সুসংবাদ প্রতিদিন

ফুলকপির সাথী ফসল মরিচ, লাভবান কৃষক

প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ওসমান গনি, চান্দিনা (কুমিল্লা)

কৃষি আমাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি, আর এ খাতের প্রাণ হলেন এ দেশের দূরদর্শী ও পরিশ্রমী কৃষকরা। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ছোঁয়া এবং প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে নতুন কিছু করার প্রবণতা এখন দেশের মফস্বল এলাকার কৃষকদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে। কম খরচে অধিক ফলন ফলিয়ে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মেহার গ্রামের আদর্শ কৃষক আনোয়ার হোসেন। তিনি গতানুগতিক চাষাবাদের ধারা ভেঙে একই জমিতে দুটি ভিন্ন ফসলের চাষ করে অনন্য সাফল্যের মুখ দেখতে চলেছেন। তার এই সফল উদ্যোগ ও সাহসিকতা এখন স্থানীয় অন্য কৃষকদের মধ্যেও দারুণ কৌতূহল ও উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে।

চান্দিনার মেহার গ্রামের এই উদ্যমী কৃষক আনোয়ার হোসেন তাঁর ১৮ শতাংশ জমিতে অভিনব কায়দায় ফুলকপির সঙ্গে সাথী ফসল হিসেবে কাঁচামরিচের চাষ করেছেন। কৃষি বিজ্ঞান ও আধুনিক কৃষিপদ্ধতির ভাষায় সাথী ফসল চাষ অত্যন্ত লাভজনক একটি মাধ্যম, যেখানে একই জমির সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়। একটি নির্দিষ্ট জমিতে প্রধান ফসলের পাশাপাশি অন্য একটি স্বল্পমেয়াদি বা উপযুক্ত সহায়ক ফসল চাষ করলে জমির উর্বরাশক্তি এবং সম্পদের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত হয়। আনোয়ার হোসেন সেই বৈজ্ঞানিক ও লাভজনক পদ্ধতিটিই নিজের মেধা ও পরিশ্রমে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। বর্তমানে তার সেই ক্ষেতের দৃশ্য সত্যিই মনোমুগ্ধকর। মরিচ গাছে এরমধ্যেই থোকা থোকা কাঁচামরিচ ধরতে শুরু করেছে। গাছের সবুজ পাতার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে তাজা ও পুষ্ট কাঁচামরিচ, যা কৃষকের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। শুধু মরিচ নয়, ক্ষেতের মূল ফসল যে ফুলকপি, তার গাছগুলোও অত্যন্ত সতেজ ও স্বাস্থ্যবান। যদিও ফুলকপিতে এখনও পুরোপুরি ফলন আসেনি বা মোথা বাঁধেনি, তবে গাছের চমৎকার গঠন ও বৃদ্ধির ধরন দেখে কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ফুলকপি আসা শুরু করবে এবং বাজারে ওঠার উপযোগী হবে। একই জমিতে দুটি ফসলের এমন নান্দনিক সমাহার গ্রামীণ কৃষির এক অপরূপ রূপ ফুটিয়ে তুলেছে। আনোয়ার হোসেনের এই সফলতার পেছনে রয়েছে অত্যন্ত সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনা ও সঠিক পরিকল্পনা।

তিনি জানান, তাঁর এই ১৮ শতাংশ জমিতে ফুলকপি ও মরিচ চাষ করতে সর্বমোট আড়াই থেকে তিন হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। বর্তমান বাজারে সার, বীজ ও কীটনাশকের দামের তুলনায় এই সামান্য খরচে এত বড় একটি ফসলি খেত প্রস্তুত করা সত্যিই প্রশংসনীয়। অত্যন্ত কম পুঁজি বিনিয়োগ করে তিনি যে বড় ধরনের বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছেন, তা গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। কম খরচে অধিক ফলন পাওয়ার এই মডেলটি প্রমাণ করে, কৃষকদের সঠিক দূরদর্শিতা থাকলে অল্প জমিতেও তাক লাগানো সাফল্য অর্জন সম্ভব। আর্থিক লাভের হিসাব নিয়ে কৃষক আনোয়ার হোসেন অত্যন্ত আশাবাদী ও উচ্ছ্বসিত। বর্তমান বাজারে কাঁচামরিচের পাইকারি দর রয়েছে প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে। ক্ষেত থেকে মরিচ তোলা শুরু হওয়ায় তিনি পাইকারি বাজারে তা বিক্রি করতে শুরু করেছেন। এর পাশাপাশি অল্প কিছুদিন পর যখন ফুলকপি বাজারে বিক্রির উপযোগী হবে, তখন আয় আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এই দুই ফসলের সম্মিলিত বাম্পার ফলন এবং বর্তমান বাজারদর হিসাব করে তিনি দারুণ লাভের আশা করছেন। আনোয়ার হোসেন আনন্দিত চিত্তে জানান, যেভাবে গাছগুলোতে ফলন এসেছে এবং বাজারে পণ্যের চাহিদা রয়েছে, তাতে তাঁর সমস্ত কষ্ট ও পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। এই লাভ নিয়ে তিনি ও তার পরিবার অত্যন্ত খুশি।

আনোয়ার হোসেনের এই সাফল্য শুধু তাঁর নিজের পরিবারকেই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করছে না, বরং তা আশপাশের এলাকার বেকার যুবক ও অন্যান্য কৃষকদের জন্যও একটি বড় অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেহার গ্রামের অনেক কৃষক এখন তাঁর এই সাথী ফসল চাষের পদ্ধতি দেখে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন এবং আগামীতে তারাও এমন চাষাবাদে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। কৃষিতে আধুনিকতার ছোঁয়া এবং যুগোপযোগী কৌশল প্রয়োগ করলে যে ভাগ্য বদলানো সম্ভব, আনোয়ার হোসেন তার জীবন্ত প্রমাণ।