সবজি মাছ-মাংস-ডিমের দাম ঊর্ধ্বমুখী
* নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তি রয়েছে বলে অভিযোগ করছেন বিক্রেতারা * বাজারে প্রায় সব ধরনের সবজি বিক্রি হচ্ছে চড়া মূল্যে
প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রায় সারা বছরই কোনো না কোনো কারণে দেশের বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তি থাকে। এবার এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেলের অপ্রতুলতার প্রভাব। পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহনে জ্বালানি তেলের ব্যবহার হয়ে থাকে। আর এই ক্ষেত্রগুলোতে চাহিদা মতো তেল না পাওয়ার কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তি রয়েছে বলে অভিযোগ করছেন বিক্রেতারা। আজকের বাজারে প্রায় সব ধরনের সবজি বিক্রি হচ্ছে চড়া মূল্যে। একইসঙ্গে সব ধরনের মাংস, ডিম, মাছের দামও ঊর্ধ্বমুখী। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর একাধিক কাঁচাবাজার ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে।
জ্বালানি তেলের প্রভাবে সবজির দাম বাড়তি
সবজির উৎপাদন ও পরিবহনে জ্বালানি তেলের ব্যবহার রয়েছে। আর প্রয়োজন অনুযায়ী তেল না পাওয়ায় বাজারে সবজির দাম বাড়তি রয়েছে বলে জানান বিক্রেতারা। গতকাল বাজারে প্রতিকেজি দেশি টমেটো ৫০-৬০ টাকা, দেশি গাজর ৬০ টাকা, লম্বা বেগুন ১২০ টাকা, সাদা গোল বেগুন ৯০-১০০ টাকা, কালো গোল বেগুন ১২০ টাকা, শিম (প্রকারভেদে) ৯০-১০০ টাকা, দেশি শসা ১০০ টাকা, করলা ৮০-১০০ টাকা, কাঁকরোল ১২০ টাকা, ঢ্যাঁড়শ ৮০ টাকা, পটোল (হাইব্রিড) ১০০ টাকা, দেশি পটোল ১৬০ টাকা, চিচিঙ্গা ৮০-১০০ টাকা, ধুন্দল ১০০ টাকা, ঝিঙা ১২০ টাকা, বরবটি ৮০ টাকা, কচুর লতি ১০০ টাকা, মুলা ৬০ টাকা, কচুরমুখী ৮০ টাকা, কাঁচা মরিচ ১০০-১২০ টাকা, ধনেপাতা (মানভেদে) ১৬০ টাকা, শসা (হাইব্রিড) ৭০ টাকা, পেঁপে ৭০-৮০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। আর মানভেদে প্রতিটি লাউ ৮০-১০০ টাকা, চাল কুমড়া ৬০-৭০ টাকা, ফুলকপি ৮০ টাকা, বাঁধাকপি ৬০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি হালি কাঁচা কলা ৪০-৫০ টাকা। এছাড়া প্রতি হালি লেবু বিক্রি হচ্ছে ৪০-৫০ টাকা করে।
সবজি : এ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ওপরে উল্লেখিত ৩১টি সবজির মধ্যে ৮০ থেকে ১০০ টাকা বা এর ওপরে দাম রয়েছে ২১টি সবজির। বাকি সবজির দাম ৫০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে। সবজি বিক্রেতা মো. শাহ আলম বলেন, সবজির দাম আসলেই বেশি। দামের কারণে আমাদের বিক্রিও কমে গেছে। যারা চাষ করে তেলের অভাবে তারা সেচ দিতে পারে না ঠিকমতো। তাদের খরচ বেড়ে গেছে, তাই এখন দাম বেশি। উৎপাদন খরচ যদি বাড়ে তাহলে বেশি দামে বিক্রি হবেই। সবজির দাম বাড়ার একই কারণ উল্লেখ করে আরেক বিক্রেতা আব্দুল হক বলেন, এখন সবজির দাম বাড়ার কারণ হলো সেচের তেল চাহিদা মতো না পাওয়া। এমনিতেই অনেক গরম, সেচ দরকার বেশি। অথচ কৃষকরা সেটা দিতে পারছেন না। অনেকে ক্ষতিগ্রস্তও হচ্ছেন। আবার ঢাকায় যে আনবে সেখানেও তেলের জন্য অনেক সময় লেগে যায়। তাই গাড়ি ভাড়াও বেশি নিচ্ছে। এসব মিলিয়েই এখন সবজির দাম বাড়তি আছে। এদিকে বাজার করতে আসা এক ক্রেতা তাহমিদ আহমেদ বলেন, বাজারে সবজি থেকে শুরু করে সবকিছুর দামই অতিরিক্ত। আমাদের মতো সাধারণ মানুষ আসলে কোনটা বাদ দিয়ে কোনটা কিনবে, সেটা ভাবারও সুযোগ নাই। কারণ যেটা কিনতে যাবে সেটারই দাম বেশি।
স্বস্তি দিচ্ছে আলু-পেঁয়াজের দাম
যখন বাজারে সব কিছুর দাম লাগামহীনভাবে বেড়ে চলছে, সে সময়ে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে আলু-পেঁয়াজের মূল্য। বেশ অনেক দিন ধরেই আলু-পেঁয়াজের দাম সহনীয় পর্যায়েই আছে। আর এখনও দাম সবার নাগালের মধ্যেই আছে বলা চলে। আবার ঈদের সময়ের তুলনার কমেছে চায়না ও ভারতীয় আদা-রসুনের দাম। এসব পণ্যের দাম কমেছে কেজিতে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত। এর মধ্যে চায়না রসুনের দাম কমেছে ২০ টাকা, চায়না আদার দাম কমেছে ১০ টাকা এবং ভারতীয় আদার দাম কমেছে ৩০ টাকা। গতকাল আকার ও মানভেদে পুরান ক্রস জাতের পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৩০-৩৫ টাকায়। এর মধ্যে ছোট পেঁয়াজ ৩০ টাকা ও বড় সাইজের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৩৫ টাকা করে। আর দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪০-৪৫ টাকা কেজিতে। এছাড়া প্রতিকেজি লাল আলু ২০-২৫ টাকা, সাদা আলু ২০-২৫ টাকা, বগুড়ার আলু ২৫-৩০ টাকা, দেশি রসুন ৭০-৮০ টাকা, চায়না রসুন ১৬০-১৮০ টাকা, চায়না আদা ১৫০-১৬০ টাকা, ভারতীয় আদা মানভেদে ১২০-১৩০ দরে বিক্রি হয়েছে।
আগের বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে মুরগি : ঈদকে কেন্দ্র করে বেড়েছিল সব ধরনের মুরগির মাংসের দাম; যা এখনও প্রায় একই অবস্থায় রয়েছে। একইসঙ্গে গরু ও খাসির মাংস, ডিম এবং মাছের দামও রয়েছে আকাশচুম্বী। যদিও বিক্রেতারা বলছেন, মুরগির মাংসের দাম কিছুটা কমেছে। গতকাল বাজারে প্রতিকেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৮২০ টাকা ও খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২৫০ টাকা কেজি দরে। বয়লার মুরগি ১৭৮-১৮৮ টাকা, কক মুরগি ৩৮০-৩৯০ টাকা, লেয়ার মুরগি ৩২০-৩৩০ টাকা, দেশি মুরগি ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আর প্রতি ডজন মুরগির লাল ডিম ১২০ টাকা এবং সাদা ডিম ১১০ টাকা, হাঁসের ডিম ১৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আল-আমিন চিকেন হাউজের বিক্রেতা বলেন, মুরগির দাম কমছে, কিন্তু সেভাবে না আসলে। আবার আমাদের বিক্রি যে বেশি তাও তো না। আরও দাম কমাতে পারলে বিক্রি বাড়তো। আসলে বড় বড় কোম্পানিগুলো এগুলোর দাম নিয়ন্ত্রণ করে। তারা যেভাবে যা সিদ্ধান্ত নেয় আমরা সেভাবেই চলি। এখানে আমার মতো খুচরা বিক্রেতার চাওয়া দিয়ে কিছুই যায় আসে না।
এদিকে ডিমের দাম বেড়ে যাওয়া নিয়ে আনোয়ার ডিম আড়তের বিক্রেতা বলেন, ডিমের দাম বাড়ছে। মনে হচ্ছে সামনে আরও বাড়তে পারে। এছাড়া বাজারে আকার ও ওজন অনুযায়ী ইলিশ ১২০০-৩৪০০ টাকা, রুই মাছ ৩৫০-৫০০ টাকা, কাতল মাছ ৩৫০-৫০০ টাকা, কালিবাউশ ৩৫০-৮০০ টাকা, চিংড়ি মাছ ৮০০-১৪০০ টাকা, কাঁচকি মাছ ৪০০-৫০০ টাকা, কৈ মাছ ২৬০ টাকা, পাবদা মাছ ৪০০-৬০০ টাকা, শিং মাছ ৪০০-১২০০ টাকা, টেংরা মাছ ৬০০-১০০০ টাকা, বেলে মাছ ৮০০-১২০০ টাকা, মেনি মাছ ৬০০-৮০০ টাকা, বোয়াল মাছ ৬০০-১২০০ টাকা, রূপচাঁদা মাছ ১৪০০-১৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মাছের দাম আগের মতোই : মাছের দাম বাড়তি থাকা নিয়ে বিক্রেতারা জানান, এখন পানি বাড়ার সময়, তাই মাছ কম পাওয়া যাবে। তাই দাম বাড়তি থাকবে। আবার নদী-বিলের পানি যখন কমবে তখন মাছও বেশি পাওয়া যাবে, দামও কমে যাবে।
মুদি পণ্যে উচ্চমূল্য অপরিবর্তিত : অন্য সময়ের মতো এখন পর্যন্ত উচ্চমূল্যেই অপরিবর্তিত অবস্থায় আছে মুদি দোকানের প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম। আজকে প্রতিকেজি প্যাকেট পোলাও চাল ১৭০ টাকা, খোলা পোলাও চাল মানভেদে ১৩০-১৫৫ টাকা, ছোট মসুর ডাল ১৫০ টাকা, মোটা মসুর ডাল ৯০ টাকা, বড় মুগ ডাল ১৪০ টাকা, ছোট মুগ ডাল ১৭০ টাকা, খেসারি ডাল ১০০ টাকা, বুটের ডাল ১১০ টাকা, ছোলা ৮০-৯৫ টাকা, মাষকলাই ডাল ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৯৫ টাকা, খোলা সয়াবিন তেল ১৯০ টাকা, কৌটাজাত ঘি ১৪২০-১৫৫০ টাকা, খোলা ঘি ১৪০০ টাকা, প্যাকেটজাত চিনি ১০৫ টাকা, খোলা চিনি ১০০ টাকা, দুই কেজি প্যাকেট ময়দা ১৪৫ টাকা, আটা দুই কেজির প্যাকেট ১৩০ টাকা, খোলা সরিষার তেল প্রতি লিটার ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া এলাচ ৫২০০ টাকা, দারুচিনি ৫৬০ টাকা, লবঙ্গ ১৪৫০ টাকা, সাদা গোল মরিচ ১৩৫০ টাকা ও কালো গোল মরিচ ১২৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
