৪২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টি তলিয়ে গেছে বহু এলাকা

প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রামে গত দুই দিন ধরে মুষলধারে বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। এতে নগরীর বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা লক্ষ্য করা গেছে। সূত্র জানায়, ২৪ ঘণ্টায় ৩৩০ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে পতেঙ্গায়। এর সঙ্গে পাহাড়ি ঢল, কর্ণফুলীর জোয়ার মিলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। বিশেষ করে পতেঙ্গা, আগ্রাবাদ, কাতালগঞ্জ, চান্দগাঁও, বাকলিয়া, মোহরা ইত্যাদি এলাকার মানুষ। এসব এলাকায় ভারী বর্ষণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে, এতে করে যাতায়াতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় নগরবাসীকে। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম জানিয়েছেন, মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘন্টায় ৩৩০ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে। এর মধ্যে সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত ৩ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ৬০ মিলিমিটার।

তিনি জানান, সাগরে ৩ নম্বর সংকেত এবং জলাবদ্ধতা ও ভূমিধসের সতর্কতা রয়েছে। বেলা পৌনে ১২টায় কর্ণফুলী নদীতে জোয়ার শুরু হবে। নগরের আমবাগান আবহাওয়া কেন্দ্রের ইনচার্জ বিজন রায় জানান, গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় আমবাগানে ২৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। অতি ভারী বর্ষণের কারণে নিচু এলাকার সড়কে হাঁটুপানি থেকে করামর পানি জমে গেছে। অনেক স্কুলে পাঠদান ও অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। তবে চাকরিজীবী, বিমানবন্দরগামী গাড়ির বহর, পথচারী, জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষ ও খেটে খাওয়া মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। গণপরিবহন চলাচল কমে গেছে, সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যাও কম। সকালে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি দেখতে বের হন সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এসময় তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মনিটরিং এর কারণে দুই দিনের টানা বৃষ্টিতেও চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা হয়নি বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা স্থায়ীভাবে নিরসনের বিষয়টি ব্যক্তিগতভাবে মনিটরিং করছেন। তিনি চট্টগ্রামের সবগুলো সেবা সংস্থাকে নিয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করার জন্য একটি শক্তিশালী কমিটি করে দিয়েছেন। জলাবদ্ধতামুক্ত চট্টগ্রাম গড়ে তোলা আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতা ও প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দিন-রাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। খাল, নালা ও ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার রাখা, পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা দ্রুত অপসারণ এবং সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের কারণেই টানা দুই দিনের বৃষ্টির পরও নগরীতে কোনো উল্লেখযোগ্য জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়নি। গত সোমবার সকালে মেয়র নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের বাস্তব চিত্র, খাল-নালা ও ড্রেনের পানি প্রবাহ, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানসমূহের পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনের অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। বিভিন্ন স্থানে উপস্থিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে তিনি চলমান কার্যক্রমের খোঁজখবর নেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। মেয়র চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আমিনকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় অভিযান ও মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা তদারকির নির্দেশ দেন। মেয়র বলেন, বর্ষা মৌসুমে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের সব বিভাগ প্রস্তুত রয়েছে। কোথাও পানি জমার খবর পাওয়া মাত্র সংশ্লিষ্ট টিম দ্রুত সেখানে গিয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছে। নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বজায় রাখতে আমরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করছি। মেয়র আরও বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নালা-নর্দমা, খাল কিংবা ড্রেনে ময়লা-আবর্জনা ও প্লাস্টিকজাত বর্জ্য ফেলা থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই পরিচ্ছন্ন নগর গড়ে তুলতে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে বলেন, বর্ষা মৌসুম শেষ না হওয়া পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি অব্যাহত রাখতে হবে। যেসব এলাকায় অতীতে জলাবদ্ধতার প্রবণতা ছিল, সেসব স্থানে বিশেষ নজরদারি চালানোর পাশাপাশি খাল, নালা ও ড্রেনের পানি প্রবাহ সচল রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।

রাঙ্গামাটি : অতিবর্ষণে সড়কে গাছ পড়ে এবং পাহাড় ধসে কাপ্তাই-চট্টগ্রাম সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। কাপ্তাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মাহমুদুল হাসান রুবেল বলেন, গতকাল সকালে উপজেলার ৫নং ওয়াগ্গা ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের বালুচরা এলাকায় পাহাড় ধসে একটি বড় গাছ সড়কের উপর পড়ে রাস্তাটি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এতে গতকাল সকাল সাড়ে ১১টা থেকে সড়কে সব ধরনের যানবাহন ও সাধারণ মানুষের চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তিনি জানান, ঘটনার খবর পেয়ে কাপ্তাই ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার দেলোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে একটি দল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় গাছ অপসারণ ও সড়ক পরিষ্কারের কার্যক্রম শুরু করেছে। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কাপ্তাই ফায়ার সার্ভিস, বন বিভাগ, পিডিবি এবং স্থানীয়রা মিলে সড়ক হতে গাছ এবং মাটি অপসারণ করে যান চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন। তবে এ ঘটনায় কোনো হতাহতের সংবাদ পাওয়া যায়নি। খবর পেয়ে কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রায়হানুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এসময় কাপ্তাই থানার ওসি শেখ মাহমুদুল হাসান রুবেল, কাপ্তাই সহকারী তথ্য অফিসার দেলোয়ার হোসেন, কাপ্তাই প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেনসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন। কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রায়হানুল ইসলাম বলেন, টানা বর্ষণে কাপ্তাই উপজেলার বালুচরা এলাকায় পাহাড় ধসে একটি বড় গাছ সড়কের উপর পড়ে রাস্তাটি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে রাস্তা পরিষ্কারের কাজ চলমান রয়েছে। তিনি জানান, টানা বর্ষণে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে পাহাড় ধসে কিছু ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কাপ্তাই উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ হতে ইতোমধ্যে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে আসার জন্য মাইকিং করা হয়েছে। এ উপলক্ষে উপজেলার ৫ টি ইউনিয়নে ১৮ টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। যারা আশ্রয় কেন্দ্রে আসছেন তাদের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাবারসহ সব ধরনের সুবিধা প্রদান করা হয়েছে বলে জানান। বোয়ালখালী : অবিরাম ভারী বর্ষণে প্লাবিত হয়েছে বোয়ালখালী উপজেলার নিম্নাঞ্চল। এতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে অবিরাম বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নিচতলা হাঁটু পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, ল্যাব এবং প্রশাসনিক কক্ষসমূহে পানি ঢুকে পড়েছে। এতে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও রোগীর অভিভাবকেরা ভোগান্তিতে পড়েন। উপজেলার পশ্চিম গোমদণ্ডী, পশ্চিম শাকপুরা, ঘোষখীল, কধুরখীলের বেশ কয়েকটি এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দা। গত সোমবার রাত থেকে লাগাতার বৃষ্টি শুরু হওয়ার পরপরই বিদ্যুৎ চলে যায়। এরপর থেকেই বোয়ালখালী উপজেলা বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় রয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় অফিস ও দোকানপাটের কার্যক্রমেও নেমে এসেছে স্থবিরতা।