সুসংবাদ প্রতিদিন

পাখিই রক্ষা করছে রোপা আমন ধান

প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  এ আর মিন্টু, রংপুর

রংপুর অঞ্চলে রোপা আমন ধানখেতে ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনে কীটনাশকের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী পার্চিং পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কীটনাশক নয় পাখিই রক্ষা করছে রংপুর অঞ্চলে রোপা আমন ধান। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রংপুরে এবার ১ লাখ ৬৬ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধান চাষ হয়েছে। কিছুটা আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় রংপুরের কোনো কোনো এলাকায় রোপা আমন ধানের ফলন বেশ ভালো হয়েছে। উৎপাদনের ও লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। সংশ্লিষ্টদের আশা, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার জেলায় খাদ্যের চাহিদা মিটিয়ে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মেট্রিক টনের অধিক চাল উদ্বৃত্ত থাকবে। যা দিয়ে অন্য জেলার চাহিদা মেটাবে। চলতি বছর রোপা আমনে ১৪৬৯২৫ হেক্টর জমিতে পার্চিং হয়েছে। যা রোপণের ৮৮%। এর মধ্যে ১৫৫০০ হেক্টর জমিতে লাইফ পার্চিং (ধইঞ্চা দিয়ে) এবং ১৩১৪২৫ হেক্টর জমিতে ডেড পার্চিং (গাছের ডাল, বাঁশের কঞ্চি, বাঁশের পাতা ইত্যাদি) হয়েছে। রোপা আমন ধানখেতে ক্ষতিকর পোকা-মাকড় দমনে কীটনাশকের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী পার্চিং পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ পদ্ধতিতে ধানখেতের আইল বা জমির মাঝে ধইঞ্চা গাছ, গাছের ডাল, বাঁশের কঞ্চি কিংবা খুঁটি স্থাপন করে পোকাখেকো পাখিকে আকৃষ্ট করা হয়। এসব পাখি ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসল রক্ষা করে।

রংপুরের কাউনিয়ায় উপজেলার কৃষকরা মূলত দুই ধরনের পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করছেন ডেড পার্চিং ও লাইভপার্টিং। ডেড পার্চিংয়ে জমিতে গাছের ডাল, বাঁশের কঞ্চি বা খুঁটি পুতে দেওয়া হয়। আর লাইভপার্চিংয়ে জমিতে ধইঞ্চা বা অন্য কোনো জীবিত গাছ লাগিয়ে পাখির বসার ব্যবস্থা করা হয়। সরেজমিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকদের রোপণ করা আমন ধানের ক্ষেত এখন সবুজে ছেয়ে গেছে। কোথাও ধানে শিষ বের হয়েছে, আবার কোথাও ধান পাকতে শুরু করেছে। দিগন্তজোড়া সবুজ ধানের মাঠের মাঝে দেখা যাচ্ছে ধইঞ্চা গাছ, গাছের ডাল ও বাঁশের কঞ্চি। এসব পার্চিংয়ের ওপর বসে ফিঙে, শালিক, বুলবুলি দোয়েলসহ বিভিন্ন পোকাখেকো পাখি ক্ষতিকর পোকামাকড় ধরে খাচ্ছে। কৃষকরা জানান, পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহারে একদিকে যেমন কীটনাশকের খরচ কমছে, অন্যদিকে পরিবেশও দূষণমুক্ত থাকছে। একই বিষ্ঠা জমিতে প্রাকৃতিক সঙ্গে পানির বেরে যোগ হয়ে মাটির ও উর্বরতা বাড়াতে সহায়তা করছে। নিজপাড়া গ্রামের কৃষক নাছির উদ্দিন বলেন, "পোকার আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষায় পার্চিং পদ্ধতি বেশ কার্যকর। এটি পরিবেশবান্ধব এবং খরচও অনেক কম। তাই আমরা কীটনাশকের পরিবর্তে এ পদ্ধতি ব্যবহার করছি।" গদাই গ্রামের ধানচাষি শাহজাহান মন্ডল বলেন, 'এবার আমাদের জমির ধান বেশ সবুজ ও সতেজ হয়েছে। পুরো থেতেই পার্চিংপদ্ধতি ব্যবহার করেছি। আর কিছুদিন পরই আশা করছি সোনালি ধান ঘরে তুলতে পারব।"

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পার্চিং পদ্ধতিতে উৎপাদন খরচ ও কীটনাশকের ব্যবহার কমে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। অনেক কৃষক আমন ধানখেতে কীটনাশক ব্যবহার না করে পোকা দমনে সহজ, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব এই পদ্ধতি গ্রহণ করছেন। কৃষি বিভাগ জানায়, আমন ধানের প্রধান ক্ষতিকর পোকামাকড়ের মধ্যে রয়েছে— মাজরা পোকা, পাতা মোড়ানো পোকা, চুঙ্গি পোকা ও লেদা পোকার মথ পার্টিংয়ের ওপর বসা পাখিরা এসব পোকা ও কীড়া ধরে খেয়ে ফেলে। ফলে পোকামাকড় ডিম পাড়ার আগেই অনেকাংশে ধ্বংস হয় এবং প্রাকৃতিকভাবেই তাদের বংশবিস্তার কমে যায়।

কাউনিয়া উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন জানান, উপজেলার রাজিব ব্লকের কৃষক মফিজুল ইসলাম নিজদর্পা গ্রামের আছর উদ্দিনসহ বহু কৃষক "পোকার আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষায় পার্চিংপদ্ধতি বেশ কার্যকর। এটি পরিবেশবান্ধব এবং খরচও অনেক কমেছে বলে মনে করেন তিনি। কৃষি বিভাগের পরামর্শে আমন মৌসুমের শুরুতেই কৃষকরা এই প্রাকৃতিক ও লাভজনক পদ্ধতি প্রয়োগ করছেন।

রংপুর সদর উপজেলার উত্তর খলেয়া পন্ডিত পাড়ার কৃষক রতন চন্দ্র জানান, এক বিঘা জমিতে আমন চ্ষ করেছেন। তিনি লাইফ পার্চিং দিয়ে জমিতে দিয়েছেন। এতে করে তার পাকা দমনে সহজ, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব হয়েছে। তিনি পুরো খেতেই পার্চিংপদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। ফনলও বেশ ভালো হয়েছে। মিঠাপুকুর উপজেলা কৃষি অফিসার মো: লোকমান হাকিম জানান, এ উপজেলায় বিশেষ করে নিচু জমিতে ধইঞ্চা দিয়ে, গাছের ডাল, বাঁশের কঞ্চি, বাঁশের পাতা ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়েছে। পায়রাবন্দ গ্রামের কৃষক আব্দুস সবুর এক একর জমিতে 'পোকার আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষায় পার্চিংপদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। এসব পার্চিংয়ের ওপর বসে ফিঙে, শালিক, বুলবুলি দোয়েলসহ বিভিন্ন পোকাখেকো পাখি ক্ষতিকর পোকামাকড় ধরে খাচ্ছে।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) কৃষিবিদ সাইফুল আলম জানান, কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, জেলার ৮ উপজেলায় পার্চিংপদ্ধতি ব্যবহারের ফলে কীটনাশক বা বালাইনাশক কেনার খরচ প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় কমার পাশাপাশি কৃষকের রোপা আমনের ফলন ও ভালো হয়েছে। কীটনাশকের খরচ কমছে, অন্যদিকে পরিবেশও দূষণমুক্ত থাকছে। একই বিষ্ঠা জমিতে প্রাকৃতিক সঙ্গে পানির বেরে যোগ হয়ে মাটির ও উর্বরতা বাড়াতে সহায়তা করছে। তিনি আশা করেন, দিন দিন এ পদ্ধতিতে কৃষক কৃষি সতেজ হবে।