প্রাণিসম্পদ পণ্য রপ্তানি ছয় মাসে বেড়েছে ২১৭ শতাংশ

প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে দেশের গবাদিপশু পণ্যের রপ্তানি ২১৭ শতাংশ বেড়ে ১০৪.৬৪ লাখ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এর আগের ছয় মাসে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩২.৯৯ লাখ মার্কিন ডলার।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাংস ও ডিমের উৎপাদন জাতীয় চাহিদাকে ছাড়িয়ে গেছে। ফলে মাথাপিছু সরবরাহের পরিমাণ এখন ন্যূনতম পুষ্টি চাহিদার চেয়েও বেশি।

দেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ৯০.৭০ লাখ টন মাংস এবং ২ হাজার ৫০৯.৪১ কোটি ডিম উৎপাদিত হয়। এর বিপরীতে বছরে আনুমানিক ৭৮.১৪ লাখ টন মাংস এবং ১ হাজার ৮৫৫.৩৬ কোটি ডিমের চাহিদা রয়েছে। তবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে দুধের উৎপাদন এখনো চাহিদার তুলনায় কম।

উৎপাদন বাড়ার কারণে বর্তমানে প্রতিদিন মাংস পাওয়া যাচ্ছে মাথাপিছু ১৩৯.২৯ গ্রাম, যা ন্যূনতম ১২০ গ্রামের চাহিদার চেয়ে বেশি। বর্তমানে বাৎসরিক মাথাপিছু মাংসের প্রাপ্যতা ৫০.৮৪ কেজি, যেখানে ন্যূনতম চাহিদা ৪৩.৮ কেজি। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, বাৎসরিক মাথাপিছু মাংস খরচের পরিমাণ মাত্র ১৪ কেজি। একইভাবে, বাৎসরিক মাথাপিছু ডিমের প্রাপ্যতা ১৪০টি ছাড়িয়ে গেছে, যেখানে চাহিদা প্রায় ১০৪টি।

২০১৬-১৭ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত এক দশকে মাংস ও ডিমের উৎপাদন যথাক্রমে ২৬.৭৮ শতাংশ এবং ৬৮.০৪ শতাংশ বেড়েছে। মাংস উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশই আসে ব্রয়লার মুরগি থেকে, যা এখন জাতীয় চাহিদা মেটাতে সক্ষম। অন্যদিকে ডিমের উৎপাদনও জাতীয় চাহিদা পূরণের পর্যায়ে পৌঁছেছে।

গত এক দশকে দুধের উৎপাদন ৬৯.৭১ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১৫৭.৫৩ লাখ টনে পৌঁছালেও, তা এখনো বছরে ১৬২.৭৯ লাখ টনের বার্ষিক চাহিদার চেয়ে কম। প্রতিদিন মাথাপিছু দুধের প্রাপ্যতা প্রায় ২৪১ মিলিমিটার, যেখানে আনুমানিক চাহিদা ২৫০ মিলিমিটার।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাংসের উৎপাদন পূর্ববর্তী অর্থবছরের ৮৯.৫৪ লাখ টন থেকে ১.১৬ লাখ টন বেড়ে ৯০.৭০ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। ডিমের উৎপাদনও ২.৮৩ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৪৪০.৬৫ কোটি থেকে ২ হাজার ৫০৯.৪১ কোটি পিসে পৌঁছেছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান এ উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে সরকারের নীতিগত সহায়তা, উদ্যোক্তা তৈরি এবং গরু ও পোল্ট্রির জাত উন্নয়নকে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সরবরাহ ব্যবস্থার সব পর্যায়ে অ্যান্টিবায়োটিক-মুক্ত উৎপাদন নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাও এই খাতের অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখেছে।

রপ্তানি পরিস্থিতির বিষয়ে শাহজামান জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) গবাদিপশু পণ্য রপ্তানি করে ১৫৪.৪৭ লাখ মার্কিন ডলার বা ১৯৩.০৮ কোটি টাকা আয় হয়েছে। যেখানে পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয়ের পরিমাণ ছিল ৮২.০৬ লাখ মার্কিন ডলার বা ১০২.৫৭ কোটি টাকা।

তিনি বলেন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর পণ্যের গুণগত মান ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) প্রয়োজনীয়তা পূরণ, হিমাগার সুবিধার উন্নয়ন এবং রপ্তানি মূল্য প্রতিযোগিতামূলক করার লক্ষ্যে সংস্থাটি কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এ ধারা চলমান রাখতে নতুন নতুন রপ্তানি বাজার খোঁজার কাজও চলছে।

এ খাতের উৎপাদনের সম্ভাবনা সম্পর্কে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুক বলেন, দেশের গবাদিপশু উৎপাদন বর্তমান স্তরের চেয়ে অন্তত তিন গুণ বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ বছরে গড়ে ১৪০টির মতো ডিম খায়, অথচ উন্নত দেশগুলোতে এ সংখ্যা প্রায় ৪০০। বাংলাদেশে মুরগির মাংস খাওয়ার হারও উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম গবাদিপশু পণ্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, প্রধানত অদক্ষ উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশে মাংস, দুধ ও ডিমের দাম প্রতিবেশী ভারতের চেয়ে বেশি। তিনি তৃণমূল উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিতে এবং কর্পোরেট গোষ্ঠী যাতে বাজার নিয়ন্ত্রণ বা দাম কারসাজি করতে না পারে, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

পশুপালন, দুগ্ধ ও পোল্ট্রি খামারিদের মধ্যে আধুনিক যন্ত্রপাতির বিস্তৃত বিতরণের তাগিদ দেন। এর মধ্যে রয়েছে মিল্কিং মেশিন, ঘাস কাটার যন্ত্র, ট্রাক্টর, খড় কাটার যন্ত্র, মিল্ক ক্যান, ক্রিম সেপারেটর ও পাস্তুরাইজেশন প্ল্যান্ট।

ড. আলম বলেন, কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় যান্ত্রিকীকরণ এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। প্রতিটি খামারকে আধুনিক উৎপাদন ইউনিট হিসেবে গড়ে তোলা উচিত।

বিএলআরআই-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. শহিদুল হক কৃষি খাতের মতো গবাদিপশু খামারিদেরও প্রণোদনা দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি পশু শনাক্তকরণ ও তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু, প্রাণিসম্পদ নীতি ও আইন আরও শক্তিশালী করা এবং প্রান্তিক খামারিদের সুরক্ষায় বিমা সুবিধার ওপর গুরুত্ব দেন।

গবেষণা এবং বিদেশ থেকে উপযুক্ত জাতসহ উচ্চফলনশীল ও সংকর জাত আনার মাধ্যমে গবাদিপশুর জাত উন্নয়নের পরামর্শ দেন তিনি। ড. হক বলেন, খামারি ও ভোক্তা উভয় পক্ষ যাতে ন্যায্যমূল্য পায়, সেজন্য সরকারের একটি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট কমানো উচিত।

বিপণন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং খামারিদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে তিনি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীনে একটি প্রাণিসম্পদ বিপণন বিভাগ গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। তিনি উল্লেখ করেন, বছরে প্রায় এক শতাংশ হারে কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে গবাদিপশু উৎপাদন সম্প্রসারণের এখনো যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, গ্রামীণ পরিবারগুলো ব্রয়লার, লেয়ার, গরু, ছাগল ও ভেড়া পালন করে এই খাতের প্রসারে অবদান রাখতে পারে। যা মাংস, দুধ ও ডিমের রপ্তানি সম্ভাবনা নতুন খামার গড়ে তুলতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে উৎসাহিত করবে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ছিল ১.৮১ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে এর অবদান ছিল ১৬.৫৬ শতাংশ। দেশের প্রায় ৪৩.৬৪ শতাংশ পরিবার গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালনের সঙ্গে যুক্ত।

দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ প্রত্যক্ষভাবে এবং প্রায় ৫০ শতাংশ পরোক্ষভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি, খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য সম্মিলিতভাবে ৪৩,৩৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা জিডিপির ০.৬৩ শতাংশ।