সুসংবাদ প্রতিদিন
কুষ্টিয়ায় ঘরে ঘরে জৈব সার কারখানা
বাড়তি আয় করছেন নারীরা
প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
এ.এইচ.এম.আরিফ, কুষ্টিয়া

কুষ্টিয়ার জৈব সার উৎপাদন উদ্যোগ রাসায়নিক সারের সংকট ও বাড়তি দামের মধ্যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কৃষকের ঘরে ঘরে গড়ে উঠছে কেঁচো কম্পোস্ট তৈরির ছোট ছোট কারখানা। গোবর, কেঁচো ও ফসলের অবশিষ্টাংশ দিয়ে তৈরি এ সার জমিতে প্রয়োগ করে ভালো ফলন পাওয়ায় বাড়ছে কৃষকের আগ্রহ। বিশেষ করে নারীদের কাছে জৈব সার উৎপাদন হয়ে উঠেছে বাড়তি আয়ের মাধ্যম। কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় বর্তমানে ৭ হাজার ৫১টি প্লান্টে বছরে উৎপাদন হচ্ছে ৬৮ লাখ ৮৬ হাজার কেজি জৈব সার। তবে রাসায়নিক সারের বিশাল চাহিদার তুলনায় এ উৎপাদন এখনও সীমিত, যা দিয়ে প্রতি বছর মোট চাহিদার প্রায় ৩ শতাংশ পূরণ হচ্ছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিকল্পিত উদ্যোগ, প্রশিক্ষণ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ খাতের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব। গোবর-কেঁচোতেই সারের জোগান। কুষ্টিয়ায় দুই ও তিন ফসলি জমিতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার বেশি। সার সংকট ও বাড়তি দামে চাপে রয়েছেন কৃষকরা। এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প হিসাবে নিজ বাড়িতেই জৈব সার উৎপাদন শুরু করেছেন অনেকে। গোবর, কেঁচো, খড়কুটো, ফসলের অবশিষ্টাংশ ও পচনশীল উদ্ভিদজাত বর্জ্য ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে এ সার। সরেজমিন সদর উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, গ্রামের বাড়ির আঙিনায় ছোট ছোট প্লান্টে চলছে জৈব সার উৎপাদন। অনেক বাড়িতে ১০টি করে চাকে সার তৈরি করা হচ্ছে। কৃষকদের ভাষ্য, প্রতিটি বাড়িতে এসব চাক থেকে মাসে ১০ থেকে ১২ মন সার উৎপাদন করা যায়। কোথাও সরকারি উদ্যোগে ভার্মি কম্পোস্ট ও ট্রাইকো কম্পোস্ট তৈরির প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। এসব প্লান্ট দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকে নিজ উদ্যোগেই উৎপাদনে নেমেছেন।
সদর উপজেলার বিত্তিপাড়ার জৈব সার উৎপাদনকারী মনিরা জানান, জৈব সার ব্যবহারে ফসল ভালো হয়। এতে রাসায়নিক সারের ব্যবহারও কমানো যায়। তাদের গ্রামের মানুষ আগের তুলনায় কম রাসায়নিক সার ব্যবহার করছেন। বাড়ির আঙিনায় মরিচ, বেগুনসহ বিভিন্ন সবজি চাষে যেমন এ সার কাজে লাগছে, তেমনি ধান, ভুট্টা, শসা ও অন্যান্য সবজির খেতেও ব্যবহার করছেন কৃষকরা।
উজানগ্রাম, আব্দালপুর ও কাঞ্চনপুর ইউনিয়নে জৈব সার উৎপাদনে যুক্ত উদ্যোক্তাদের অধিকাংশই নারী। বাড়ির কাজের পাশাপাশি তারা সার তৈরি করছেন। নিজেদের জমিতে ব্যবহারের পর বাড়তি সার বিক্রি করছেন। প্রতি কেজি সার ১৫ টাকা দরে বিক্রি করে বাড়তি আয় হচ্ছে তাদের। এসব গ্রাম থেকে অনেকে কেঁচোও কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
স্থানীয় নারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সার বিক্রি করে অনেক পরিবার মাসে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় করছে। এ অর্থ তারা সন্তানদের লেখাপড়া, স্কুলড্রেস তৈরি ও পরিবারের নানা প্রয়োজনে ব্যয় করেন। সার তৈরিতে তুলনামূলক কম পরিশ্রম হওয়ায় এ কাজে নারীদের আগ্রহ বাড়ছে।
কুষ্টিয়া সদর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ৭ হাজার ৫১টি প্লান্টে জৈব সার উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে সরকারি উদ্যোগে স্থাপিত প্লান্ট ৪৬২টি। কৃষকদের নিজস্ব উদ্যোগে গড়ে উঠেছে আরও ৬ হাজার ৫৮৯টি প্লান্ট। সব মিলিয়ে বছরে উৎপাদন হচ্ছে ৬৮ লাখ ৮৬ হাজার কেজি জৈব সার। কৃষি বিভাগ বলছে, কৃষকের বাড়িতে জৈব সার উৎপাদন কার্যক্রম সম্প্রসারণে নিয়মিত কাজ করছেন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা। অব্যবহৃত জৈব উপাদান কাজে লাগিয়ে সার তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছে। নিজেদের জমিতে ব্যবহারের পাশাপাশি ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সম্ভাবনাও রয়েছে।
কুষ্টিয়া সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রূপালী খাতুন বলেন, কৃষকের ঘরে ঘরে জৈব সার উৎপাদনে কৃষি বিভাগ নীরবে কাজ করে যাচ্ছে। প্রায় প্রতি সপ্তাহে আমি ও আমার দলের সদস্যরা উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করছি। তাদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। একজনের উদ্যোগ থেকে শুরু করে এখন বিভিন্ন গ্রামের কৃষকরা এ কাজে যুক্ত হয়েছেন। এটিকে বড় সাফল্য হিসাবে দেখছি আমি।
কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. শওকত হোসেন ভুঁইয়া বলেন, মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ ও রাসায়নিক সারের ওপর একক নির্ভরতা কমাতে কুষ্টিয়ার জৈব সার উৎপাদন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
