কৃষি ও বনায়নে নতুন দিগন্ত

সোহেল রানার বরেন্দ্র অ্যাগ্রো পার্ক ও মিয়াওয়াকি বন

শুক্রবারের বিশেষ খবর

প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  গাজী মুনছুর আজিজ

প্রায় ২১০ বিঘা জমিতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের আম এবং প্রচলিত-অপ্রচলিত নানা ফলের বাগান করে সফল হয়েছেন নওগাঁ জেলার সাপাহার উপজেলার কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল রানা। তার এ প্রকল্পের নাম 'বরেন্দ্র অ্যাগ্রো পার্ক'। তার বাড়ি সাপাহার উপজেলা সদরের জয়পুর এলাকায়।

সোহেল রানা ২০০৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যান বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ঢাকায় প্রায় ৬ বছর সাংবাদিকতা করেন। কিন্তু তার ইচ্ছে ছিল কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার। সেজন্য সাংবাদিকতার চাকরি ছেড়ে কৃষি বিষয়ে প্রশিক্ষণ-পড়াশোনা শুরু করেন এবং একদিন সেই স্বপ্ন নিয়েই নিজ জেলায় ফিরে আসেন। এরপর প্রথমে পত্নীতলা উপজেলার দিবর ইউনিয়নের রূপগ্রামে ২০১৪ সালের শেষে ১২ বিঘা জমিতে 'রূপগ্রাম অ্যাগ্রো ফার্ম' নামে সমন্বিত কৃষিখামার গড়ে তোলেন। এরপর কৃষি খামারের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সাপাহার সদরের গোডাউনপাড়া এলাকায় ২০১৮ সালে গড়ে তোলেন 'বরেন্দ্র অ্যাগ্রো পার্ক।' শুরুতে পুঁজি ছিল মাত্র ৩ লাখ। প্রথমে নিজের জমিতেই বাগান করেন এবং ধীরে ধীরে সফলতার দিকে হাঁটেন। সেই ধারবাহিকতায় সাপাহার সরকারি কলেজের অনাবাদি পতিত জমি লিজ নিয়ে সেই জমিতেও বাগান করেন। পাশাপাশি ব্যক্তি মালিকানাধীন আরও কিছু জমি লিজ নেন। বর্তমানে তার বাগানের আয়তন প্রায় ২১০ বিঘা। এসব জমিতে ৫ হাজার আম্রপালি জাতের আম, ৪ হাজার বারী-৪ জাতের, ৪ হাজার গৌরমতী জাতের, আড়াই হাজার ব্যানানা জাতের এবং দেড় হাজার কাটিমন জাতের আম গাছ লাগিয়েছেন। পাশাপাশি বিদেশি জাতের জাপানি মিয়াজাকা, আমেরিকার আস্টিন ও কেইট ও অস্ট্রেলিয়ার ক্যাসিনটন প্রাইড আমগাছ লাগিয়েছেন। সব মিলিয়ে ২৫ জাতের প্রায় ২৫ হাজার গাছ লাগিয়েছেন তিনি। এসবের পাশাপাশি তার এ বাগানে পেয়ারা, কমলা, মাল্টা, ড্রাগন, লংগান, শরিফা, মাতুয়া, অ্যাবিউ, মালবেরি, পার্সিমন, অ্যাভোক্যাডো ও গ্লাডিওয়ালস ফুলেরও চাষ রয়েছে। এ ছাড়া তার এ বাগান নওগাঁর প্রথম বাংলাদেশ গ্যাপ সনদপ্রাপ্ত আম বাগান।

২০২১ সালে নওগাঁ থেকে প্রথম সোহেল রানার হাত ধরে যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আম রপ্তানি শুরু হয়। ২০২৫ সালে কাতারের দোহায় আমের মেলায় প্রায় ৫ টন আম নিয়ে অংশগ্রহণ করেন তিনি। সোহেল রানা বলেন, এখন পর্যন্ত প্রায় ২ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে এসব বাগানে। প্রকল্প থেকে আমের মৌসুমে ৫০ থেকে ৬০ জন শ্রমিক কাজ করেন। এ ছাড়া সার্বক্ষণিক কাজ করেন ১৫ থেকে ২০ জন শ্রমিক।

কৃষি উদ্যোক্তার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২১ সালে পেয়েছেন জাতীয় যুব পুরস্কার। এ ছাড়া ২০২৪ সালে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে জাতীয় ফল মেলায় বাণিজ্যিক ফলচাষি হিসেবে প্রথম পুরস্কার লাভ করেন। তিনি ২০২৪ সালে থাইল্যান্ডে আধুনিক কৃষিবিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে 'সাউ স্মার্ট ড্রায়ারের' মাধ্যমে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত ও বিপণন করছেন। এগ্রো-ইকো ট্যুরিজম নিয়েও কাজ করছেন তিনি। তিনি শুধু নিজেই সফলতা অর্জন করেননি; পাশাপাশি কৃষি উদ্যোক্তা তৈরিতেও কাজ করছেন। তিনি এখন পর্যন্ত দুই শতাধিক নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করেছেন। বাগানের পাশাপাশি মাছ চাষ, গরু, ছাগল, ভেড়া, হাঁস-মুরগির খামার ও নার্সারিতে চারা উৎপাদনও করেন তিনি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. মনজুর রহমান বলেন, সোহেল রানার বরেন্দ্র অ্যাগ্রো পার্ক অভাবনীয় সফলতা অর্জন করেছে। কেউ যদি এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে চান, তাহলে সব ধরনের সহযোগিতা ও পরামর্শ আমরা অধিদপ্তর থেকে প্রদান করে থাকি।

অ্যাগ্রো পার্কের পাশাপাশি তার উদ্যোগেই তৈরি হয়েছে বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রথম মিয়াওয়াকি ফরেস্ট বা কৃত্রিম বন। প্রায় ৫৫ শতাংশ জমির এ কৃত্রিম বনে বিলুপ্ত প্রায় পাঁচ শতাধিক জাতের ২ হাজার ৭০০ গাছ ও লতাগুল্ম রোপণ করেছেন তিনি।

সোহেল রানা বলেন, এ জাতীয় বন দেশের প্রথম চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে তৈরি করা হয়েছে। তবে আমাদের অঞ্চলে আমিই এ উদ্যোগ নিয়েছি। এ বনের মাধ্যমে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সাধারণ বনের চেয়ে কৃত্রিম বনে গাছের বৃদ্ধির হার ১০ গুণ বেশি। এ বনের কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ ক্ষমতা অন্য গাছের তুলনায় ৩০ গুণ বেশি। মিয়াওয়াকি বন মূলত গাছের জীবন্ত জাদুঘর। ছুটির দিনে বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের এনে গাছ ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা আছে। পাশাপাশি এ অঞ্চলের কৃষি উদ্যোক্তা এবং প্রান্তিক কৃষকদেরও কৃত্রিম বন তৈরিতে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে উৎসাহিত করা হবে।