এক মাসে ডেঙ্গুতে আটজনের মৃত্যু ৯ মাসে হাসপাতালে ভর্তি ৯০১
প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
রাজশাহী ব্যুরো

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে। চলতি বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ৯০১ জন। এর মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৮০২ জন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৮৬ জন। এ সময় ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ১৩ জন। এর মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই আটজনের মৃত্যু হয়েছে।
হাসপাতালের তথ্যানুযায়ী, ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। ৯০১ জন রোগীর মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক ৮৩৩ জন, যা মোট রোগীর প্রায় ৯২ দশমিক ৫ শতাংশ। বিপরীতে শিশু রোগীর সংখ্যা ৬৮ জন, অর্থাৎ প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা নারীর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ৮৩৩ জন প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর মধ্যে পুরুষ ৬১০ জন এবং নারী ২২৩ জন। অর্থাৎ প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের প্রায় ৭৩ শতাংশ পুরুষ এবং ২৭ শতাংশ নারী। তবে শুধু রামেক হাসপাতালে ভর্তি রোগীর এই পরিসংখ্যান দিয়ে পুরুষদের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার প্রকৃত ঝুঁকি নারীদের তুলনায় বেশি, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যায় না। বাইরে চলাফেরা, কর্মস্থলে অবস্থান, মশার সংস্পর্শ, চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে আসার প্রবণতাসহ বিভিন্ন সামাজিক ও আচরণগত কারণ এ ব্যবধানের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। বিষয়টি নিশ্চিত করতে জনসংখ্যাভিত্তিক তথ্য ও আলাদা গবেষণা প্রয়োজন।
রামেক হাসপাতালের সর্বশেষ এক সপ্তাহের তথ্যেও ডেঙ্গুর বাড়তি চাপের চিত্র পাওয়া গেছে। ১৯ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাত দিনে হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ১৯৭ জন। একই সময়ে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১৯৩ জন। এ সময় ডেঙ্গুতে মারা গেছেন পাঁচজন। এক সপ্তাহে মারা যাওয়া পাঁচজন হলেন, ১৯ সেপ্টেম্বর তানোরের মো. আনোয়ার মন্ডল (৫২), ২০ সেপ্টেম্বর বাঘমারার ১৬ বছর বয়সি সাথী রাণী, ২১ সেপ্টেম্বর একজন, ২২ সেপ্টেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষক আব্দুল করিম (৪৫) এবং ২৫ সেপ্টেম্বর রাজশাহীর বোয়ালিয়ার চাকরিজীবী মোসা. নাসরিন (৩০) মারা যান। তবে ২১ সেপ্টেম্বর মারা যাওয়া ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ হাসপাতালের তথ্যে উল্লেখ করা হয়নি।
আনোয়ার মন্ডল, সাথী রাণী ও নাসরিনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম উল্লেখ করা হয়েছে। নাসরিন ২০ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর ২৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মারা যান। প্রথমে তিনি হাসপাতালের ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেপ্টেম্বরের দৈনিক পরিসংখ্যানেও ডেঙ্গু রোগীর চাপের ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। ২২ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল ১০৭ জন, যা ওই সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ। পরবর্তী তিন দিনে রোগীর সংখ্যা কমে ২৫ সেপ্টেম্বর ৮৬ জনে দাঁড়ায়।
তবে রোগী কমে যাওয়ার অর্থ পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে, এমনটি বলা যাচ্ছে না। কারণ একই সময়ে নতুন রোগী ভর্তি, রোগী ছাড়পত্র এবং মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে ২৪ সেপ্টেম্বর একদিনেই ৪২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। পরদিন ২৫ সেপ্টেম্বর নতুন করে ভর্তি হন ২৫ জন। রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম আহমেদ বলেন, নাসরিনের মৃত্যুর কারণ ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম। গত শুক্রবার নতুন করে ২৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। বিপরীতে ৪০ জন সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে ৮৬ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
রামেক হাসপাতালের আগস্ট মাসের তথ্য বিশ্লেষণেও ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ার চিত্র পাওয়া গেছে। মাসের শুরুতে হাসপাতালে ডেঙ্গুতে চিকিৎসাধীন রোগী ছিলেন আটজন। ৩০ আগস্ট এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ জনে। অর্থাৎ এক মাসে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ৪২ জন বা ৫২৫ শতাংশ বেড়েছে। ১ থেকে ৩০ আগস্টের মধ্যে, ২৫ আগস্টের তথ্য বাদ দিয়ে মোট ২৯ দিনের হিসাবে নতুন করে ২২১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ১৭৬ জন চিকিৎসা নিয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। আগস্ট মাসে ডেঙ্গুতে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, শুধু আগস্ট মাসে বিভাগের আট জেলায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৬৪৩ জন, সিরাজগঞ্জে ৩৬৩ জন, বগুড়ায় ১৬৫ জন, নাটোরে ৫৬ জন, পাবনায় ৪২ জন, নওগাঁয় ৪১ জন, রাজশাহীতে ২৫ জন এবং জয়পুরহাটে চারজন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সেবা নিয়েছেন। এ ছাড়া বিভাগের তিনটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মধ্যে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগস্ট মাসে ২২৮ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৮৮ জন এবং সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২১৯ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।
চলতি বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রামেক হাসপাতালে মোট ৯০১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৮০২ জন চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন, যা মোট ভর্তি রোগীর প্রায় ৮৯ শতাংশ। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৮৬ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এই সময়ে ডেঙ্গুতে মোট ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। মোট ভর্তি রোগীর তুলনায় মৃত্যুর হার প্রায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ। মৃতদের বেশির ভাগের ক্ষেত্রেই ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলেও নতুন রোগীর ভর্তি অব্যাহত রয়েছে। ফলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে শুধু মোট আক্রান্ত বা ভর্তি রোগীর সংখ্যা নয়, প্রতিদিন নতুন ভর্তি, ছাড়পত্র, চিকিৎসাধীন রোগী এবং মৃত্যুর হার-সবগুলো সূচক একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এদিকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে রাজশাহী সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
