ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটর

'জেন-জি ক্ষেপে গেলে বিপদ'

শুনানিতে উত্তেজনা

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

'জেন-জি ক্ষেপে গেলে বিপদ আছে'— আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীর জেরা চলাকালে প্রসিকিউশনের এক সদস্যের এমন মন্তব্য ঘিরে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। মন্তব্যটিকে এক পর্যায়ে 'হুমকি' হিসেবে উল্লেখ করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী। পরে উভয়পক্ষকে সতর্ক করে দেন ট্রাইব্যুনাল।

গতকাল রোববার ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১৩ নম্বর সাক্ষীকে জেরা চলছিল।

আসামিপক্ষে সাক্ষীকে জেরা করছিলেন আইনজীবী পলাশ চন্দ্র রায়। সঙ্গে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরীসহ অন্যান্য আইনজীবীরা। প্রসিকিউশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর আবদুস সোবহান তরফদার, গাজী এমএইচ তামিম ও সহিদুল ইসলাম সরদারসহ অন্যান্যরা।

জেরার এক পর্যায়ে সাক্ষীর কাছে ২০২৪ সালের হাইকোর্টের একটি রায় নিয়ে জানতে চান আইনজীবী পলাশ। জবাবে সাক্ষী বলেন, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ২০২৪ সালের ৯ জুলাই অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে আন্দোলনকারী ছাত্রদের একটি প্রতিনিধিদল স্মারকলিপি দিয়েছিল কি না, তা তার জানা নেই। একই তারিখে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে একটি আবেদন করা হলেও সেটি ছিল তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের একটি 'মনভোলানো কৌশল'। পরবর্তী সময়ে ওই মামলার শুনানির তারিখ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে সাক্ষী জানান যে তা তার মনে নেই। এরপর আরও কিছু প্রশ্ন করা হলে প্রসিকিউশন থেকে আপত্তি তোলা হয়। এ সময় আসামিপক্ষের সারিতে বসা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী প্রসিকিউশনের উদ্দেশ্যে বলেন, প্রসিকিউশনই জেরা করুক, আমরা বসে যাই। ট্রাইব্যুনাল মুনসুরুল হককে ডায়াসে এসে কথা বলতে বললে তিনি অভিযোগ করেন, প্রসিকিউশন থেকে কেউ দাঁড়িয়ে গেলে সাক্ষীর মনোযোগ অন্যদিকে সরে যায় এবং তিনি সতর্ক হয়ে যান, যার ফলে সত্য বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ সময় ট্রাইব্যুনালের অনুমতি নিয়ে সম্পর্কিত আইন পড়ে শোনান প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম।

আইন পড়া শেষে পুনরায় জেরা শুরু হলে কাঠগড়ায় বসা সাক্ষীর উদ্দেশ্যে আসামিপক্ষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে, প্রসিকিউশনের দিকে মুখ ফিরিয়ে জবাব দিন। জবাবে সাক্ষী 'ঠিক আছে, তাহলে আমি সরে যাই' বলে তার চেয়ার ঘুরিয়ে নেন। সাক্ষীর এমন আচরণ দেখে প্রসিকিউশনের এক সদস্য বলে ওঠেন, 'জেন-জি ক্ষেপে গেলে বিপদ আছে'। এতে ডায়াসে দাঁড়ানো আইনজীবী পলাশ চন্দ্র রায় আপত্তি জানিয়ে বলেন, তাহলে আমার জেরা করা ঠিক হবে না, এটি এক ধরনের থ্রেট। এ নিয়ে উভয়পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা শুরু হলে ট্রাইব্যুনাল হস্তক্ষেপ করে দুই পক্ষকেই শান্ত ও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন।

পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পর আইনজীবী পলাশ আবার জেরা শুরু করে ৯ জুলাই কোনও সহিংসতা হয়েছিল কি না জানতে চান। জবাবে সাক্ষী জানান, ২০২৪ সালের ৯ জুলাই সরকারের পক্ষ থেকে কোনও সহিংসতা হয়নি; তবে বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়েছিল।

গত ১২ জানুয়ারি সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর তাদের বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ আদালত আমলে নেন।

প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগগুলোর মধ্যে প্রথমটিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলন দমনে মূল নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতেন সালমান ও আনিসুল। এর ধারাবাহিকতায় ১৯ জুলাই ফোনালাপে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আন্দোলনকারীদের আজ রাতেই কারফিউ জারির মাধ্যমে শেষ করে দেওয়ার কথা বলেন। তাদের প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্রের কারণে বহু ছাত্র-জনতা প্রাণ হারালেও নির্যাতন বন্ধে তারা কোনও ব্যবস্থা নেননি।

দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, তাদের প্রত্যক্ষ জানা ও উসকানিতে ২৩ জুলাই রাজধানীর মিরপুরে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দলীয় ক্যাডাররা। তৃতীয় অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহারে প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ২৮ জুলাই মিরপুর-১০ নম্বরে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছেন এই দুই প্রভাবশালী। চতুর্থ অভিযোগে বলা হয়, কারফিউ জারি করে মারণাস্ত্র ব্যবহারের উসকানি ও প্ররোচনায় ৪ আগস্ট মিরপুর-১ এ আকাশ, সেতু ও আলভীসহ মোট ১২ জনকে হত্যা করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। আর পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার 'মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচি ব্যর্থ করতে পরিকল্পনা করেন সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক। তাদের নির্দেশে প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের হামলায় মিরপুর-২, ১০ ও ১৩ নম্বর এলাকায় আল-আমিন, আশরাফুল, সাব্বির ও রিতাসহ ১৬ জন হত্যার শিকার হন।