সাপের বিষের প্রতিষেধক গবেষণা থমকে আছে অর্থের অভাবে
প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় নিজস্ব অ্যান্টিভেনম বা প্রতিষেধক তৈরির উদ্যোগ থমকে আছে অর্থের অভাবে। রাসেলস ভাইপারের অ্যান্টিবডি তৈরির কাজ শেষ করে দুই বছর আগেই সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ভেনম রিসার্চ সেন্টার। তবে ২০২৪ সালের ৩০ জুনের পর থেকে সরকারি অর্থায়ন বন্ধ থাকায় পরবর্তী গবেষণা কার্যক্রম এগোচ্ছে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, প্রকল্পটি ভবিষ্যতে পরিচালন বা রাজস্ব খাত কিংবা উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) আওতায় চালানো হবে কি না, সে বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। সাপের কামড়ে বছরে হাজারো মৃত্যু ২০২৩ সালের সরকারি তথ্যের বরাত দিয়ে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন। এতে সাড়ে সাত হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় বলে ওই তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২০১৭ সালে সাপের কামড়কে 'চরম উপেক্ষিত' জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৫৪ লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন। তাদের মধ্যে ১৮ লাখ থেকে ২৭ লাখ মানুষের শরীরে সাপের বিষ প্রবেশ করে। এই সেন্টারের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল সাপের নমুনা ও বিষ সংগ্রহ করা। পরবর্তীতে অ্যান্টিভেনম তৈরির দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যও রয়েছে।
ভেনম রিসার্চ সেন্টাররাসেলস ভাইপারের অ্যান্টিবডি তৈরি, আটকে পরবর্তী ধাপভেনম রিসার্চ সেন্টারের মুখ্য গবেষক ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক অনিরূদ্ধ ঘোষ জানান, ডব্লিউএইচও বলে দিল যে, সব দেশকেই চেষ্টা করতে হবে, তাদের অঞ্চলের সাপের ভেনম ব্যবহার করে যাতে অ্যান্টিভেনম তৈরি করা হয়। সেইক্ষেত্রে এই অ্যান্টিভেনমটা অনেক বেশি স্পেসিফিক হবে। তবে, ২০২৪ সালের ৩০ জুনের পর থেকে সরকার আর কোনো অর্থ অনুমোদন না দেওয়ায় তহবিলের অভাবে বর্তমানে গবেষণা কার্যক্রম প্রায় থমকে গেছে বলে জানিয়েছেন এই সেন্টারের মুখ্য গবেষক অধ্যাপক ঘোষ। এদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক মো. হালিমুর রশীদ জানিয়েছেন, যেসব প্রকল্প অপারেশনাল প্ল্যানের অধীনে ছিল, সেগুলোকে রেভিনিউ খাত এবং ডিপিপির আওতায় নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ভেনম রিসার্চ সেন্টারের অর্থায়ন আপাতত বন্ধ থাকবে। কেননা এটির অর্থায়ন কোন খাত থেকে হবে, সেই সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি বলে জানান তিনি। দেশে কখন, কেন অ্যান্টিভেনম তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়? বিষধর প্রাণীর বিষ সংগ্রহ করে তার কিছু অংশ ইনজেকশনের মাধ্যমে অন্য একটি প্রাণীতে প্রয়োগ করা হলে ওই প্রাণীর শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অর্থাৎ অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। এই অ্যান্টিবডি পিউরিফাই বা পরিশুদ্ধ করে তৈরি হয় অ্যান্টিভেনম। বাংলাদেশে বর্ষাকালে সাপের উপদ্রব বৃদ্ধি পায়। দেশে সাপের কামড়ের এক-চতুর্থাংশ ঘটনায় বিষধর সাপ জড়িত বলে ২০২৩ সালে করা জাতীয় সর্পদংশন সংক্রান্ত এক জরিপে পাওয়া গেছে। রাসেলস ভাইপার, কালকেউটে, গোখরা, চন্দ্রবোড়ার মতো সাপের দংশনে বর্ষাকালে মানুষ মারা গেছে বলে প্রায়ই শোনা যায়। গ্রামীণ এলাকায় সাপের কামড়ের ৯৫ শতাংশ ঘটনা ঘটে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালিত ওই গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ সাপের কামড়ের স্থানে গিঁট দেয়। আর চিকিৎসকের বদলে ওঝা বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভরতার কারণে দেশে প্রতি বছর ছয় হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে উদ্ধার হওয়া পদ্ম গোখরা সাপ, ফাইল ছবিসরকারি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সাপে কাটা রোগীদের ৮৬ শতাংশ অপচিকিৎসার শিকার হন। মাত্র তিন শতাংশ মানুষ চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যান। গবেষকরা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে দক্ষিণ ভারত থেকে আনা সাপের বিষের প্রতিষেধক দিয়ে সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসা করা হয়। ওই অ্যান্টিভেনম ভারতীয় প্রজাতির সাপের বিরুদ্ধে তৈরি করা, যেটি দেশের স্থানীয় সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করতে বৈজ্ঞানিকভাবে যথাযথ বা পুরোপুরি কার্যকর নয়। ২০১৮ সালের মে মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা বা ডব্লিউএইচও সাপে কাটাকে একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে অভিহিত করে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সাপের কামড়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৫০ শতাংশ অর্থাৎ অর্ধেকে কমিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সদস্য দেশগুলোকে আহ্বান জানায়। এই লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশও স্বাক্ষরকারী দেশ। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগে ভেনম রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অপারেশনাল প্ল্যানের অধীনে পরিচালিত হচ্ছিল। তবে দুই বছর ধরে এই সেন্টারের অর্থায়ন বন্ধ রয়েছে।
ভেনম রিসার্চ সেন্টাররিসার্চ সেন্টারের ফান্ডিং বন্ধ কেন? ভেনম রিসার্চ সেন্টারের মুখ্য গবেষক অনিরূদ্ধ ঘোষ জানান, এরইমধ্যে একটি সাপের অ্যান্টিবডি তৈরির কাজ শেষ করেছে ভেনম রিসার্চ সেন্টার। আমরা রাসেলস ভাইপারের অ্যান্টিবডি তৈরি করে ওইটার রিপোর্টসহ সরকারের কাছে জমা দিয়েছি। এই গবেষক জানান, এই গবেষণাগারের পরবর্তী লক্ষ্য ছিল, নিউরোটক্সিক বাইট বা যেসব সাপের কামড়ে স্নায়ুতন্ত্র অবশ হয়ে যায়, যেমন- ক্রেইট এবং কোবরা। এই দুইটি সাপের অ্যান্টিবডি উৎপাদন করা যায় কি না এবং অ্যান্টিবডিগুলো ওই সাপের বিষকে নিউট্রালাইজ করে কিনা এবং কাজ করে কি না। আমাদের কাজগুলো শুধু ল্যাব পর্যন্ত। কিন্তু এই কাজ এখনো শুরু করা যায়নি। এর কারণ হিসেবে এই গবেষক জানান, ২০২৪ সালের ৩০ জুনের পর থেকে ভেনম রিসার্চ সেন্টারে আর কোনো সরকারি ফান্ডিং নাই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অপারেশনাল প্ল্যানের অধীনে পরিচালিত সব প্রকল্প ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। একটা সিদ্ধান্ত ছিল, আর এভাবে ওপি দিয়ে চলবে না। এটা দীর্ঘমেয়াদি প্ল্যান-পরিকল্পনায় করবে। ২০২৪ এর পরে আর কোনো ওপি পাশ না হওয়াতে আমাদের ফান্ডিং বন্ধ হয়ে গেছে, বলেন অনিরুদ্ধ ঘোষ। তবে এরই মধ্যে ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল বা ডিপিপির আওতায় সরকার এসব প্রকল্প চালিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান ভেনম রিসার্চ সেন্টারের মুখ্য গবেষক অনিরুদ্ধ ঘোষ। তবে এটি সময়সাপেক্ষ বিষয় বলেও জানান তিনি। এরমধ্যে সরকার আবার নতুন করে চেষ্টা করছে ডিপিপি প্রণয়ন করার। আমরা ডিপিপি করে সেটা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, প্ল্যানিং কমিশন এগুলো পার হয়ে ফাইনালটা আবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে জমা দিয়েছি। এটা অধিদপ্তর থেকে আবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যাবে ওইখান থেকে যদি পাশ হয় তখন এটার গভর্নমেন্ট ফান্ডিং আসবে, বলেন অনিরুদ্ধ ঘোষ। অ্যান্টিবডি তৈরির আগে সাপের 'ভেনম ক্যারেক্টারাইজেশন' করতে হয় বলে জানান এই গবেষক। এগুলার অ্যান্টিবডি সাথে সাথে হয় না। আগে করতে হয় ভেনম ক্যারেক্টারাইজেশন। মানে ভেনমটাকে ভালোভাবে দেখা, বিভিন্ন কম্পোনেন্ট কী কী আছে। এগুলো করার মতো ফান্ডিংও আমাদের কাছে নেই। আমরা কোনো রকমে বেঁচে আছি গত দুই বছর ধরে, বলেন মুখ্য গবেষক অনিরূদ্ধ ঘোষ। এদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক মো. হালিমুর রশীদ জানান, সরকার অপারেশনাল প্ল্যানের অধীনে থাকা সকল প্রকল্প পরিচালন খাত এবং ডিপিপির অধীনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা দুইটা, একটা হলো- অনেক কাজ পরিচালন বা রেভিনিউ বাজেটে চলে যাচ্ছে। আর অনেক কাজে ডিপিপি হচ্ছে, ডিপিপি তৈরি হচ্ছে। এই প্রকল্পটি ডিপিপি নাকি রেভিনিউ খাতের অধীনে যাবে সেই সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। প্রকল্প থেকে ওরা যদি ডিজির কাছে একটা চিঠি দেয় তাহলে হয়তো ডিজি এটা আমলে নিয়ে একটা ব্যবস্থা করবে, বলেন হালিমুর রশীদ। ২ বছর ধরে সাপ সংগ্রহ বন্ধদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন প্রজাতির সাড়ে তিনশোর বেশি বিষধর সাপ সংগ্রহ করেছে ভেনম রিসার্চ সেন্টার। তবে অর্থায়নের অভাবে গত দুই বছর কোনো সাপ সংগ্রহ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে বিষধর ১১ প্রজাতির সাপের বিষ এই সেন্টার সংগ্রহ করেছে বলে জানিয়েছেন সেন্টারের ইনভেস্টিগেটর ও সুপারভাইজার এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী। তিনি বলেন, এর মধ্যে দুই প্রজাতির কোবরা, এক প্রজাতির কিং কোবরা, পাঁচ প্রজাতির ক্রেইট, এক প্রজাতির রাসেলস ভাইপার এবং দুই প্রজাতির পিট ভাইপার সাপের বিষ সংগ্রহ করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল অনুযায়ী, অ্যান্টিভেনম তৈরির প্রাথমিক ধাপে সারা দেশের বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চল থেকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সাপ সংগ্রহ করে লালন-পালন করে সেগুলো থেকে বিষের নমুনা সংগ্রহ করে একটি নির্দিষ্ট মান নির্ধারণ করতে হয়। অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল অনুযায়ী, একটা স্ট্যান্ডার্ড লেভেলের ভেনম লাগে। রাসেলস ভাইপার বা কোবরার তুলনায় ক্রেইট সাপের বিষ সংগ্রহ করা খুবই কঠিন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। অ্যান্টিভেনম সিনথেসিসের কাজ শুরু করতে হলে আমাদের মিনিমাম পাঁচ মিলিগ্রাম ভেনম লাগে। ক্রেইট টাইপের কিছু সাপ আছে যেগুলো থেকে পাঁচ মিলিগ্রাম ভেনম সংগ্রহ করতে হলে এক হাজার ক্রেইট যদি ছয়মাস লালন-পালন করেন, প্রতি মাসে ভেনম কালেক্ট করলে হয়তো পাঁচ মিলিগ্রাম আসতে পারে। কারণ ক্রেইট থেকে এত কম পাওয়া যায়, মানে একড্রপের মতো একটু পাওয়া যায়, বলেন অধ্যাপক চৌধুরী। ভেনম রিসার্চ সেন্টার প্রাথমিক লক্ষ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছর ধরে কোয়ালিটি ও স্ট্যান্ডার্ড মানের বিষ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজ শতভাগ করা হয়েছে বলে জানান অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী।
