আগামী শিক্ষাবর্ষে ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপবে সরকার

প্রকাশ : ১২ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  বাসস

বছরের শুরুতে আংশিক বই বিতরণ এবং অবশিষ্ট বই পেতে মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত অপেক্ষার দীর্ঘদিনের চর্চা থেকে বেরিয়ে আসতে নতুন কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনই দেশের ৪ কোটির বেশি শিক্ষার্থীর হাতে একযোগে শতভাগ পরিমার্জিত ও নির্ভুল নতুন পাঠ্যবই তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ইতোমধ্যে প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ এবং নভেম্বরের মধ্যে মাঠপর্যায়ে সরবরাহের রোডম্যাপ চূড়ান্ত করেছে।

এনসিটিবি চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বাসসকে জানান, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রায় ৩১ কোটি পরিমার্জিত ও আকর্ষণীয় পাঠ্যবই ছাপানো হবে। মুদ্রণ ও বাঁধাই শেষে সব শ্রেণির বই উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রম আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যেই শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি চলছে। তিনি বলেন, ‘পাঠ্যবই মুদ্রণ, বাঁধাই ও মাঠপর্যায়ে সরবরাহের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ এবং দরপত্রের সময়সূচি চূড়ান্ত করা হয়েছে। আগামী ১ জানুয়ারি বছরের প্রথম দিনেই দেশের সব শিক্ষার্থীর হাতে শতভাগ মানসম্মত ও আকর্ষণীয় নতুন বই তুলে দেওয়া হবে।’

এনসিটিবির কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, ইবতেদায়ী, মাধ্যমিক, দাখিল, ভোকেশনাল ও কারিগরি স্তরের জন্য মোট ৩০ কোটি ৭১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ করা হবে। এ কর্মসূচিতে সরকারের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬৪৩ কোটি ২৪ লাখ ৭০ হাজার ৫১৪ টাকা। স্তরভিত্তিক বইয়ের সংখ্যা ও সম্ভাব্য ব্যয় : এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের প্রাথমিক স্তরে (প্রাক-প্রাথমিক ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীসহ) ১৪৩টি লটে ৮ কোটি ৫১ লাখ ৫৫ হাজার ১৭৮ কপি বই ছাপানো হবে। এরমধ্যে প্রাক-প্রাথমিকের জন্য ৩০টি লটে ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০ কপি, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির জন্য ১১০টি লটে ৭ কোটি ৯৪ লাখ ২৪ হাজার ৫৩৮ কপি এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য ১টি লটে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৭১৫ কপি বই থাকবে। এ খাতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫৯ কোটি ৮৫ লাখ ১ হাজার ৫১৫ টাকা।

অন্যদিকে, ইবতেদায়ী, মাধ্যমিক, দাখিল, ভোকেশনাল ও কারিগরি স্তরের প্রথম থেকে নবম শ্রেণির জন্য ৪৪১টি লটে ২২ কোটি ১০ লাখ ৪২ হাজার ৯২৩ কপি পাঠ্যবই মুদ্রণ করা হবে। এরমধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য ৫ কোটি ১০ লাখ ১৯ হাজার ৫৯ কপি, সপ্তম শ্রেণির জন্য ৪ কোটি ১৩ লাখ ২ হাজার ৭২৩ কপি, অষ্টম শ্রেণির জন্য ৩ কোটি ৯৮ লাখ ১০ হাজার ১১৯ কপি এবং নবম শ্রেণির জন্য ৫ কোটি ৫৬ লাখ ৩১ হাজার ৭২২ কপি বই ছাপানো হবে। এ খাতে সরকারের সম্ভাব্য ব্যয় হবে ১ হাজার ১৮৩ কোটি ৩৯ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। এ বিষয়ে মাহবুবুল হক পাটওয়ারী আরও বলেন, ‘নতুন বইয়ের মূল কাঠামোতে বড় কোনো পরিবর্তন না থাকলেও এবারের বইগুলো পরিমার্জন করে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও কালারফুল করা হবে।’ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বাসসকে বলেন, ‘আগামী শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীদের হাতে শতভাগ পরিমার্জিত নির্ভুল পাঠ্যবই বিতরণ করতে চায় সরকার। এজন্য নতুন শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বিতরণের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ যেন কোনো ধরনের জটিলতা ছাড়াই সম্পন্ন হয়, সেজন্য এনসিটিবিকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

নভেম্বরের মধ্যেই সরবরাহের রোডম্যাপ : এনসিটিবি জানিয়েছে, বিনামূল্যের পাঠ্যবই সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করতে পিপিআর-২০২৫ অনুযায়ী ২০৬ থেকে ২২০ দিনের সুনির্দিষ্ট দরপত্র সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। রোডম্যাপ অনুযায়ী, লট বিভাজন ও দরপত্র আহ্বান গত ৩ জুন শুরু হয়েছে।

পাঠ্যপুস্তক বোর্ড জানায়, পরবর্তী ধাপ হিসেবে- আগামী ২৮ জুন দরপত্র দাখিল ও উন্মুক্ত করা হবে, ২৮ জুলাইয়ের মধ্যে দরপত্র মূল্যায়ন, ২৭ আগস্টের মধ্যে দরপত্র অনুমোদন, ৩০ আগস্ট কার্যাদেশ জারি এবং ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি সম্পন্ন করা হবে। এরপর ২৯ নভেম্বরের মধ্যে মুদ্রণ ও বাঁধাইয়ের কাজ শেষ করে মাঠপর্যায়ে শতভাগ পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করা হবে।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মাঠপর্যায়ে বই সরবরাহ শেষ করা। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লাগলেও, আমরা শতভাগ নিশ্চিত করছি যে, ১ জানুয়ারি দেশের সকল শিক্ষার্থীর হাতে শতভাগ মানসম্মত বই পৌঁছে যাবে। অতীতে বছরের শুরুতে আংশিক বই দেওয়ার যে রেওয়াজ ছিল, এবার তা সম্পূর্ণ দূর করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’ এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) প্রফেসর মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু বাসসকে বলেন, শিক্ষার্থীদের হাতে সময়মতো মানসম্মত ও নির্ভুল পাঠ্যপুস্তক পৌঁছে দিতে সরকার বদ্ধপরিকর। বর্তমানে দরপত্র আহ্বান প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। দরপত্র কার্যক্রম শেষ করার পর মূল্যায়ন ও মুদ্রণ প্রক্রিয়া যথাসময়ে সম্পন্ন করার কাজ শুরু করবে এনসিটিবি।

ইতিহাসের বিচ্যুতি সংশোধন ও নতুন চার বই : এনসিটিবি জানায়, নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী, পাঠ্যবই পরিমার্জন এবং একটি যুগোপযোগী নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ইংরেজি ভার্সনসহ সব স্তরের মোট ৬০১টি পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জন করা হচ্ছে। মাধ্যমিক পর্যায়ের ৯৭টি এবং প্রাথমিক পর্যায়ের ৩৬টি বই পরিমার্জনে দেশের প্রায় ৩২০ জন শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ কাজ করছেন। আগামী জুলাইয়ের মধ্যেই পরিমার্জনের সব কাজ শেষ করে চূড়ান্ত মুদ্রণের প্রস্তুতি নেবে এনসিটিবি। এ বিষয়ে চেয়ারম্যান বলেন, অতীতে পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাসের যে বিচ্যুতি ঘটেছিল, এবার তা বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে সংশোধন করা হচ্ছে।

এনসিটিবি জানায়, শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ এবং পড়াশোনাকে আনন্দদায়ক করতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে তিনটি নতুন বৈচিত্র্যময় বই যুক্ত করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৪র্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ৭টি খেলা (ফুটবল, ক্রিকেট, দাবা, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, অ্যাথলেটিক্স ও কারাতে) অন্তর্ভুক্ত করে নতুন পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে।

সংস্থাটি আরও জানায়, যার প্রাথমিক কনটেন্ট গত ১৯-২৩ এপ্রিল প্রস্তুত করা হয়েছে। এছাড়া ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বিষয়ক ১টি এবং টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল শিক্ষা (টিভিইটি) বিষয়ক উদ্দীপনামূলক ১টি পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে।

এনসিটিবি চেয়ারম্যান জানান, শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে এবং এ খাত নিয়ে সমাজে প্রচলিত নানা অন্ধবিশ্বাস বা সামাজিক ট্যাবু ভাঙতে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বিশেষ মোটিভেশনাল বই যুক্ত করা হচ্ছে। বইটির নাম এখনও চূড়ান্ত না হলেও এর মূল বিশেষত্ব হবে- কারিগরি শিক্ষার সুবিধা, বৈশ্বিক ও দেশীয় প্রেক্ষাপট, এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং কারিগরি খাতে সফল হওয়া ব্যক্তিদের বাস্তব ‘সাকসেস স্টোরি’ বা সফলতার গল্প তুলে ধরা। তিনি বলেন, এছাড়া শিক্ষার্থীদের আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ শিরোনামে আরও একটি নতুন বই আগামী শিক্ষাবর্ষে দেওয়া হবে। এনসিটিবির চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘অতীতে আংশিক বই দিয়ে ‘বই উৎসব’ করে অবশিষ্ট বই পৌঁছাতে মার্চ-এপ্রিল হয়ে যেত। কিন্তু বর্তমান সরকারের সুদৃঢ় নেতৃত্ব ও দূরদর্শী পদক্ষেপের ফলে আগামী শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে একযোগে শতভাগ নতুন বই তুলে দেওয়া নিশ্চিত করা হবে।’