
হোসিয়ারি শিল্প থেকে নিট গার্মেন্ট শিল্পের উদ্ভব হলেও নারায়ণগঞ্জে দেড় যুগ ধরে শিল্পটি অবহেলিত রয়ে গেছে। গার্মেন্ট শিল্পের জন্য পৃথক জোন গড়ে উঠলেও হোসিয়ারি শিল্প চলছে বিচ্ছিন্নভাবে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোগে গড়ে ওঠা এ শিল্পটির প্রতি সুনজর দেয়নি কোনো সরকারই। রাশিয়া ইউক্রেনের যুদ্ধে আর্ন্তজাতিক বাজারে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সুতা, সুইসহ সব উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দফায় দফায় বাড়ছে কাপড়ের মূল্য। আমদানিনির্ভর এ শিল্পের উপকরণ ও মেশিনারিজের দাম ক্রমেই বেড়ে চলেছে। যে কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। তবে উৎপাদিত পণ্যের দাম আশানুরূপ বাড়ছে না। উচ্চমূল্যের কারণে হোসিয়ারি পণ্য কিনতে আগ্রহ হারাচ্ছে ক্রেতারা যে কারণে বাজারে বেচাকেনাও অনেক কমে গেছে। এতে সংকটে রয়েছে হোসিয়ারি শিল্পের কারখানা মালিক ও ব্যবসায়ীরা।
উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা জানান, সময়ের ব্যবধানে হোসিয়ারি শিল্পটি নারায়ণগঞ্জের নয়ামাটি থেকে উকিলপাড়া, দেওভোগ, সোহরাওয়ার্দী মার্কেট ও থানার পুকুরপাড়ে বিস্তৃত হয়। এরপর জেলার ফতুল্লা এলাকার পঞ্চবটীতে বিসিক শিল্পনগরীতে এর বিস্তার ঘটে। এছাড়া ডেমরা, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় হোসিয়ারি পণ্য তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে।
একসময় হোসিয়ারি পণ্য হিসেবে শুধু গেঞ্জি তৈরি হলেও সময়ের ব্যবধানে চাহিদা অনুযায়ী যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন সামগ্রী। বর্তমানে হোসিয়ারি শিল্পে গেঞ্জি ও অন্তর্বাস ছাড়াও ট্রাউজার, টি-শার্ট, সোয়েটার, মাফলার, টুপি, মোজা, মশারির কাপড় ইত্যাদি তৈরি হচ্ছে। জনসংখ্যার সঙ্গে চাহিদা বাড়ায় বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ী হোসিয়ারি পণ্য উৎপাদনে যুক্ত হয়েছেন। কোনো ধরনের সরকারি সহায়তা ছাড়াই তারা সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে খাতটির প্রসার ঘটিয়েছেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ফলে এই ব্যবসাকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জ শহরের বিরাট অংশে প্রাণচাঞ্চল্য থাকে প্রায় সারা বছর।
জানা যায়, শিল্পটির অস্তিত্ব রক্ষায় নারায়ণগঞ্জের হোসিয়ারি শিল্প ইউনিটকে কেন্দ্রীভূত করে পুনর্বাসন ও নতুন কারখানা স্থাপনে ১৯৮৫ সালে মনোটাইপ শিল্পনগর স্থাপনের পরিকল্পনা নেয় সরকার। পরে ১৯৯০ সালে বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ হোসিয়ারি অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে পঞ্চবটীর শাসনগাঁও এলাকায় ৫৮ দশমিক ৫২ একর জায়গার ওপর বিসিক হোসিয়ারি শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠা করা হয়। জমির মূল্য বাবদ অ্যাসোসিয়েশন দুই কোটি ৬৪ লাখ টাকা দেয়। হোসিয়ারি শিল্পনগরের ৭১৪টি ইউনিটের মধ্যে পাঁচ কাঠার ১৮৬টি বড় প্লট এবং তিন কাঠার ৫২৮টি ছোট প্লট। তবে অভিযোগ আছে, শিল্পনগরের প্লটগুলো হোসিয়ারি মালিকদের মধ্যে বরাদ্দ করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো ধরনের ঋণ-সহায়তার উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এতে ব্যবসায়ীদের একটা অংশ অর্থাভাবে সেখানে কারখানা স্থাপন করতে পারেনি। তাই অনেকেই বরাদ্দ পাওয়া প্লট বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। আর সেসব প্লটেই কালক্রমে গড়ে উঠেছে রপ্তানিমুখী নিট পোশাকের ছোট-বড় বিভিন্ন কারখানা। বাস্তবে সেখানে ক্ষুদ্র হোসিয়ারি শিল্পের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হোসিয়ারির বড় কারখানাগুলো মূলত নিজেরাই নিজেদের ফেব্রিকস বা কাপড় তৈরি করে নেয়। তবে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো কাপড়ের জন্য নির্ভর করে গার্মেন্টের বাড়তি ফেব্রিকসের ওপর। এসব কাপড় প্রধানত নারায়ণগঞ্জ শহরের দুই নম্বর রেলগেট-সংলগ্ন এলাকার বিভিন্ন দোকান থেকে সংগ্রহ করা হয়। এছাড়া বড় ব্যবসায়ীদের অনেকেই সরাসরি বিভিন্ন গার্মেন্ট থেকে ফেব্রিকস সংগ্রহ করে থাকেন। তবে গেঞ্জি তৈরিতে সবাইকেই বিভিন্ন ওজনের (পুরুত্ব অনুসারে) সুতার বুননের ওপর নির্ভর করতে হয়। পূর্বে সুতা তৈরি থেকে শুরু করে বুনন, কর্তন, সেলাই, ইস্ত্রি সম্পন্ন করে একটি গেঞ্জি তৈরিতে মাস দেড়েক সময় লাগত। এখন গার্মেন্ট থেকে কাপড় আসায় সময় কম লাগছে। আর দামেও সস্তা। তবে মানের দিক দিয়ে এগুলো পিছিয়ে। ফেব্রিকস পাওয়া গেলেও হোসিয়ারি শিল্পের সুই, সুতা, ইলাস্টিকসহ সব যন্ত্রপাতি আমদানিনির্ভর। হোসিয়ারি শিল্পের সেলাই মেশিন সাধারণত জাপান থেকে বেশি আমদানি করা হয়। তবে অন্যান্য দেশ থেকেও সেলাই মেশিন আমদানি করা হয়। মেশিনের সুই বর্তমানে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। পূর্বে কানাডা ও জার্মানি থেকে সুই আমদানী করা হতো। একসময় কানাডা ও জার্মানি সুই রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ায় বর্তমানে ভারত থেকেই বেশি আমদানি করতে হচ্ছে।
নয়ামাটির এবিএস হোসিয়ারি এন্ড গার্মেন্টের স্বত্বাধিকারী শাহাদাৎ হোসেন জানান, আগে যে সুতা প্রতি পাউন্ড ১২০-১৪০ টাকা দরে বিক্রি হতো সেই সুতা বর্তমানে ২২০-২৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে যে সুই আগে প্রতি প্যাকেট (১০ পিসবিশিষ্ট) ২৫ টাকা দরে বিক্রি হতো সেটা বর্তমানে ৩৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এভাবে সুই, সুতা, জিপার, ইলাস্টিকসহ সব উপকরণের মূল্য প্রায় দেড় থেকে দুই গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে করে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাড়তি দামে ক্রেতারা পণ্য ক্রয় করতে আগ্রহী হচ্ছে না বিধায় বেচাকেনাও অনেক কমেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, হোসিয়ারি শিল্পের উপকরণ ও যন্ত্রপাতি সবই আমদানি করতে হয়। এ ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়া প্রয়োজন। শুল্কমুক্ত বা শুল্ক ছাড়ের সুবিধা পেলে ব্যবসায়ীরা সহজেই সুলভ মূল্যে উপকরণ ও উন্নত যন্ত্রপাতি আমদানি করতে পারবেন। এতে স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদন বাড়বে।
বাংলাদেশ হোসিয়ারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল আলম সজল বলেন, দফায় দফায় বাড়ছে কাপড়ের মূল্য। এর সঙ্গে সুতা, সুইসহ সব উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি তো রয়েছেই। আমাদের আমদানিকৃত উপকরণের মূল্য কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের উৎপাদিত পণ্যের দরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু উচ্চমূল্যের কারণে ক্রেতারা হোসিয়ারি পণ্য কিনতে আগ্রহ হারাচ্ছে। বর্তমানে আমাদের বেচাকেনা অর্ধেকের বেশি কমে গেছে। যে কারণে বর্তমানে হোসিয়ারি শিল্পের মালিক ও ব্যবসায়ীরা সংকটে রয়েছেন।