
পৃথিবীতে মানুষের জন্য আবশ্যকীয় বিষয়গুলোর অন্যতম একটি পথ বা রাস্তা। পার্থিব প্রয়োজনে মানুষকে বাড়িতে প্রবেশ ও বের হওয়া, বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত ইত্যাদি কারণে রাস্তা ব্যবহার করতে হয়। মানুষের চলাচলের এই রাস্তাকে নিরাপদ, নির্বিঘœ ও নিষ্কণ্টক করাই ইসলামের নির্দেশ। কিন্তু কোনো কোনাে মানুষ এই পথ বা রাস্তায় কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে অন্যকে বিপদে ফেলে, যা ইসলামে বৈধ নয়। রাস্তায় চলাচল বা অবস্থান করার ক্ষেত্রে বিশেষ শিষ্টাচার রয়েছে। হজরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা রাস্তার ওপর বসা ছেড়ে দাও। লোকজন বলল, এ ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নেই। কেননা এটাই আমাদের ওঠা-বসার জায়গা এবং আমরা এখানেই কথাবার্তা বলে থাকি। নবী (সা.) বলেন, যদি তোমাদের সেখানে বসতেই হয়, তবে রাস্তার হক আদায় করবে। তারা বলল, রাস্তার হক কী? তিনি বললেন, দৃষ্টি অবনত রাখা, কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা, সালামের জবাব দেওয়া, সৎকাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা।’ (বোখারি : ২৪৬৫)।
যেসব শর্তে রাস্তায় বসা, সভা করা বা সমবেত হওয়ার অনুমতি প্রদান করা হয়েছে তার মধ্যে এটি অন্যতম যে, পথচারীকে চলাচলের সময় কোনোরূপ কষ্ট দেওয়া যাবে না। পথচারী স্বাচ্ছন্দ্যে, বাধাহীনভাবে পথ চলবে। রাস্তা কোনোভাবেই বন্ধ করে দেওয়া কিংবা সংকুচিত করার সুযোগ নেই বরং পথচারীর কষ্ট হয়, এমন জিনিস রাস্তা থেকে সরিয়ে ফেলাই ঈমানের অংশ। রাসুল (সা.) বলেন, ‘ঈমানের সত্তরের বেশি শাখা-প্রশাখা রয়েছে। তন্মধ্যে সর্বোত্তম শাখা হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা, আর সর্বনিম্ন শাখা হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা।’ (ইবন মাজাহ : ৫৭)। সুতরাং রাস্তায় দাঁড়ানো বা বসা ব্যক্তির খেয়াল রাখা উচিত, যেন তার দ্বারা কোনো চলাচলকারীর সামান্য কষ্ট না হয়। এটাই ইসলামের শিক্ষা ও নির্দেশ।
কষ্ট দেওয়ার বিভিন্ন রূপ : রাস্তায় এমনভাবে দাঁড়ানো বা বসা কিংবা এমন যে কোনো কাজ করা, যা যাতায়াতকারীর কষ্ট হয়, পথচলায় বিঘœ সৃষ্টি করে। যেমনÑ
রাস্তায় ময়লা-আবর্জনা ফেলে কষ্ট দেওয়া, রাস্তায় গাছের গুড়ি ফেলা, টায়ার জ্বালানো, অহেতুক রাস্তা বন্ধ করা, রাস্তা কেটে রাখা, ফলের খোসা-ময়লা-আবর্জনা ও উচ্ছিষ্ট খাবার ফেলা, পানের পিক ফেলা, দুর্গন্ধ ছড়ায় এমন কোনো জিনিস ফেলে রাখা, দোকান বা হোটেল পরিষ্কার করে ময়লা রাস্তায় ফেলা, গ্যারেজ পরিষ্কারের ময়লা পানি রাস্তায় ঢেলে দেওয়া, রিজার্ভ পানির ট্যাঙ্কি পরিস্কার করে ময়লা পানি রাস্তায় ফেলা, ছাদ থেকে পানি নিষ্কাষণের পাইপ রাস্তায় দেওয়া, ইট-বালু, সুরকি-পাথর, রড ইত্যাদি বাড়ি নির্মাণসামগ্রী রাস্তায় স্তূপ করে রাখা; এসব কষ্ট দেওয়ার নানা উপায়।
ফুটপাত দখল করে মানুষকে কষ্ট দেওয়া : ফুটপাত দখল করে ক্রয়-বিক্রয় করা, দোকানঘর তৈরি করা বা দোকানের মালপত্র রাখা, যার কারণে চলাচলের পথ সংকীর্ণ হয়, এটাও কষ্ট দেওয়ার অন্তর্ভুক্ত। দোকানের সীমানা বাড়াতে বাড়াতে রাস্তার মধ্যে চলে যাওয়া, অথবা বাড়ির প্রাচীর বাড়িয়ে দেওয়া; যে কারণে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায় বা সংকীর্ণ হয়ে যায়। এটাও কষ্টের কারণ। সাধারণত বাজার কিংবা মার্কেটগুলোতে দেখা যায়, দোকানের অর্ধেক ভেতরে আর অর্ধেক বাইরে-ফুটপাতে। মনে হয় যেন ফুটপাত দোকানদারের কেনা! অথচ সবাই জানে এটা দোকানের অংশ নয়; ক্রেতাদের জন্য অথবা চলাচলকারীদের জন্য বানানো হয়েছে, যাতে যাতায়াত সহজ হয়। কিন্তু এখন ফুটপাতই দোকান হয়ে গেছে। অনেকে তো ফুটপাতে তাঁবু টানিয়ে, ঘর বানিয়ে, শাটার লাগিয়ে রীতিমতো মার্কেট বানিয়ে ফেলে। কেউ আবার মালসামানা এমনভাবে রাখে, যার দ্বারা রাস্তা আর দেখা যায় না। চলাচল করা যায় না।
অনেকে আবার ফুটপাত দখল করে দোকান খুলে বসে। এতেও রাস্তা সংকীর্ণ হয়ে যায়। অথচ এটা সরকারিভাবে নিষিদ্ধ। এ কারণে বাজারে আসা-যাওয়া কিংবা চলাচলের সময় সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। রাস্তায় যানজট দেখা দেয়, নানাবিধ দুর্ঘটনা ঘটে। অথচ মানুষ যদি রাস্তার হক আদায় করে চলে, তাহলে রাস্তাগুলো প্রশস্ত থাকে, চলাচল নির্বিঘœ হয়।
গাড়ি পার্কিং করে মানুষকে কষ্ট দেওয়া : রাস্তায় কষ্টদায়ক কাজের অন্যতম হলোÑ যত্রতত্র সাইকেল, মোটরসাইকেল, গাড়ি পার্ক করে রাখা। নিষিদ্ধ জায়গায় গাড়ি পার্ক করা অন্যায়। চাই সেই জায়গা খালি থাকুক কিংবা অব্যবহৃত। নিষেধ সর্বাবস্থায় মানতে হবে। আর যেখানে গাড়ি পার্কিংয়ের অনুমতি আছে, সেখানেও এমনভাবে গাড়ি পার্ক করা, যেন অন্য গাড়িওয়ালার কষ্ট না হয়। অনেক সময় দেখা যায়, কারও দোকানের সামনে এমনভাবে গাড়ি রাখছে, যে কারণে দোকান বন্ধ হয়ে যায়, ক্রেতা-গ্রাহক আসতে পারে না কিংবা আসতে কষ্ট হয়। এটাও অনুচিত কাজ। আবার দেখা যায়, যাদের দোকান নেই তারা ফুটপাত দখল করে ভ্যান দাঁড় করিয়ে দোকান খুলে বসে। এতে রাস্তা সংকীর্ণ হয়ে যায়। পথচারীকে পথচলায় সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। অথচ এটি সরকারিভাবে নিষিদ্ধ। আইন থাকতেও আমাদের এই অবস্থা।
বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে মানুষকে কষ্ট দেওয়া : রাস্তায় বেশি জোরে গাড়ি চালানো, রংসাইডে চলাচল কিংবা গাড়ি চালানোর সময় অকারণে ভেঁপু বাজিয়ে, বিকট আওয়াজে হর্ন বাজিয়ে শব্দদূষণ করা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে রাস্তায় ধুলো ও কাদা-পানি ছিটিয়ে মানুষকে কষ্ট দেওয়া। এগুলো মানুষের কষ্টের কারণ, মানুষ এগুলো পছন্দ করে না। এক কথায়, গাড়ি এমনভাবে চালাতে হবে, যেন কোনো মানুষ ও প্রাণী কষ্ট না পায়। কারও কোনো পেরেশানি না হয়।
ঈমানের দাবি
দেখুন, ঈমানের সর্বনিম্ন শাখা হলোÑ রাস্তায় কষ্টদায়ক কোনো জিনিস দেখলে তা সরিয়ে দেওয়া। হাদিসে বলা হয়েছে, এটা ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর। হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ঈমানের সত্তরের অধিক শাখা রয়েছে, সর্বোত্তম শাখা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা, সর্বনিম্ন শাখা রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া, আর লজ্জা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ শাখা। (মুসলিম : ৩৫)।
অন্য আরেক রেওয়ায়েতে আছে, হজরত রাসুল (সা.) সাহাবি হজরত আবু যর গিফারি (রা.)-কে নসিহত করেন, তার মাঝে একটি উপদেশ ছিলÑ রাস্তা থেকে পাথর, কাঁটা, হাড্ডি সরানোও সদকা। (জামে তিরমিজি : ১৯৫৬)। উল্লেখিত হাদিসের আলোকে বলা যায়, মোমিনের কাছে ঈমানের ন্যূনতম দাবি হলো, সে যখন রাস্তায় চলবে কষ্টদায়ক কিছু দেখলে সরিয়ে দেবে। হতে পারে এই উসিলায় সে কিয়ামতের দিন নাজাত পেয়ে যাবে।
রাস্তা থেকে কাঁটাদার গাছ কাটার পুরস্কার বিষয়ে একাধিক হাদিসে এসেছে, নবী করিম (সা.) বলেন, আমি এক ব্যক্তিকে জান্নাতের গালিচায় গড়াগড়ি খেতে দেখলাম (অর্থাৎ শান্তি ও আরামের সঙ্গে সুখময় জীবন কাটাচ্ছে)। মানুষের চলাচলের পথে একটি গাছ ছিল, যার কারণে চলাচলে কষ্ট হচ্ছিল। এ ব্যক্তি তা কেটে দিয়েছিল। (ফলে আল্লাহ খুশি হয়ে তাকে জান্নাতে দাখেল করেন)। (মুসলিম : ১৯১৪)।
বড় কোনো আমলের কারণে নয়, বরং মানুষের যাতায়াতের রাস্তায় একটি কাঁটাদার গাছ ছিল, এ ব্যক্তি সেটি কেটে দিয়েছিল। যাতে পথিকের পথচলা নির্বিঘœ হয়। এই আমলের বরকতেই আল্লাহ তাকে জান্নাতে পৌঁছে দিয়েছেন। রাস্তায় চলাচলের সময় অনেক কষ্টদায়ক বস্তু আমাদের নজরে আসে। কিন্তু আমরা মনে করি এটা তো সরকারের কাজ, তারা করবে। ঠিক আছে তাদের করা উচিত, কিন্তু আমরা মুসলমান, সুতরাং এটা আমাদেরও দায়িত্ব, কারণ এটা আপনার-আমার ঈমানের দাবি।
শুধু তাই নয়, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক কিছু সরানো পাপমুক্তিরও একটা মাধ্যম। বিশ্বনবী (সা.) বলেন, ‘এক ব্যক্তি রাস্তায় চলতে চলতে একটি কাঁটার ডাল পেল, সে সেটিকে সরিয়ে দিল। আল্লাহ তার এই কাজের কদর করলেন এবং তাকে পাপমুক্ত করে দিলেন।’ (বোখারি : ৬৫২; মুসলিম : ৫০৪৯)।
রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করা ঈমানের শাখা, পাপমোচনকারী, সৎকর্ম এবং সদকাও। একজন মুসলিমের জন্য সমাজের কল্যাণমূলক গুরুত্বপূর্ণ যতগুলো সৎকর্ম আছে তার মধ্যে রাস্তার আদবও একটা। নবী (সা.) বলেছেন, ‘একদা আমার কাছে উম্মতের ভালো ও মন্দ আমল পেশ করা হলো। তার ভালো আমলগুলোর অন্তর্ভুক্ত একটি আমল দেখলাম, পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা...।’ (মুসলিম/১২৬১)।
একদা সাহাবি আবু বার্যাহ (রা.) বললেন, ‘হে আল্লাহর নবী! আমাকে এমন একটি আমল বলে দিন, যার দ্বারা আমি উপকৃত হতে পারব। তিনি বললেন, মুসলিমদের রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করো।’ (মুসলিম : ৬৮৩৯)। ভেবে দেখুন, একজন সাহাবিকে রাসুলুল্লাহ (সা) উপকৃত হওয়ার জন্য রাস্তার কষ্টদায়ক বস্তু দূর করার নির্দেশ দিলেন। অর্থাৎ এই কাজটি কত উঁচু লেবেলের ভালো কাজ!
বুরাইদাহ (রা.) কর্তৃক বর্ণিত আরেকটি চমৎকার হাদিস শুনুন। বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (সা.) বলেন, ‘মানবদেহে ৩৬০টি গ্রন্থি আছে। প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর ওই প্রত্যেক গ্রন্থির তরফ থেকে দেয় সদকা রয়েছে।’ সবাই বলল, ‘এত সদকা দিতে আর কে সক্ষম হবে হে আল্লাহর রাসুল?’ তিনি বললেন, ‘মসজিদ থেকে কফ (ইত্যাদি নোংরা) দূর করা, পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু (কাঁটা-পাথর প্রভৃতি) দূর করা একটা সদকা। যদি তাতে সক্ষম না হও, তবে দুই রাকাত চাশতের নামাজ তোমার সে প্রয়োজন পূর্ণ করবে।’ (আহমাদ, আবু দাউদ : ৫২৪৫; ইবনে হিব্বান; তারগীব/৬৬১)।
রাস্তার হক নষ্ট করার ক্ষতি : রাস্তার হক নষ্ট কোনো সাধারণ বিষয় নয়। ইসলামে এটা খুব কঠোর একটা ব্যাপার। মু’আয বিন জাবাল (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (সা.) বলেন, তোমরা তিনটি অভিশাপ আনয়নকারী কর্ম থেকে বাঁচো। আর তা হলো, ঘাটে, মাঝ রাস্তায় এবং ছায়ায় পায়খানা করা।’ (আবু দাউদ : ২৬; ইবনে মাজাহ : ৩২৮; তারগীব : ১৪১)। নিশ্চয় এই কাজগুলো পথযাত্রীদের জন্য কষ্টদায়ক। রাস্তায় পায়খানা করলে বা নোংরা ফেললে পায়ে হাঁটা যাত্রীদের অনেক অসুবিধা। আর গাছের ছায়ায় যারা আরাম করে তাদের জন্যও অসুবিধা। আল্লাহর রাসুল (সা.) এসব ঘৃণ্য কাজকে নিষিদ্ধ করেছেন, যাতে পথিক ভালোভাবে সফর করতে পারে আর আরাম করতে পারে। কত সুন্দর সামাজিক সিস্টেম এটা। কত সুন্দর সুন্নাহ! আল্লাহপাক আমাদের আমল করার তৌফিক দিন। আমিন!
লেখক : সহসম্পাদক, আলোকিত বাংলাদেশ পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়