কৃষ্ণচূড়া ও ক্যাসিয়ায় নবরূপে জাহাঙ্গীরনগর

প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  রবিউল হাসান

ঢাকার অদূরে সবুজের স্বর্গখ্যাত সাভারের লাল মাটির ক্যাম্পাস জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ভিন্নরূপে বইছে ফাল্গুনের হাওয়া। শীতের রিক্ততা কাটিয়ে প্রকৃতির নতুনের ছোঁয়ায় চিরচেনা সেই লাল ইটের দালান আর পিচঢালা পথগুলো এখন সেজেছে বসন্তের নিজস্ব রঙে। অতিথি পাখিরা বিদায় নিলেও ক্যাম্পাসের আকাশে-বাতাসে এখন উড়ছে বসন্তের পুষ্পরেণু। বিশেষ করে দুর্লভ নীল কৃষ্ণচূড়া আর জাপানি ক্যাসিয়া রেনিজেরার মায়াবী রূপে এখন মোহাবিষ্ট পুরো ক্যাম্পাস।

জাবিতে বসন্ত এলেই কৃষ্ণচূড়ার এক আদিম সখ্যতা চোখে পড়ে। যদিও রক্তলাল কৃষ্ণচূড়া সাধারণত গ্রীষ্মের রুদ্ররূপে পূর্ণতা পায়, তবে ফাল্গুনের এই শুরুতেই ক্যাম্পাসের প্রধান সড়কগুলোর দুই পাশে থাকা গাছগুলোতে উঁকি দিতে শুরু করেছে লাল আভা। বসন্তের দখিনা বাতাসে যখন এই রক্তিম ফুলগুলো দোল খায়, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অংশীজনদের মধ্যে ভিন্ন এক উৎসবের আমেজ বিরাজ করে। জাহাঙ্গীরনগর আর কৃষ্ণচূড়া যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। এখানে এলেই বোঝা যায় একটি ছাড়া অন্যটির বসন্ত অসম্পূর্ণ।

পুরো দেশে লাল কৃষ্ণচূড়ার আধিপত্য থাকলেও ফুলের আদরে জড়ানো এই সবুজ ক্যাম্পাস এখন মাতোয়ারা তার দুর্লভ ‘নীল কৃষ্ণচূড়া’ বা ‘জ্যাকারান্ডা’ (Jacaranda mimosifolia) নিয়ে। ক্যাম্পাসের পরিবহন চত্বর এবং বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল ও কলেজ সংলগ্ন পুকুরপাড়ে থাকা গাছগুলো এখন নীলচে-আকাশি ফুলে ছেয়ে আছে। সরেজমিনে ঘুরে এমনই নজরকাড়া দৃশ্য চোখে পড়ে।

ব্রাজিলীয় বংশোদ্ভূত এই ‘নীলকণ্ঠ’ বা ‘নীল গুলমোহর’ গাছগুলো বসন্তের শুরুতেই নীলিমার স্নিগ্ধতা নিয়ে হাজির হয়। ২০১৭ সালে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের রোপণ করা এই গাছগুলো এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশীজনদের বসন্ত উদ্যাপনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। লাল মাটির ক্যাম্পাসে এই নীল আভা যেন এক টুকরো আকাশকে মাটির কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। বসন্তের এই সময়ে জাবিতে অন্য সব ফুলের মধ্যে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ জাপানি ক্যাসিয়া রেনিজেরা। নতুন ও পুরোনো কলা ভবন এবং সমাজবিজ্ঞান অনুষদ এলাকায় এই গাছগুলো এখন রূপের পসরা সাজিয়ে বসেছে। গোলাপি ও সাদার মিশ্রণে ফুটে থাকা এই ফুলগুলো দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন সুদূর জাপানের চেরি ব্লসম নেমে এসেছে জাবির বুকে।

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. এআর খানের হাত ধরে ২০০০ সালে ক্যাম্পাসে আসা এই ‘বার্মিজ পিংক ক্যাসিয়া’ এখন জাহাঙ্গীরনগরের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। বসন্তের দুপুরে যখন ক্যাসিয়ার পাপড়িগুলো টুপটুপ করে ঝরে পড়ে, তখন তৈরি হয় এক অপার্থিব রোমান্টিক আবাহন। বিচিত্র পুষ্পরাজির সমারোহ ও তারুণ্যের স্পন্দনে বসন্তের এই প্রারম্ভে জাবির প্রকৃতি শুধু নীল কৃষ্ণচূড়া বা ক্যাসিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। ক্যাম্পাসের আনাচে-কানাচে এখন দেখা মিলছে রাধাচূড়া, কনকচূড়া, সোনালু, জারুল, স্বর্ণচাঁপা আর কাঠগোলাপের হাসি। মধুমঞ্জুরি আর নাগলিঙ্গমের সুবাসে মুখরিত হচ্ছে সন্ধ্যার শান্ত চত্বরগুলো। এতে ক্যাম্পাস এক জীবন্ত উৎসবে পরিণত হয়েছে। পুরো ক্যাম্পাস জুড়েই বিরাজ করছে বসন্তের জয়গান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘বাহারি ফুলের রূপে ক্যাম্পাস আপন মনেই সেজেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পথঘাট কৃষ্ণচূড়া, সোনালু, শুধু ফুটতে শুরু করা জারুল ফুলগুলো যেন এক স্বর্গীয় রূপে সাজিয়েছে। এছাড়া প্রকৃতিকে সাজিয়ে তুলতে কনকচূড়া, লাল জবা, বাগানবিলাস ও কাঠগোলাপ, ক্যাশিয়া রেনিজেরা ও ক্যাশিয়া জাভানিকা ফুলের জুড়ি নেই।’

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ছালেহ আহাম্মদ খান বলেন, ‘আমরা গবেষণায় পেয়েছি, পুরো ক্যাম্পাসে ৯১৭ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে।

এর মধ্যে, ৩৪.৬৮ শতাংশ শোভাবর্ধনকারী উদ্ভিদ রয়েছে যার বেশিরভাগই ফুলের গাছ। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফুলের গাছ বেড়ে ওঠার জন্য যে ধরনের পরিবেশ দরকার, সেটা পুরোপুরি না থাকলেও মোটামুটি আছে। যদি সামগ্রিকভাবে তদারকি করা ও ভালো মানের চারা রোপণ করা হয়, তাহলে ফুলের পরিমাণও বেশি হবে।’