চট্টগ্রামে চার উপজেলায় পানিবন্দি ৮ লাখ মানুষ

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  চট্টগ্রাম ব্যুরো

টানা এক সপ্তাহের অতি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জেলার সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী ও চন্দনাইশ উপজেলার বিস্তৃত জনপদ এখনো পানির নিচে তলিয়ে আছে। যদিও গত শনিবারে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমেছিল, তবে গতকাল রাববার সকাল থেকে পুনরায় ভারী বর্ষণ শুরু হওয়ায় দুর্গত এলাকার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও দুশ্চিন্তা চরমে পৌঁছেছে।

প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এই চারটি উপজেলাতেই অন্তত আট লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সাতকানিয়া উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার প্রায় পুরো এলাকা গত সাত দিন ধরে বন্যার কবলে। সাঙ্গু নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ১৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, যার ফলে কেরানীহাট-বান্দরবান মহাসড়কের অনেক অংশ এখনো পানির নিচে এবং যান চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় দুর্গত মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় গৃহিণী ফাতেমা বেগম (৪২) নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘আমাদের ঘরের ভেতর হাঁটুসমান পানি। এক সপ্তাহ ধরে চুলায় আগুন জ্বলছে না। মুড়ি-চিড়া খেয়ে দিন পার করছি। বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট, বৃষ্টির পানি জমানো ছাড়া কোনো উপায় নেই। আমার বাচ্চাটা কয়েকদিন ধরে জ্বরে ভুগছে, কিন্তু পানি আর কাদার জন্য ডাক্তারের কাছেও নিতে পারছি না।’

এ বিষয়ে সাতকানিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান জানান, আমরা পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে আমরা পানিবন্দি মানুষের তালিকা তৈরির কাজ করছি। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় দুর্গম এলাকায় সহায়তা পৌঁছাতে সময় লাগছে, তবে আমরা নৌকার মাধ্যমে শুকনা খাবার ও বিশুদ্ধ পানি পাঠানোর ব্যবস্থা করেছি। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি মানুষ যাতে না খেয়ে থাকে। এছাড়া লোহাগাড়া সদর, আধুনগর, বড়হাতিয়া ও আমিরাবাদ ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা এখনো প্লাবিত। অনেক মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে আত্মীয়-স্বজনের উঁচু বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। রাস্তাঘাট তলিয়ে থাকায় জরুরি প্রয়োজনেও ঘর থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় নেই।

বড়হাতিয়া এলাকার ব্যবসায়ী মো. আলমগীর বলেন, পানি নামার লক্ষণ নেই। গত সপ্তাহে বৃষ্টি কিছুটা কমলে ভেবেছিলাম পরিস্থিতি উন্নতি হবে, কিন্তু আজকের বৃষ্টি সব আশা শেষ করে দিয়েছে। সরকারি যে ত্রাণ আমরা পেয়েছি, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। হাজার হাজার মানুষের জন্য এই সহায়তা পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে শিশুদের দুধ ও বয়স্কদের ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় দুর্যোগের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি বাঁশখালীতে। বাঁশখালীর চাম্বল, ছনুয়া, সরল, পুঁইছড়ি, বাহারছড়া, বৈলছড়ি, গণ্ডামারা ও শেখেরখীল ইউনিয়নগুলো বর্তমানে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে। জোয়ারের পানি ও বৃষ্টির পানির সংমিশ্রণে উপকূলীয় অনেক এলাকার ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে, ফলে হাজার হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে ভিড় করছেন।

জানতে চাইলে বাঁশখালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রহুল আমিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘ভারী বৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চলে নতুন করে ১ থেকে ২ ইঞ্চি পানি বেড়েছে। আশা করছি শীঘ্রই পানি কমে যাবে। আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করছি এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত ৬৫ মেট্রিক টন ত্রাণ বিতরণ করেছি।’

আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা রহিমা খাতুন বলেন, এখানে জায়গা পাওয়া দায়, আর খাবার ও সুপেয় পানির সংকট তো আছেই। বাচ্চাদের রোগবালাই শুরু হয়েছে, কিন্তু কোনো চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর দেখা মিলছে না। ঘরবাড়ি সব ডুবে যাওয়ায় আমাদের এখন আশ্রয়ই একমাত্র ভরসা।

বন্যাকবলিত আরেক উপজেলা চন্দনাইশে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির আভাস পাওয়া গেলেও, আজ সকালে পুনরায় ভারী বর্ষণ শুরু হওয়ায় নতুন করে পানি বাড়ছে। শঙ্খ নদ তীরবর্তী এলাকাগুলোতে কৃষকের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। দোহাজারী পৌরসভার সবজি চাষি রহমত উল্লাহ (৫৫) আক্ষেপ করে বলেন, ‘সারা বছরের সম্বল সবজিখেত চোখের সামনে নষ্ট হয়ে গেল। কোনোভাবেই পানি নামছে না। এখন কীভাবে দেনা শোধ করব, আর কীভাবে পরিবার নিয়ে বাঁচব বুঝতে পারছি না।’ চন্দনাইশের ইউএনও আবদুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, চন্দনাইশে প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি। আমরা এ পর্যন্ত ১৪৫ মেট্রিক টন চাল, ১১০০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ২০০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করেছি। স্থানীয় স্কুলগুলোকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমরা সবসময় মানুষের পাশে আছি এবং পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইদ্রিছ বলেন, রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় গাড়ি চলছে না। বাধ্য হয়ে ছোট নৌকা আর জাল নিয়ে রাস্তায় নেমেছি। মাছ ধরার চেয়ে জরুরি প্রয়োজনে মানুষকে পারাপার করতেই আমার দিন পার হয়ে যাচ্ছে। জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মহানগরসহ উপজেলাগুলোতে প্রায় এক লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম জানান, এবারের বন্যায় ৪০ কোটি টাকার মৎস্যসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আলমগীর জানান, প্রায় ২৮ কোটি টাকার প্রাণিসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রামের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী প্রশান্ত তালুকদার বলেন, আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। নদীগুলোর পানি ধীরগতিতে নামছে, তাই পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে হবে।

জানতে চাইলে আবহাওয়া অফিস চট্টগ্রামের পূর্বাভাস কর্মকর্তা মো. ইসমাঈল ভূঁইয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৪২.৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামীকাল দুপুর পর্যন্ত এই বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। এরপর বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমে স্বাভাবিক বর্ষণে রূপ নিতে পারে।’

উল্লেখ্য, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে উদ্ধারকাজে সহায়তা করছে সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুর্যোগ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত ত্রাণ ও নগদ অর্থ প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। দুর্গত মানুষের সহায়তায় প্রতিটি উপজেলায় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করা হয়েছে যাতে জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।