চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাম্বুসেটাম
বাঁশের বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি সংরক্ষণে ভিন্ন উদ্যোগ
শুক্রবারের বিশেষ খবর
প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
গাজী মুনছুর আজিজ

বাংলাদেশে ক্রমেই কমে আসা বাঁশের প্রজাতি সংরক্ষণ এবং উদ্ভাবনী গবেষণার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) বন ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট একটি ব্যতিক্রমী বাঁশবাগান প্রতিষ্ঠা করেছে। এ বিশেষ বাগানটি 'বাম্বুসেটাম' (Bambusetum) নামে পরিচিত। ইনস্টিটিউটের একাডেমিক ভবনের পেছনে মনোরম পাহাড়ি পরিবেশে পাঁচ একর জায়গাজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে এ বাগান। এটি শিক্ষার্থী, স্'ানীয় গবেষক ও বিদেশি দর্শনার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে।
কয়েক দশক আগেও বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর বাঁশঝাড় দেখা যেত। বাড়ির আশপাশে, রাস্তার ধারে এবং বনে বাঁশের সমারোহ ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্' দ্রুত নগরায়ণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে বাঁশের বিস্তার কমে এসেছে। এর ফলে বাঁশের বেশ কয়েকটি প্রজাতি হুমকির মুখে পড়েছে। এ ছাড়া গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে বাঁশের প্রজাতির সংখ্যা ৪০টির বেশি থেকে কমে ৩৩টিতে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে কিছু প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
এ উদ্বেগজনক পরিস্'িতি মোকাবিলা এবং বিদেশি বাঁশের প্রজাতি বাংলাদেশের জলবায়ুতে কতটা উপযোগী, তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার লক্ষ্যে ইনস্টিটিউটটি এ বাঁশবাগান প্রতিষ্ঠা করে। ব্যতিক্রমী এ বাগানে বর্তমানে দেশীয় বাঁশের ১৭টি প্রজাতি এবং বিদেশ থেকে আনা একটি প্রজাতি রয়েছে। বাংলাদেশের বাঁশের বৈচিত্র্য তুলে ধরতে দক্ষতার সঙ্গে এসব প্রজাতির পরিচর্যা করা হে"ছ।
বাগানে প্রবেশ করলে বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশঝাড় চোখে পড়বে। প্রতিটি প্রজাতির পাশে কিউআর কোডযুক্ত পরিচিতিফলক রয়েছে। এসব কোড স্ক্যান করে দর্শনার্থীরা সহজেই সংশ্লিষ্ট বাঁশের উৎপত্তি, বৈশিষ্ট্য ও পরিচিতি সম্পর্কে জানতে পারবেন। বাগানের উল্লেখযোগ্য প্রজাতিগুলোর মধ্যে রয়েছে বরাক বাঁশ। শক্ত কাঠামোর জন্য পরিচিত এ বাঁশ উত্তরবঙ্গ ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণকাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এখানে আরও রয়েছে কাঁটা বাঁশ, যার ঘন কাঁটা ইঁদুরের মতো প্রাণীকেও দূরে রাখে। একসময় সিলেট অঞ্চলে প্রচুর জন্মানো তেতুয়া বাঁশ বর্তমানে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
এ ছাড়া রয়েছে কঙ্বাজার অঞ্চলের ভুদুম বাঁশ। ঐতিহাসিকভাবে মাছ ধরার জাল তৈরিতে ব্যবহৃত এ বাঁশ বর্তমানে হস্তশিল্প তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাগানে রয়েছে সোনালি বাঁশও। সোনালি-সবুজ ডোরাকাটা বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি দেখতে বেশ আকর্ষণীয়। বাগানটিতে চীন থেকে আনা অ্যাসপার বাঁশও রয়েছে। বাংলাদেশের জলবায়ুতে খাপ খাইয়ে নেওয়া এ বাঁশ দেশীয় প্রজাতির মতোই শক্ত ও মজবুত বলে পরিচিত।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আকতার হোসেন জানান, বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহায়তায় প্রায় ২০ বছর আগে বাম্বুসেটাম প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। বর্তমানে বাগানটিতে ১০ হাজারের বেশি বাঁশ রয়েছে। এটি একই সঙ্গে বাঁশের প্রজাতি সংরক্ষণের ভান্ডার এবং গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক বাগানটি পরিদর্শন করে এর প্রশংসাও করেছেন। অধ্যাপক ড. মো. আকতার হোসেন বলেন, বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের লক্ষ্য শুধু দেশীয় বাঁশের প্রজাতি সংরক্ষণ করা নয়; বরং নতুন জাত উদ্ভাবন ও উন্নয়নেও কাজ করা।
