অপেক্ষায় স্বজনরা

ফিরছে সৌদিতে নিহত পাঁচ শ্রমিকের লাশ

প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

দীর্ঘ আড়াই মাসের প্রতীক্ষা ও আইনি জটিলতার অবসান শেষে সৌদি আরবের রিয়াদে অগ্নিকাণ্ডে নিহত পাঁচ বাংলাদেশি শ্রমিকের লাশ আজ দেশে আনা হচ্ছে। অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্ত করতে দেরি হওয়ায় এত দিন তাদের লাশ সৌদি আরবের একটি হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছিল। অবশেষে ডিএনএ (উঘঅ) পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর প্রিয়জনের নিথর মুখটি শেষবারের মতো দেখার অপেক্ষায় দিন গুনছেন স্বজনেরা। রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তির বরাত দিয়ে নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন। বিজ্ঞপ্তির তথ্যমতে, আজ সকাল ৮টা ৫ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৩৬ ফ্লাইটে এই পাঁচ রেমিট্যান্স যোদ্ধার লাশ ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিমানবন্দর থেকেই লাশগুলো তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

অগ্নিকাণ্ডের প্রেক্ষাপট ও নিহতদের পরিচয়

গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১৬ জন বাংলাদেশি শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে ১২ জনেরই বাড়ি নওগাঁ জেলায়। আইনি প্রক্রিয়া শেষে গত ২৭ আগস্ট সাতজনের লাশ দেশে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু বাকি পাঁচজনের মৃতদেহ আগুনে বেশি পুড়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত হওয়া এই পাঁচ শ্রমিক হলেন— নওগাঁ শহরের পার নওগাঁ এলাকার শাহিন, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান শুভ, মধ্য বোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গ্রামের মাসিদুল সরদার সজিব এবং সাধনপুর (বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী সাধনগর) গ্রামের সাগর আলী।

সাগরের পরিবারে শোক ও ঋণের পাহাড়

জীবিকার তাগিদে বিদেশ গিয়ে প্রাণ হারানো এই শ্রমিকদের পরিবারগুলো এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন পার করছে। বিশেষ করে নিহত সাগর আলীর মৃত্যুতে তার পরিবার একেবারে পথে বসার উপক্রম হয়েছে। সাগরের স্ত্রী পারভীন খাতুন জানান, পরিবারের ভাগ্য ফেরাতে মাত্র ছয় মাস আগে মহাজনের কাছে শেষ সম্বল ভিটেবাড়িটি বন্ধক রেখে সাড়ে ছয় লাখ টাকা ঋণ করে স্বামীকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন তিনি। স্বামী মারা যাওয়ায় এখন উপার্জনের কোনো পথ নেই, অন্যদিকে পাওনাদারদের ক্রমাগত চাপে চরম দিশেহারা হয়ে পড়েছেন পারভীন।

প্রশাসনের পদক্ষেপ ও আর্থিক সহায়তা

মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সহায়তার বিষয়ে আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, 'ডিএনএ পরীক্ষাসহ সৌদির স্থানীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের যৌথ সমন্বয়ে দ্রুততম সময়ে মরদেহগুলো দেশে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্বজন হারানো এই পরিবারগুলো যেন ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে নির্ধারিত সরকারি আর্থিক সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ দ্রুত পায়, সেই প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।' জীবিকার সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমানো এই শ্রমিকদের অকাল মৃত্যুতে নওগাঁর সংশ্লিষ্ট গ্রামগুলোতে এখন শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনরা এখন চোখের জলে প্রিয়জনের কফিনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।