নানা আয়োজনে চবিতে স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপন
প্রকাশ : ২৭ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে শান্তিপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তি ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান। উপাচার্য বলেন, আমরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করতে চাই যেখানে সবাই নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে কাজ করবে এবং শিক্ষালাভ করতে পারবে। যে বিশ্ববিদ্যালয় শুধু বাংলাদেশে নয় বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে এবং গৌরবময় অধ্যায়ে ফিরে যাবে। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের সব শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি সম্মিলিতভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করে তাহলে অচিরেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গৌরবময় অধ্যায় ফিরে পাবে এবং নতুন যাত্রা শুরু করতে পারবে। উপাচার্য গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১০:৪৫টায় মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কর্তৃক আয়োজিত চবি উপাচার্য দপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ বক্তব্য দেন। এর আগে সকাল ১০টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান, উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান এবং উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মো. কামাল উদ্দিন চবি স্বাধীনতা স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে বীর শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর চবির বিভিন্ন পর্ষদের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। সকাল ১০:৩০টায় চবি উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান এর নেতৃত্বে চবি স্বাধীনতা স্মৃতিস্তম্ভ চত্বর থেকে এক বর্ণাঢ্য র্যালি শুরু হয়ে চবি প্রশাসনিক ভবনের সামনে এসে শেষ হয়। সকাল ১০:৪৫টায় চবি উপাচার্য দপ্তরের সম্মেলন কক্ষে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন চবি উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মো. কামাল উদ্দিন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন চবি উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান এবং বিজ্ঞান অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল-আমীন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন চবি রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। উপাচার্য প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপস্থিত সবাইকে মহান স্বাধীনতা দিবসের রক্তিম শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, স্বাধীনতার মহানায়ক এবং স্বাধীনতার ঘোষক শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সর্বপ্রথম বলেছিলেন, ‘Major Ziaur Rahman do hereby declare the Independence of Bangladesh.’ এটাই ছিল স্বাধীনতার মূলমন্ত্র। এটাই ঝিমিয়ে পড়া বাঙালি জাতিকে নতুন করে উজ্জীবিত করেছিল। এ দেশের মানুষের মুক্তির জন্য মাঠে ঝাপিয়ে পড়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিল। এর আগেরদিন অর্থাৎ ২৫ মার্চ কালোরাতে পাকিস্তানিরা চেয়েছিল আমাদের বুদ্ধিজীবীদের, এ দেশের দিক-নির্দেশকদের ওপর হত্যাযজ্ঞ করে এ দেশের স্বাধীনতাকে থামিয়ে দিতে, কিন্তু এ দেশের কৃষক জনতা, ছাত্র-শিক্ষক, দিনমজুর সকলের প্রচেষ্টায় এ দেশের মানুষকে কেউ থামিয়ে রাখতে পারেনি। সর্বশেষ আমাদের সেই কাঙ্খিত বিজয় অর্জন করেছি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে শাহাদাতবরণকারী শহিদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন মাননীয় উপাচার্য। এছাড়া যারা রক্ত দিয়েছেন সকলকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। উপাচার্য বলেন, ইতিহাসের অনন্য অংশ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অনন্য নজীর স্থাপন করেছিল। চবির প্রায় ১৫ জন শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী শহিদসহ অসংখ্যজন রক্ত দিয়েছেন স্বাধীনতা সংগ্রামে। উপাচার্য তাদের সবাইকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, আমি গর্বিত যে, এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে আমি নিযুক্ত হয়েছি যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী স্বাধীনতা সংগ্রামে রক্ত দানের ইতিহাসে রয়েছে।
উপাচার্য বলেন, গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, এ দেশ ছাড়া আমার অন্য কোনো দেশ নেই। দেশের মানুষকে মুক্তির স্বাদ দেওয়ার জন্য তিনি আপোষহীনভাবে সংগ্রাম করে গিয়েছেন। আমি দেশনেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। সেই সঙ্গে মানুষের মুক্তির জন্য সর্বোপরি ২৪ এর জুলাই বিপ্লবে যে সমস্ত তরুণ ছাত্র জনতা রক্ত দিয়েছেন সবাইকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। জুলাই আন্দোলনেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সমাজ ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় দারুণ অবদান রেখেছে বাংলাদেশের মানুষকে ফ্যাসিবাদ মুক্ত করার জন্য।
মানুষকে স্বাধীনভাবে কথা বলা এবং গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। সেই কারণেও আমরা গর্ববোধ করি। আমাদের শিক্ষার্থীরা জুলাই আন্দোলনে সংগ্রামী ভূমিকা রেখেছিল। চট্টগ্রাম তথা দেশকে ফ্যাসিবাদ মুক্ত করার জন্য আমাদের শহিদ ফরহাদ হোসেন, শহিদ হৃদয় চন্দ্র তরুয়া ও ওয়াসিম আকরামসহ অগণিত যারা রক্ত দিয়েছেন সবার প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান বলেন, আজকে আমরা এমন একটি পরিবেশে কথা বলছি যেখানে কারও মনে কোনো ভয় নেই। কাউকে আক্রমণ করার, নাজেহাল করার কিংবা সম্মান নষ্ট করার ভয় নেই। একটি স্বাধীন ও ফ্যাসিবাদমুক্ত পরিবেশে আমরা কথা বলার সুযোগ পেয়েছি। সভাপতিরর বক্তব্যে চবি উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মো. কামাল উদ্দিন সবাইকে স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের পিছনে একটা মুক্তিযুদ্ধ রয়েছে।
আমরা মুক্তির জন্য লড়াই করেছি। কিন্তু মুক্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে এ রাষ্ট্র নিয়ে বার বার ষড়যন্ত্র হয়েছে। আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারিনি। আমরা পরিপূর্ণভাবে মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করতে পারিনি। সেখানেই আমাদের বিভাজন তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। এজন্য আমাদের শপথ নিতে হবে মুক্তিযুদ্ধে যার যতটুকু অবদান তা অবলীলায় স্বীকার করতে হবে। এটা আমরা স্বীকার করতে না পারলে আমাদের বার বার রক্ত দিতে হবে। তিনি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধসহ সব আন্দোলনে শহিদদের মাগফিরাত কামনা ও দোয়া করেন। এছাড়া আয়োজনে সহায়তাকারী সবাইকে তিনি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন চবি মেরিন সায়েন্সস এন্ড ফিশারিজ অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মো. শাহাদাত হোসেন, চবি অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান হলের প্রভোস্ট এজিএম নিয়াজ উদ্দিন, চবি ছাত্র-ছাত্রী পরামর্শ ও নির্দেশনা পরিচালক ড. মো. আনোয়ার হোসেন, চাকসুর ভিপি ইব্রাহীম হোসেন রনি, চবি কর্মচারী সমিতির সহ-সভাপতি আমির হোসেন ও চবি কর্মচারী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী হোছাইন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন চবি প্রক্টর প্রফেসর ড. হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী।
কর্মসূচির অংশ হিসেবে ২৬ মার্চ রাত ১২:০১ মিনিটে (২৫ মার্চ দিবাগত রাতে) বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীনতা স্মৃতিস্তম্ভ বেদীতে বিএনসিসি কর্তৃক ট্রাম্পেট ও বিউগল বাজিয়ে মহান স্বাধীনতা দিবসকে স্বাগত জানানো হয় এবং প্রত্যুষে বিশ্ববিদ্যালয় ভবনসমূহে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। ২৬ মার্চ ফজরের নামাজের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদসহ ক্যাম্পাসস্থ সব মসজিদে স্বাধীনতা যুদ্ধে বীর শহিদদের রুহের মাগফেরাত এবং দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয় এবং কেন্দ্রীয় মন্দির ও প্যাগোডাসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়।
অনুষ্ঠানসমূহে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিনরা, সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্যরা, শিক্ষক সমিতির নেতারা, রেজিস্ট্রার, কলেজ পরিদর্শক, হলগুলোর প্রভোস্টরা ও আবাসিক শিক্ষকরা, বিভাগীয় সভাপতি, ইনস্টিটিউট ও গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালকরা, প্রক্টর ও সহকারী প্রক্টররা, পরিচালক ছাত্র-ছাত্রী পরামর্শ ও নির্দেশনা, চাকসু কেন্দ্রের পরিচালক, শিক্ষকরা, অনুষ্ঠান আয়োজন কমিটির সদস্যরা ও বিভিন্ন উপ-কমিটির সদস্যরা, চবি অফিস প্রধানরা, অফিসার সমিতি, কর্মচারি সমিতি, কর্মচারি ইউনিয়নের নেতারা, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা, সাংবাদিকরা, শিক্ষার্থীরা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
