‘সচিবদের ফ্ল্যাট হার মানাবে বিলাসবহুল হোটেলকেও’

প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর মিন্টো রোডে সচিবদের যে ফ্ল্যাট আছে, সেগুলোর সুযোগ-সুবিধার বিবেচনায় সেগুলো বিলাসবহুল হোটেলকেও হার মানাবে। সরকারের এ ধরনের ব্যয়ের জন্য কে জবাবদিহি করবে, তা আলোচনার মধ্যে নেই। খরচের সঠিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া বাংলাদেশ আগাতে পারবে না। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর তোপখানা রোডের সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘অর্থনৈতিক শাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ’ শীর্ষক এক নীতি সংলাপে এসব কথা বলেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। নীতি সংলাপ আয়োজন করেছে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)।

নীতি সংলাপে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বিপুল হারে বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার কতটা বেড়েছে, বেতন বৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক- তার ব্যাখ্যা কোথায়? রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের কার্যকারিতা কোথায় বেড়েছে, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ খতিয়ান প্রয়োজন। সরকারের অপচয়মূলক প্রকল্প ও পরিচালন ব্যয় নিয়ে সেভাবে আলোচনা হয় না। এসব ব্যয়ের ক্ষেত্রে কার্যকর জবাবদিহিও দেখা যায় না।

সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আলোচনা করেন রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‍্যাপিড) নির্বাহী পরিচালক এম আবু ইউসুফ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) সায়মা হক, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সাবেক সভাপতি শাহেদুল ইসলাম হেলাল।

আরও বক্তব্য দেন ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের স্কুল অব বিজনেসের ডিন এমএ বাকী খলিলী, রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বারভিডার সভাপতি আবদুল হক, জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান সরদার এ নাঈম ও ব্যবসায়ী নেতা শাহদাত হোসেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী।

হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কয়েকটি গুরুতর অদক্ষতা দানা বেঁধে আছে। এর একটি হলো অর্থায়ন-সংকট। দ্বিতীয়টি সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব এবং আরেকটি হলো ক্ষমতাবানদের অহমিকা দেখানোর প্রকল্প। তিনি বলেন, সম্প্রতি বিমানের পরিচালনা পর্ষদে হঠাৎ তিনজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে; এর ব্যাখ্যা কী? নিয়োগের যৌক্তিক কারণ থাকলে তা প্রকাশ করতে সমস্যা কোথায়? সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব এই সরকারের মধ্যেও আছে। আগেও এই সমস্যা ছিল, ভবিষ্যতে যেন তা আর না থাকে, তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।’

ক্ষমতাবানদের অহমিকা দেখানোর প্রকল্প প্রসঙ্গে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, অনেক আইসিটি পার্ক এখন কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ভাড়া দিয়ে দারোয়ানদের বেতন চালাতে হচ্ছে। এসব প্রকল্পের মানসিকতা রাষ্ট্রীয় চিন্তার মধ্যে ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে সংশয়ের কথা জানিয়ে সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান বলেন, নির্বাচন হবে কি না, সে বিষয়েও তাঁর সংশয় আছে। সরকার ইতিহাসের সেরা নির্বাচনের কথা বলছে, কিন্তু বাস্তবে তা ইতিহাসের নিকৃষ্টতম নির্বাচন হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

জিল্লুর রহমান বলেন, দেশ এখন নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু প্রতিদিন সরকার যেসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সেগুলো রুটিন কাজের মধ্যে পড়ে না- এসব সিদ্ধান্ত সাধারণত রাজনৈতিক সরকারের নেওয়ার কথা। তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, তা এখনও পরিষ্কার নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর দিকেও তাকালে দেখা যায়, জনগণ কার্যত উপেক্ষিত।

দুর্নীতি কমছে না উল্লেখ করে সিজিএস প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান বলেন, ‘আমরা যখন নীতির কথা বলি, তখন মূলত আর্থিক দুর্নীতির কথাই বলি। অথচ দুর্নীতির বহুমাত্রিক রূপ রয়েছে আমরা সাধারণত তা উপেক্ষা করি। সরকার এত সংস্কারের কথা বলেছে, এত সংলাপ করেছে, কিন্তু একটি দৃশ্যমান উদাহরণও তৈরি করতে পারেনি। এমনকি ট্রাফিক ব্যবস্থার মতো একটি মৌলিক জায়গাতেও তারা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে।’

মেগা প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ও স্বচ্ছতার ঘাটতি আছে বলে অভিযোগ করেন হোসেন জিল্লুর। দুর্নীতি বড় সমস্যা, কিন্তু দুর্নীতি কমেছে, এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণা তা প্রমাণ করতে পারেনি। মানুষ আর প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না, তারা বাস্তব কাজ দেখতে চায়। দুর্নীতি দমন কমিশন, মিডিয়া কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ বাস্তবে কার্যকর হয়নি।

ডিজিটালাইজেশন দুর্নীতি পুরোপুরি দূর না করলেও অনেক সমস্যা কমাতে পারে বলে মন্তব্য করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) সায়মা হক বিদিশা। তিনি বলেন, ডিজিটালাইজেশনের কারণে ভারসাম্য আসতে পারে। তবে এর জন্য ডিজিটাল সাক্ষরতা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে কর রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া আংশিক ডিজিটাল হলেও বাস্তবে তা এখনও জটিল ও কাগজনির্ভর।

র‍্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক এম আবু ইউসুফ বলেন, ‘আমাদের সুশাসনের বিষয়টি দুই দিক থেকেই ভাবতে হবে। আমরা প্রায়ই উন্নয়ন বাজেট কমানোর কথা বলি, কিন্তু অপারেশনাল বাজেট কমানোর সুযোগও রয়েছে। একজন এমপি বা মন্ত্রীর কতগুলো গাড়ি প্রয়োজন, কেন তারা ট্যাক্স-ফ্রি গাড়ি পাবেন, কতজন কর্মী রাখা যৌক্তিক- এসব প্রশ্ন তোলা দরকার। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই সম্পদের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না।

এদিকে এমপি-মন্ত্রীদের সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন। তিনি আরও বলেন, এমপিদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অনেক কথা হয়। কিন্তু তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের এমপিরা তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পান না। ভারতের সংসদের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের এমপিদের বেতন-ভাতা বরং কম।

আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, নীতিগতভাবে এমপিদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা থাকা উচিত। তবে একটি শর্তে এমপি হওয়াটা হবে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব, কোনোভাবেই পার্টটাইম পেশা নয়। অনেকে এমপি হন মূলত ব্যবসা বা পেশাগত সুবিধা বাড়ানোর জন্য। সংসদ সদস্য পরিচয় ব্যবহার করে সচিবালয়, মন্ত্রী বা আমলাদের কাছে সহজে তদবির করা যায়, এটাই বাস্তবতা।