শীতকালীন সবজির দাম চড়া স্বস্তি ফিরছে ডিমে

* ১০০ টাকার নিচে মিলছে না অধিকাংশ সবজি * মাছ-মাংসের দোকান এড়িয়ে চলছেন অনেক ক্রেতা, অপরিবর্তিত মুদিবাজার * এক তরকারিতেই সীমাবদ্ধ নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা

প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

সপ্তাহের বাজার করতে গিয়ে আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন রাজধানীর নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর খাবারের বাজারে ব্যয় করার মতো অর্থ সীমিত হয়ে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের জন্য একাধিক পদের সবজি কেনাও অনেকের কাছে কঠিন হয়ে উঠেছে। কেউ প্রয়োজনের তুলনায় কম সবজি কিনছেন, কেউ আবার বেশি দামের পণ্য বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত সস্তা বিকল্প খুঁজছেন। এতে প্রতিদিনের খাবারের তালিকা ঠিক রাখার পাশাপাশি সংসারের খরচ সামলানোও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর মিরপুর-৬, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও ও ৬০ ফিট এলাকার বাজার ঘুরে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব জানা গেছে।

ক্রেতারা বলছেন, তাদের জন্য চাপ শুধু সবজির দামেই সীমাবদ্ধ নয়। মাছ-মাংসের দামও তুলনামূলক বেশি থাকায় প্রতিদিনের খাবারে কোন পণ্য কতটা রাখা যাবে, তা নিয়ে হিসাব করতে হচ্ছে। মাছ-মাংসের বদলে সবজি দিয়ে খাবারের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করলেও সবজির দাম বেশি হওয়ায় স্বস্তি মিলছে না। ফলে পরিবারের সদস্যদের পছন্দ ও প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বাজারে সবজির দামে মৌসুমের প্রভাবও রয়েছে। শীতের আগাম সবজি উঠতে শুরু করলেও কিছু পণ্যের সরবরাহ সীমিত থাকায় দাম বেশি। ক্রেতাদের অভিযোগ, অল্প কয়েকটি সবজি কিনতেও উল্লেখযোগ্য অর্থ খরচ হচ্ছে। ফলে আগে যে টাকায় কয়েক ধরনের সবজি কেনা যেত, এখন সেই টাকায় তুলনামূলক কম পণ্য কিনতে হচ্ছে। গতকাল শুক্রবারের বাজারদর অনুযায়ী, ফুলকপি, ঝিঙা, লাউ, কচুমুখি ও পটল বিক্রি হয়েছে কেজিপ্রতি ৮০ টাকায়। বেগুন ও কাঁকরোলের দাম ছিল ১০০ টাকা কেজি। শীতের আগাম মুলা ও ঢ্যাঁড়স বিক্রি হয়েছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে। আগাম শিমের কেজি ছিল ১৬০ টাকা। নতুন আলু বিক্রি হয়েছে ১৪০ টাকা এবং টমেটো ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে। এসব দামে অধিকাংশ সবজি কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে।

সবজির পাশাপাশি মাছ-মাংসের দামও সংসারের বাজার খরচ বাড়াচ্ছে। তেলাপিয়া মাছের কেজি ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা, গরুর মাংস ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

বাজারের বিক্রেতা আমজাদ হোসেন জানান, ছুটির সময়ে কাঁচাবাজারে বেচাকেনা কিছুটা কমলেও সবজির দাম তেমন কমেনি। ক্রেতারা মাছ-মাংস না কিনলেও পরিবারের জন্য সবজি কেনেন। দাম কমলে বিক্রেতারাও কম দামে বিক্রি করতে পারবেন।

বাজারের বাড়তি খরচের প্রভাব পড়ছে পরিবারের খাবারের তালিকায়ও। একাধিক পদের সবজি কেনার বদলে অনেকে এক বা দুই ধরনের সবজি কিনছেন। আবার কেউ কেউ প্রয়োজনীয় পরিমাণের চেয়ে কম কিনে দিনের খরচ সামলানোর চেষ্টা করছেন। এতে খাবারের বৈচিত্র্য কমছে, পাশাপাশি পরিবারের সবার পছন্দ অনুযায়ী খাবার পরিবেশন করাও কঠিন হচ্ছে। বেসরকারি চাকরিজীবী আলাউদ্দিন জানান, বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা ও অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার খরচ মেটানোর পর সংসারের অন্যান্য ব্যয় সামলাতে হয়। ফলে বাজারের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তার ভাষ্য, সংসারের খরচ মেটাতে গিয়ে এখন একাধিক তরকারি কেনার সামর্থ্য কমে গেছে।

মিরপুর-৬ এলাকার সবজি বিক্রেতা কামাল হোসেন জানান, মৌসুমের শুরুতে কিছু সবজির সরবরাহ কম থাকায় দাম তুলনামূলক বেশি। বেশি দামের কারণে ক্রেতারা আগের মতো একসঙ্গে কয়েক ধরনের সবজি কিনছেন না। অনেকে দাম শুনে পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ দরদাম করে অল্প সবজি নিয়ে ফিরছেন। এতে বিক্রি হলেও ক্রেতাপ্রতি কেনাকাটার পরিমাণ কমেছে।

মাছ-মাংসের দোকান এড়িয়ে চলছেন অনেক ক্রেতা, অপরিবর্তিত মুদিবাজার : রাজধানীর বাজারে মাছ-মাংসের দোকান এড়িয়ে চলছেন অনেক ক্রেতা। বাজারে এসে সবজি কিনলেও মাছ-মাংসের দাম শুনেই ফিরে যাচ্ছেন কেউ কেউ। পাইকারি ও খুচরা বাজারে একই পণ্যের দামে কেজিতে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা পর্যন্ত ব্যবধান থাকলেও সাধারণ ক্রেতাদের জন্য স্বস্তির খবর নেই। অন্যদিকে, গত সপ্তাহের তুলনায় ডিম ও ব্রয়লার মুরগির দাম কিছুটা কমলেও চালসহ অধিকাংশ মুদিপণ্যের দাম রয়েছে অপরিবর্তিত। সবজির বাজারেও চড়া দাম অব্যাহত থাকায় সীমিত আয়ের পরিবারগুলোকে এক-দুই পদের তরকারি দিয়েই সংসার চালাতে হচ্ছে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, শ্যামবাজারসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

বাজার করতে আসা অনেক ক্রেতাকে মাছ-মাংসের দোকানে দাম জেনে ফিরে যেতে দেখা গেছে। ক্রেতা রাকিবুল ইসলাম বলেন, 'আমাদের জন্য মাছ হচ্ছে তেলাপিয়া আর পাঙাশ। ওই দুইটার কেজিও এখন প্রায় ৩০০ টাকা। অন্য মাছগুলোর দাম কিংবা গরু-খাসির মাংসের দাম শুনে তো লাভ নেই। তাই ওদিকে উঁকি দিয়েই চলে এলাম।'

যাত্রাবাড়ী ও শ্যামবাজারে তেলাপিয়া মাছ ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা, রুই ৩৫০ থেকে ৬০০ টাকা এবং কাতলা ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া চিংড়ি ৮০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, পাবদা ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা, বোয়াল ৬০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং রূপচাঁদা ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

দুই কেজি ওজনের রুই ও কাতলা মাছ ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও স্থানীয় বাজারে দাম ৩৫০ থেকে ৩৬০ টাকা। দেড় থেকে দুই কেজি ওজনের পাঙাশ পাইকারিতে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং স্থানীয় বাজারে ২২০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

মাংসের দামেও পাইকারি-খুচরায় ব্যবধান : পাইকারি ও খুচরা বাজারে মাংসের দামেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। কাওরান বাজারে ব্রয়লার মুরগি ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও স্থানীয় বাজারে দাম ১৯০ থেকে ২০০ টাকা। সোনালি মুরগি পাইকারিতে ৩১০ থেকে ৩২০ টাকা এবং স্থানীয় বাজারে ৩৪০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংস পাইকারি বাজারে ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে পাওয়া গেলেও স্থানীয় বাজারে দাম ৮২০ থেকে ৮৫০ টাকা। খাসির মাংস পাইকারিতে ১ হাজার ৩০০ টাকা কেজি হলেও স্থানীয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ টাকায়। অর্থাৎ, খাসির মাংসে কেজিতে ১০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে ক্রেতাদের। ছাগলের মাংসেও কেজিতে ৫০ টাকা পর্যন্ত ব্যবধান রয়েছে।

চড়া দামে সবজি, অপরিবর্তিত মুদিপণ্য : মাছ-মাংসের পাশাপাশি সবজির বাজারেও স্বস্তি নেই। যাত্রাবাড়ী ও শ্যামবাজারে ফুলকপি, ঝিঙা, লাউ, কচুমুখী ও পটল ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।