সেবা ও রাজনীতিতে স্বচ্ছতা আনতে আসছে গ্রাম সরকার
প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমে সহায়তা করতে চারদশকের বেশী সময় পরে কার্যকর হতে যাচ্ছে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা। এরই মধ্যে 'গ্রাম সরকার আইন ২০২৬'-এর খসড়া তৈরি করে জনসাধারণের মতামত চেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। আগামী ১৭ নভেম্বরের মধ্যে খসড়া আইনটির বিষয়ে মতামত পাঠাতে পারবেন নাগরিকরা। স্থানীয় সরকার বিভাগেরর ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত ই-মেইল ঠিকানায় মতামত পাঠাতে হবে। নাগরিকদের মতামত পাওয়ার পর আইনের খসড়া চূড়ান্ত করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে।
উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, নারী ও শিশু নির্যাতন, মাদক ও জুয়া প্রতিরোধ, শিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা, পুষ্টি, টিকাদান, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন, কৃষি, মৎস্য, প্রাণিম্পদ, সমবায়, কুটিরশিল্প, পরিবেশ সংরক্ষণ ও সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমে সহায়তা করতে কার্যকর হতে যাচ্ছে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা। স্থানীয় বিরোধ মীমাংসায়ও সহায়তা করবে নতুন এই গ্রাম সরকার ব্যবস্থা। স্থানীয় পর্যায়ে চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি ও আর্থিক বিষয়ও পর্যালোচনা করবে গ্রাম সরকার। এই ব্যবস্থা ফেরাতে কাজ করছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, গত ৫ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে গ্রাম সরকার পুনর্বহালের বিষয়ে প্রস্তাব ওঠে। ২০০৯ সালে রহিত হওয়া ২০০৩ সালের গ্রাম সরকার আইন পরিমার্জন করে এই নতুন আইনের খসড়া তৈরি করা হয়। আইনটি পাশ হলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের উদ্যোগে আবারও গ্রাম সরকার ব্যবস্থা ফিরবে।
নতুন খসড়ায় সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কয়েকটি নতুন দায়িত্ব যুক্ত করা হয়েছে। সরকারের ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রধানদের কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড ও ক্রীড়া কার্ড বিতরণ এবং তথ্য সংগ্রহে সহায়তা, ভিজিএফ ও ভিজিডি কার্যক্রমে সহযোগিতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে সহায়তা এবং ব্যক্তি পর্যায়ে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারে জনগণকে উৎসাহ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সুশাসনের কর্মী সাবেক সচিব একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, 'নিঃসন্দেহে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা ভালো উদ্যোগ। সরাসরি রাজনৈতিক ব্যক্তি ও জনগণের অংশগ্রহনের একটি পথ তৈরী হবে এই ব্যবস্থায়। এ জন্য সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিতে হবে। যদি গ্রাম সরকার ব্যবস্থা আইন মেনে চলে তবে জনগণের দীর্ঘ দিনের রাজনীতি বিমুখতা দূর হবে।' গ্রাম সরকার চালুর বিষয়ে নতুন আইনের খসড়া নিয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তারা বাসসকে জানিয়েছেন, 'খসড়া করা হয়েছে। খসড়াই চূড়ান্ত নয়। এটি আইনে পরিণত হতে হলে কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। সংসদে পাশ হলে তারপর প্রয়োগে যাবে সরকার। তবে এটি কতটা দ্রুত কার্যকর হবে তা নির্ভর করবে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের সিদ্ধান্তের ওপর।'
'গ্রাম সরকার আইন ২০২৬' এ প্রস্তাবিত আইনে দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ডে একটি করে গ্রাম সরকার গঠনের কথা বলা হয়েছে। এতে থাকবেন একজন গ্রাম সরকার প্রধান, একজন উপদেষ্টা ও ১৫ জন সদস্য— সব মিলিয়ে মোট ১৭ জন। পাঁচ বছর মেয়াদি গ্রাম সরকারের সদস্য নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ভোটারদের অংশগ্রহণে 'হ্যাঁ'-'না' ভোটের বিধান রাখা হয়েছে।
সারা দেশে সাড়ে ৪ হাজারের বেশি ইউনিয়নের ৪১ হাজার ওয়ার্ডে প্রায় ৭ লাখ স্থানীয় লোকের নেতৃত্বে গ্রাম সরকার গঠিত হবে। খসড়া অনুযায়ী গ্রাম সরকারে একজন প্রধান, একজন উপদেষ্টা ও ১৫ জন সদস্য থাকবেন। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য প্রধান এবং সংরক্ষিত আসনের সদস্য উপদেষ্টা হবেন। সদস্যদের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ভোটারদের 'হ্যাঁ' বা 'না' ভোটে নির্বাচনের ব্যবস্থা থাকবে। এ ক্ষেত্রে মোট ভোটারের অন্তত ১০ শতাংশের উপস্থিতি প্রয়োজন হবে। গ্রাম সরকারের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। গ্রাম সরকার প্রতি দুই মাসে অন্তত একবার সভা করবে। আর প্রতি ছয় মাসে অন্তত একবার সাধারণ সভা হবে। ওয়ার্ডের ভোটারদের অন্তত ১০ শতাংশের উপস্থিতি থাকতে হবে। প্রতিটি দায়িত্বের জন্য কমিটি এবং প্রয়োজন হলে সাব-কমিটি গঠনের বিধানও রাখা হয়েছে।
গ্রাম সরকারের জন্য আলাদা তহবিল থাকবে। ইউনিয়ন পরিষদ এবং অন্য উৎস থেকে পাওয়া অর্থ ওই তহবিলে জমা হবে। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান বা নারী ভাইস চেয়ারম্যান, পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গ্রাম সরকারের কাজ পরিদর্শন করতে পারবেন। জেলা প্রশাসক তদন্তের পর প্রয়োজন মনে করলে গ্রাম সরকার বাতিলও করতে পারবেন। তবে তার আগে গ্রাম সরকারকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিতে হবে।
গ্রাম সরকারের ইতিহাস : দেশে গ্রাম সরকার ব্যবস্থার সূচনা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের শাসনামলে। গ্রামীণ জনগণকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বনির্ভরতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে তার সময়ে এ সরকার চালু করা হয়।
১৯৮০ সালের আইনের মাধ্যমে গ্রাম পর্যায়ে ব্যবস্থাটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন কর্মসূচির অন্যতম অংশ হিসেবে গ্রাম সরকার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী চালু করা হয়েছিল। তবে জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বরণের পর গ্রাম সরকার ব্যবস্থা বেশিদিন টেকেনি। ১৯৮২ সালে এরশাদ সরকারের আমলে এটি বিলুপ্ত করা হয়। পরে গ্রাম পর্যায়ে স্থানীয় সরকার কাঠামো ফিরিয়ে আনতে ১৯৯৭ সালে 'স্থানীয় সরকার (গ্রাম পরিষদ) আইন' করা হয়। এরপর ২০০৩ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে নতুন করে 'গ্রাম সরকার আইন, ২০০৩' করা হয়। আইনটি ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৩ সালে প্রণীত হয়। এরপর ২০০৯ সালের ৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে 'গ্রাম সরকার (রহিতকরণ) বিল' পাসের মাধ্যমে গ্রাম সরকার বাতিল করা হয়।
