শিল্পকারখানার বায়ুদূষণ

হুমকির মুখে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র

প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

সুন্দরবনের চারপাশে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানা থেকে ক্রমবর্ধমান বায়ুদূষণ বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনটির বাস্তুতন্ত্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বায়ুদূষণ সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য ক্রমেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর ফলে উদ্ভিদের শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং বনটির সামগ্রিকভাবে প্রতিকূলতা মোকাবিলার সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশে বাঘের প্রাকৃতিক আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত এ বনটির অস্তিত্বের জন্য পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল এইচ খান বাসসকে বলেন, 'বায়ুদূষণ সরাসরি উদ্ভিদের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। শিল্পকারখানার ধুলাবালি পাতার ওপর জমলে সূর্যের আলো বাধাগ্রস্ত হয় এবং পাতার পত্ররন্ধ্র বন্ধ হয়ে যায়। এতে সালোকসংশ্লেষণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং উদ্ভিদের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।' সালোকসংশ্লেষণ হলো এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে সবুজ উদ্ভিদ সূর্যের আলো, পানি ও কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান তৈরি করে এবং বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন ছেড়ে দেয়। অধ্যাপক মনিরুল বলেন, উদ্ভিদরাজি খাদ্যজালের ভিত্তি তৈরি করে। ফলে উদ্ভিদের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হলে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী ও সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ওপর ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

সম্প্রতি সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) এবং আরণ্যক ফাউন্ডেশনের যৌথ এক গবেষণায় সুন্দরবনের বায়ুদূষণের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় বনের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সূক্ষ্ম বস্তুকণা (পিএম২.৫) ও ধুলিকণার (পিএম১০) বিপজ্জনক মাত্রা শনাক্ত করা হয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে সুন্দরবনের খুলনা, সাতক্ষীরা, শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে এ গবেষণার মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, শরণখোলা রেঞ্জে পিএম২.৫-এর ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ১০২ মাইক্রোগ্রামে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, পিএম১০-এর মাত্রা সর্বোচ্চ প্রতি ঘনমিটারে ১১৪ মাইক্রোগ্রাম রেকর্ড করা হয়েছে। দূষণমাত্রার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চাঁদপাই রেঞ্জ। সেখানে পিএম২.৫-এর ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ৮৯ দশমিক ৩ মাইক্রোগ্রাম এবং পিএম১০-এর ঘনত্ব ৯৮ দশমিক ১ মাইক্রোগ্রাম পাওয়া গেছে। অধ্যাপক মনিরুল বলেন, বনের আশপাশে ভারী শিল্পকারখানা ও সিমেন্ট কারখানার বিস্তার বায়ুর গুণগত মানের অবনতির জন্য সরাসরি দায়ী। তিনি বলেন, 'শিল্পদূষণ ধীরগতির বিষের মতো কাজ করে। এর প্রভাব ক্রমে জমা হতে থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি বাড়ায়। ফলে ভয়াবহ ক্ষতির লক্ষণ তাৎক্ষণিকভাবে বা স্পষ্টভাবে দেখা নাও যেতে পারে।' সিইজিআইএসের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মালিক ফিদা এ খান বলেন, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দ্রুত শিল্পায়নের ফলে সংলগ্ন বনাঞ্চলের বায়ুর গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, সিমেন্ট কারখানায় কাঁচামাল ক্লিংকার প্রক্রিয়াজাত করার সময় বিপুল পরিমাণ সূক্ষ্ম ধুলিকণা (পিএম১০) ও শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করতে সক্ষম বিপজ্জনক কণা (পিএম২.৫) নির্গত হয়। প্রচলিত বাতাসের প্রবাহ এসব দূষণকারী উপাদানকে বনাঞ্চলের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

দূষণের সব উৎস শনাক্ত করার জরুরি প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ফিদা এ খান বলেন, 'সুন্দরবনের চারপাশে পরিচালিত উচ্চমাত্রার দূষণকারী সিমেন্ট কারখানাগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া বা বন্ধ করা না গেলে এই ঝুঁকিপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বন রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।' অধ্যাপক মনিরুলের উদ্বেগের সঙ্গে একমত পোষণ করে তিনি বলেন, বিষাক্ত বস্তুকণা নীরবে উদ্ভিদরাজির ক্ষতি করছে। বাস্তুতন্ত্রের বিপর্যয়ের প্রকৃত ব্যাপকতা হয়তো আরও এক দশক পর স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হবে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিইজিআইএস-আরণ্যক ফাউন্ডেশনের যৌথ গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র অবিলম্বে স্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে বিশেষভাবে পিএম২.৫ ও সালফার ডাই-অক্সাইডের (এসও২) মাত্রা পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া শিল্পকারখানা থেকে নির্গত দূষণকারী উপাদান কীভাবে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, তা নির্ভুলভাবে বিশ্লেষণ ও পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বাতাসের গতি এবং বৃষ্টিপাতের ধরনসহ আবহাওয়াসংক্রান্ত তাৎক্ষণিক তথ্য পর্যবেক্ষণব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথাও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ অংশে সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত এই বন সমৃদ্ধ ও বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, সরীসৃপ, পাখি ও জলজ প্রাণীর বসবাস।