সুসংবাদ প্রতিদিন
বাহুবলে বেগুন চাষে লাভবান কৃষক
প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
মামুন চৌধুরী, হবিগঞ্জ

মাত্র ৫ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে বেগুন চাষে এখন পর্যন্ত ৭০ হাজার টাকার বেগুন বিক্রি করেছেন কৃষক আব্দুস ছালাম। জমিতে এখনও ফলন অব্যাহত থাকায় বাকি সময়ে আরও লক্ষাধিক টাকা আয়ের স্বপ্ন দেখছেন তিনি। বন্যার পানিতে একসময় তলিয়ে গিয়েছিল তার বেগুনখেত। আশঙ্কা ছিল, হয়তো নষ্ট হয়ে যাবে সব গাছ। কিন্তু হাল না ছেড়ে কঠোর পরিশ্রম আর সঠিক পরিচর্যায় সেই ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেত থেকেই ফিরেছে সাফল্য। এখন গাছে গাছে ঝুলছে বেগুন, আর তা বিক্রি করে হাসি ফুটেছে কৃষকের মুখে।
হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার হাফিজপুর গ্রামের কৃষক আব্দুস ছালামের এ সাফল্য এখন স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। লাল তীর সীড লিমিটেডের পার্পল কিং জাতের উচ্চফলনশীল, বারোমাসি হাইব্রিড লম্বা বেগুন চাষ করে তিনি পেয়েছেন আশাব্যঞ্জক ফলন। বিশেষ করে ফেরোমন ফাঁদ, হলুদ ফাঁদ, জৈব সার ও জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করে বিষমুক্ত বেগুন উৎপাদনের চেষ্টা করছেন তিনি। সরেজমিন বেগুনখেত পরিদর্শনকালে কথা হয় কৃষক আব্দুস ছালামের সঙ্গে। তিনি জানান, শুরু থেকেই বেগুনগাছের পরিচর্যা, রোগবালাই দমন এবং ফলন বৃদ্ধিতে মনোযোগী ছিলেন। গাছে গাছে বেগুন ধরতে শুরু করলে তা সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করেন। এভাবে উৎপাদিত বেগুন বিক্রি করে এরইমধ্যে তার আয় হয়েছে ৭০ হাজার টাকা। খেতের বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় বাকি সময়ে আরও লক্ষাধিক টাকা বিক্রির আশা করছেন তিনি। তবে এই সাফল্যের পথটা মোটেও সহজ ছিল না। বেগুনগাছ যখন বেড়ে উঠছিল, গাছে গাছে ফল ধরছিল, ঠিক তখনই বন্যার পানি এসে তলিয়ে দেয় তার খেত। চোখের সামনে পানিতে ডুবে যায় স্বপ্নের ফসল। গাছগুলো বাঁচবে কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান আব্দুস ছালাম। আশঙ্কা করেছিলেন, হয়তো এত দিনের পরিশ্রম ও বিনিয়োগ সবই পানিতে ভেসে যাবে। কিন্তু বিপর্যয়ের কাছে হার মানেননি তিনি। কয়েক দিন পর বন্যার পানি নেমে গেলে নতুন উদ্যমে শুরু করেন বেগুনগাছের পরিচর্যা। নিয়মিত যত্ন ও শ্রমে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায় গাছগুলো। কিছুদিনের মধ্যেই আবারও গাছে গাছে বেগুন ধরতে শুরু করে। সেই বেগুন সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করেই এখন সাফল্যের মুখ দেখছেন এই কৃষক।
আব্দুস ছালাম জানান, বেগুন চাষের শুরু থেকে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শামিমুল হক শামীম তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। ফসলের পরিচর্যা থেকে শুরু করে উৎপাদন পদ্ধতি সম্পর্কে পরামর্শ পেয়ে উপকৃত হয়েছেন তিনি। এ জন্য কৃষি কর্মকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন আব্দুস ছালাম। উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা শামিমুল হক শামীম বলেন, আব্দুস ছালাম একজন পরিশ্রমী কৃষক। তিনি সারা বছর বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ করেন। এমন একজন কৃষককে কৃষি বিষয়ে পরামর্শ দিতে পেরে ভালো লাগছে। তিনি বলেন, আব্দুস ছালাম বেগুন চাষে যথেষ্ট পরিশ্রম করেছেন। নিয়মিত পরিচর্যা ও সঠিক ব্যবস্থাপনার কারণেই তিনি ভালো ফলন পেয়েছেন। বন্যার পানিতে ক্ষেত ডুবে যাওয়ার পরও তিনি হাল ছাড়েননি। পানি নেমে যাওয়ার পর গাছের পরিচর্যা করায় আবারও ফলন ফিরে এসেছে।
কৃষি কর্মকর্তা আরও জানান, আব্দুস ছালামের বেগুনথেতের ফলন দেখে স্থানীয় অনেক কৃষক এ জাতের বেগুন চাষে আগ্রহী হয়েছেন। সঠিক জাত নির্বাচন, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুসরণ করলে কৃষকরা লাভবান হতে পারেন। বর্তমানে নিরাপদ ও বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে আব্দুস ছালামের চাষপদ্ধতি স্থানীয় কৃষকদের জন্য একটি সম্ভাবনাময় দৃষ্টান্ত। তিনি বেগুনখেতে ফেরোমন ফাঁদ, হলুদ ফাঁদ, জৈব সার ও জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করেছেন। এসব উপকরণ সমন্বিতভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশবান্ধব উপায়ে ফসল উৎপাদনের চেষ্টা করছেন তিনি। মাত্র ৫ হাজার টাকা খরচে এখন পর্যন্ত ৭০ হাজার টাকার বেগুন বিক্রি করার অভিজ্ঞতা আব্দুস ছালামের জন্য নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক।
বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়া খেত থেকে আবারও ফলন ফিরে পাওয়ার এই গল্প শুধু একজন কৃষকের সাফল্যের নয়; এটি প্রতিকূলতার মধ্যেও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। কৃষকের পরিশ্রম, সঠিক কৃষি পরামর্শ এবং আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির সমন্বয়ে কীভাবে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে, আব্দুস ছালামের বেগুনখেত তারই একটি উদাহরণ। হাফিজপুর গ্রামের এই কৃষকের খেতের সাফল্য দেখে স্থানীয় অন্য কৃষকরাও যদি লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব সবজি চাষে এগিয়ে আসেন, তাহলে একদিকে যেমন কৃষকের আয় বাড়বে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপদ সবজি উৎপাদনের সম্ভাবনাও আরও প্রসারিত হবে।
