খননকাজের আগে চ্যানেলটির প্রাকৃতিক গভীরতা ছিল প্রায় ৫.৬ মিটার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাবনাবাদ চ্যানেলের নাব্যসংকটের প্রভাব পড়ছে পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেডের (আরএনপিএল) কয়লা পরিবহনে। বড় কয়লাবাহী জাহাজ সরাসরি জেটিতে আসতে না পারলে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর বা কুতুবদিয়া এলাকায় বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে কয়লা স্থানান্তর করে পায়রায় আনতে হয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এতে পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত ধাপ যুক্ত হওয়ায় সময় ও পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। এর প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়েও পড়তে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ কারণে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৭০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ছে।
রাবনাবাদ চ্যানেলের রক্ষণাবেক্ষণ খননকাজ এবং হপার ড্রেজার কেনার জন্য প্রায় ৪ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার ঘনমিটার ধারণক্ষমতার দুটি ড্রেজার কিনতে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়। তবে প্রকল্পটির ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় একনেকে উপস্থাপনের আগেই তা নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠায় পরিকল্পনা কমিশন।
প্রকল্পটির আওতায় ১২ লাখ ঘনমিটার পলি অপসারণ করে চ্যানেলের গভীরতা ৯ মিটারে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ড্রেজার দুটি কেনা হলে বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেরাই রক্ষণাবেক্ষণ খননকাজ চালাতে পারবে। এতে বাইরের ঠিকাদারদের ওপর নির্ভরতা কমবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে পায়রা বন্দরে ১১১টি বিদেশি জাহাজ আসে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ সংখ্যা বেড়ে ১২৩টিতে দাঁড়ায়। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ৮৫টিতে নেমে আসে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশি জাহাজের সংখ্যা আরও কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৯টিতে।
অন্যদিকে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরে পণ্য ওঠানামার পরিমাণ বেড়ে ৫৫ লাখ ১৩ হাজার মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে। নাব্যসংকট থাকলেও পায়রা বন্দরের অবকাঠামো নির্মাণে অগ্রগতি হয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম টার্মিনাল প্রকল্পের আওতায় ৬৫০ মিটার জেটি, ৩ লাখ ২৫ হাজার বর্গমিটার ব্যাকআপ ইয়ার্ড, ১০০ মিটার সার্ভিস জেটি, দুটি ওয়ার্ক বোট এবং বিভিন্ন পণ্য ওঠানামার সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি গুদাম, পানিশোধন প্ল্যান্ট, অভ্যন্তরীণ সড়ক ও বিদ্যুৎ-সংযোগের অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে।
প্রথম টার্মিনালের নির্মাণকাজ আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে বন্দরটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া বন্দরের সঙ্গে ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কের সংযোগকারী ৬.৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ছয় লেনের সড়ক এবং আন্ধারমানিক নদীর ওপর ১ হাজার ১৮০ মিটার দীর্ঘ চার লেনের সেতুর নির্মাণকাজও আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রিফাত ফেরদৌস বলেন, পায়রা বন্দর এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে এটিকে কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেই হবে।
তিনি বলেন, 'এখন আর বন্দরটি বন্ধ করে দেওয়া যায় না। এটি চালু করতে অতিরিক্ত বিনিয়োগের প্রয়োজন হলেও তা করতে হবে। এরপর বন্দরের আয়-ব্যয়ের হিসাব মূল্যায়ন করা যেতে পারে।' তবে সরকারি অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বন্দরটি কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বরিশাল শাখার সভাপতি গাজী জাহিদ হোসেন নতুন প্রকল্প অনুমোদনের আগে আগের খননকাজে ব্যয় করা অর্থের যথাযথ মূল্যায়নের দাবি জানান।
তিনি বলেন, 'প্রতিটি প্রকল্পে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। দুই-তিন বছর পরপর বড় খনন প্রকল্প নেওয়ার পরিবর্তে বন্দরের জন্য নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ খননকাজের একটি স্থায়ী পরিকল্পনা প্রয়োজন।'
তার মতে, পায়রা বন্দরের মূল চ্যালেঞ্জ শুধু চ্যানেলের গভীরতা ফিরিয়ে আনা নয়, বরং তা ধরে রাখা। নিয়মিত খননকাজ, পর্যাপ্ত পণ্য পরিবহন এবং কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে বন্দরে সরকারি বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
