ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বরেন্দ্র জাদুঘরের ৯৪ শতাংশ প্রত্নতত্ত্ব গুদামে পড়ে আছে

বরেন্দ্র জাদুঘরের ৯৪ শতাংশ প্রত্নতত্ত্ব গুদামে পড়ে আছে

জায়গার অভাবে রাজশাহীর বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের বেশিরভাগ প্রতœতত্ত্বই প্রদর্শন করা যাচ্ছে না। যেগুলো প্রদর্শিত হচ্ছে না সেগুলো গুদামে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। সেখানে দিনে দিনে তা নষ্ট হচ্ছে। প্রস্তর ও ধাতব প্রতœ ভাস্কর্য, টেরাকোটা, মুদ্রা ও পা-ুলিপি, ধাতব সামগ্রী এবং শিলালিপি মিলে প্রায় ১৯ হাজারের মতো প্রতœ নিদর্শন রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ নিদর্শন প্রদশিত হয়। স্থান সংকুলান না হওয়ায় প্রায় ৯৪ শতাংশ প্রতœতত্ত্বই রাখা হয়েছে গুদামঘরে। প্রদর্শিত হচ্ছে মাত্র ৬ শতাংশ। এখানে রয়েছে প্রাচীন সব পুঁথি। এসব পুঁথি রাখা হয়েছে একটি ঘরে। সেটি প্রদর্শনের জন্য নয়। সংরক্ষণ করা হচ্ছে এই ঘরে। যথযথভাবে সংরক্ষণের অভাবে পুঁথিগুলো এখন নষ্টের পথে। কোনো কোনোটি আবার একবারেই নষ্টের উপক্রম। এসব পুঁথির ডিজিটাল কপিও নেই জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে। ফলে হাজার বছরের পুরোনো নিদর্শন এখন হারাতে বসেছে।

দেশের প্রাচীনতম সংগ্রহশালা বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর। এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বঙ্গজ ভাষ্কর্য শিল্পের শ্রেষ্ঠ সংরক্ষণাগার ও জাদুঘরের সূচনা ঘটে ১৯১০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ‘বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। দুই বাংলার ইতিহাসে এ সমিতিই প্রথম জাদুঘর কার্যক্রম শুরু করে। ১৯১৪ সালে এই সমিতিকে ‘১৮৬০ সালের ভারতীয় সমিতি আইন’ অনুযায়ী নিবন্ধন করা হয়। এ দেশের তিনজন কৃতি সন্তান দীঘাপতিয়ার রাজবংশজাত দয়ারামপুরের জমিদার প্রতœ অনুরাগী শরৎকুমার রায়, প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় এবং খ্যাতনামা নৃতত্ত্ব ও শিক্ষাবিদ রমাপ্রসাদ চন্দ্র এই অনুসন্ধান সমিতি প্রতিভার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তারা যথাক্রমে ছিলেন সমিতির সভাপতি, পরিচালক ও সম্পাদক। বরেন্দ্র অঞ্চল এবং বাংলার ইতিহাস, শিল্প, সাহিত্য, ধর্ম, সমাজ প্রভৃতি বিষয়ে প্রামাণ্য তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য শরৎকুমার রায়ের ব্যক্তিগত অবদান বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তার অদম্য জ্ঞান পিপাসা এবং পুরাতত্ত্বের প্রতি গভীর অনুরাগ এই প্রচেষ্টাকে সার্থক রূপ দিতে সহায়তা করেছিল। তিনি নিজ ব্যয়ে এই জাদুঘর ভবন নির্মাণ করেন। ১৯১৬ সালের ১৩ নভেম্বর জাদুঘরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তদানীন্তন বাংলার গভর্নর লর্ড কারমাইকেল। নির্মাণ শেষে ১৯১৯ সালের ২৭ নভেম্বর এর দ্বারোম্মচন করেন লর্ড রোনান্ডসে। এরপর জাদুঘর ও সমিতির সার্বিক উন্নয়নের জন্য ১৯৩৭ সালের ৬ নভেম্বর আধা সরকারি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হতে থাকে এটি। ১৯৪৭ সালের পরে জাদুঘরটি রক্ষণাবেক্ষণ ও টিকিয়ে রাখা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা থেকে উন্নয়ন ঘটাতে ১৯৬৪ সালের ১০ অক্টোবর থেকে এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়ে আসছে। বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর কর্তৃপক্ষের উপপ্রধান সংরক্ষণ কর্মকর্তা আবদুল কুদ্দুস জানান, প্রায় ১ হাজার ৫০০ বছরের প্রাচীন প্রস্তর ও ধাতব প্রতœ নিদর্শন, খ্রিষ্টপূর্ব এবং মুসলিম ও প্রাক-মুসলিম যুগের বিভিন্ন শ্রেণির মুদ্রা, হাজার বছরের প্রাচীন পুঁথি সাহিত্যের পা-ুলিপি নিয়ে সমৃদ্ধ প্রত্মতাত্ত্বিক এই জাদুঘরটি। এখানে প্রস্তর ও ধাতব প্রত্ম ভাস্কর্য, টেরাকোটা, মুদ্রা ও পা-ুলিপি, ধাতব সামগ্রী এবং শিলালিপি মিলে প্রায় ১৯ হাজারের মতো প্রতœ নিদর্শন রয়েছে। ৫ হাজার বছরের প্রাচীন টেরাকোটা। মিউজিয়ামে স্বর্ণ, রৌপ্য, তাম্য ও মিশ্র ধাতুতে নির্মিত সাড়ে ৬ হাজারের মতো মুদ্রা রয়েছে। এমনকি খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ থেকে ৪০০ বছর পূর্বের সিলভারে ছাপাঙ্কিত মুদ্রার অস্তিত্ব মেলে এখানে। মিউজিয়ামে রয়েছে সাড়ে ৫ হাজার বছরের প্রাচীন পুঁথি সাহিত্যের পা-ুলিপি, যার অধিকাংশ সংস্কৃত ও আদি বাংলা ভাষায় রচিত। এর মধ্যে সংস্কৃত আছে ৩ হাজার ৯০০ আর বাংলা আছে ১ হাজার ৭০০। সবচেয়ে বেশি আলোচিত ১২৭৩ খ্রিষ্টাব্দ এবং ত্রয়োদশ শতকের কোনো একসময়ে তালপাতায় লিখিত ও রঙিন চিত্রকর্ম দ্বারা শোভিত দুইটি অষ্ট সাহস্রিকা প্রজ্ঞা পারমিতা পা-ুলিপি, যা বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।

১৯ হাজার নিদর্শনের মধ্যে স্থান সংকুলান না হওয়ায় প্রদর্শনীর জন্য মিউজিয়ামের ১১টি গ্যালারিতে প্রায় ১ হাজার ২০০টি প্রতœ নির্দশন রাখা হয়েছে। বাকিগুলো রয়েছে মিউজিয়ামের পাঁচটি গুদামঘরে। ফলে প্রাচীন এই নিদর্শনগুলো দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন দর্শনার্থীরা। আবার বদ্ধঘরে রাখার ফলে নিদর্শনের রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণ করা নিয়েও দেখা দিয়েছে সংশয়। মূল্যবান এই মিউজিয়াম রক্ষায় রয়েছে নিরাপত্তারও ঘাটতি। শুধু লাঠি হাতেই কোটি টাকার সম্পদ পাহারা দেন এখানকার আনসার সদস্যরা। নেই কোনো সিসি ক্যামেরাও। এদিকে, এসব প্রতœতত্ব সংরক্ষণ করার দাবি জানিয়েছেন ইতিহাসবিদরা। তাদের দাবি, এগুলো অন্তত একটি করে ডিজিটাল কপি সংরক্ষণ দরকার।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান বলেন, যাদুঘরে আমাদের আনেক নিদর্শন আছে। এগুলো কোনো কোনোটি আবার বিশ্বজুড়েই বিরল পুঁথি। কিন্তু এগুলো তালপাতার ও অন্যান্য কাগজের উপকরণের হওয়ায় সেগুলো এখন নষ্টের পথে।

বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের পরিচালক অধ্যাপক ড. আলী রেজা মুহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, সব প্রতœ নির্দশন স্টোর রুম থেকে বের করে ডিসপ্লের জন্য একটা মাস্টারপ্ল্যান দেওয়া হয়েছে। এজন্য মূল ভবনের বাইরে ফাঁকা জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণ বা মূল ভবনের পেছনে পরিচালকের বাস ভবনের উপরে বহুতল ভবন নির্মাণ করার জন্য মাপামাপি করা হয়েছে। দ্রুতই এটি বাস্তবায়ন হবে।

তিনি বলেন, প্রতিটি জিনিসেরই একটি মেয়াদকাল আছে। আমাদের এখানের পুঁথিগুলো নষ্ট হচ্ছে। এজন্য আমরা একটি ডিজিটাল স্ক্যানার চেয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এটি দিলে এগুলোকে আমরা সংরক্ষণ করব।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার বলেন, আমরা জানি দীর্ঘদিন ধরেই এটি উপেক্ষিত অবস্থায় আছে। আমরা এটিকে নিয়ে পরিকল্পনা করছি। সম্প্রতি জাদুঘরের উন্নয়ন নিয়ে সভাও করেছি। এখানকার প্রতœতত্ত্বগুলোর সংরক্ষণ থেকে শুরু করে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করার কাজ শুরু হবে। সেই সাথে জাদুঘরের আধুনিকায়নেরও কাজ হবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত