'কাল অভিযানে যাব, দোয়া কইরো মা'

শেষবার বলেছিলেন নিহত সেনাসদস্য

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

"কাল বিকালে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো মা।" বুধবার রাতে মাকে ফোন করে সবশেষ এ কথা বলেছিলেন সেনাসদস্য তিতাস শেখ। পরদিন গত বৃহস্পতিবার কক্সবাজারের টেকনাফে যৌথবাহিনীর অভিযানে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান তিনি।

২৮ বছর বয়সি তিতাস ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তার মৃত্যুতে শোকে ভেঙে পড়েছে পরিবার। ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ বাবা আফজাল শেখ। সন্তানের শোকে বিলাপ করছেন মা রেখা বেগম। স্বামীকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার। মা রেখা বেগমের ভাষ্য, বুধবার রাতে ছেলের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল তার। তিতাস তখন বলেছিলেন, "আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) বিকালে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো মা।" ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে তিনি শুধু বিলাপ করে যাচ্ছেন।

তিতাস বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য ছিলেন। তিনি টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। ২০১৭ সালে সৈনিক পদে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন তিনি। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন তিতাস। তার বাবা আফজাল শেখ অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য। ছোট ভাই আকরাম হোসেনও সেনাবাহিনীতে কর্মরত।

চার বছর আগে পাশের গ্রামের সুমাইয়া আক্তারের সঙ্গে বিয়ে হয় তিতাসের। তাদের কোনো সন্তান নেই। ডিসেম্বর মাসে স্ত্রীকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার। স্বামীকে হারিয়ে সুমাইয়া বারবার বলছেন, "আমাকেও নিয়ে যাও, আমি কেমনে থাকব। আমার কোনো অস্তিত্ব রইল না। আল্লাহ, আমি এখন কী করব?"

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, টেকনাফের রঙ্গীখালী এলাকার গহিন পাহাড়ে প্রায় ১২০ জন রোহিঙ্গা ও বাঙালিকে জিম্মি করে রেখেছিল ১৫ থেকে ১৬ জনের একটি সশস্ত্র মানবপাচারকারী দল। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাদের উদ্ধারে বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় যৌথ বাহিনী।

যৌথ বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে সশস্ত্র মানবপাচারকারীরা গুলি ছোড়ে। এ সময় দুপক্ষের মধ্যে গুলিবিনিময় হয়। একপর্যায়ে তিতাসের বাঁ কাঁধে গুলি লাগে। এতে আহত হন তিনি। তাকে উদ্ধার করে প্রথমে লেদা আইআরসি রোহিঙ্গা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য রামুর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

আইএসপিআর জানায়, অভিযানে ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, একটি দেশীয় বন্দুক ও চারটি গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া মানবপাচারকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়েছে। জিম্মি থাকা ৫৭ জনকেও উদ্ধার করা হয়েছে। তিতাসের লাশ বর্তমানে রামু সিএমএইচে রয়েছে। লাশ আনতে সেখানে গেছেন তার ছোট ভাই আকরাম হোসেন।

নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন বলেন, সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুক্রবার বিকালে হেলিকপ্টারে করে তিতাসের লাশ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর কথা। সেখানে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া হবে। পরে পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে দাফন করা হবে।