ঢাকা বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১৮ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ইসলামে হাদিয়া বিনিময়

ইসলামে হাদিয়া বিনিময়

হাদিয়া আরবি শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে উপঢৌকন, উপহার ইত্যাদি। ভালোবাসা ও আন্তরিকতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও অন্যদের যে উপহার আদান প্রদান করা হয় তাকে হাদিয়া বলে। উপহার বিনিময় সামাজিক জীবনের একটি সাধারণ অনুষঙ্গ। উপহার প্রদানের মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায়। হাদিয়া বিনিময় একটি প্রশংসনীয় সুন্নত। নবীজি (সা.) অধিকাংশ সাহাবিকে হাদিয়া-উপহার দিতেন। সাহাবায়ে কেরামও নবীজিকে (সা.) উপহার দিতেন। তারা নিজেরাও পারস্পরিক উপহার আদান-প্রদান করতেন।

পারস্পরিক বন্ধন মজবুত করার জন্য উপহার আদান-প্রদান খুবই উত্তম কার্যকর পন্থা। অনেক সময় উপহার আদান-প্রদানের কারণে প্রিয়জন ও আত্মীয়স্বজনদের অসন্তুষ্টি কষ্ট খতম হয়ে যায়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, ‘পরস্পর হাদিয়া দাও, মহব্বত বৃদ্ধি পাবে।’ (আল আদাবুল মুফরাদ : ৫৯৪)। রাসুল (সা.) আরও এরশাদ করেছেন, ‘হাদিয়া দেওয়ার মাধ্যমে মহব্বত তৈরি হয় এবং ভ্রাতৃত্ব বজায় থাকে।’ (বিহারুল আনওয়ার : ৭৪/১৬৬)।

হাদিসটিতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা গেল। একটি হচ্ছে হাদিয়া প্রদানের মাধ্যমে পারস্পরিক মহব্বত তৈরি হয়। আর অপরটি হচ্ছে বন্ধুত্ব মজবুত ও দৃঢ় হয়। হাদিয়া যতই ক্ষুদ্র হোক, তাকে ঘৃণা করতে বা ছোট মনে করতে নবীজি (সা.) নিষেধ করেছেন। যদি তা উটের পায়ের ক্ষুরও হয় (তিরমিজি : ২১৩০)। হাদিয়া বিনিময়ের মাধ্যমে হিংসা বিদ্বেষ দূর হয়। যেমন রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা পরস্পরে হাদিয়া বিনিময় করো, এর দ্বারা অন্তরের সংকীর্ণতা ও হিংসা দূর হয়ে যায়।’ (মুসনাদে আহমদ : ৯২৫০)।

কিন্তু হাদিয়া দিয়ে কখনও প্রাপ্তির আশা করা বা হাদিয়া দিয়ে খোঁটা দেওয়া ঠিক নয়। হাদিয়া বিনিময় হবে সম্পূর্ণ আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির জন্য। আবার অনেকেই হাদিয়াকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। বিশেষ করে সমাজের গরিব শ্রেণির লোকজনের কাছ থেকে হাদিয়া এলে তা নিয়ে মাঝেমধ্যেই হাসিতামাশা করে এবং তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ফিরিয়ে দেয়। এগুলো একদম অনুচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যাকে সুগন্ধি দান করা হয়, সে যেন তা ফিরিয়ে না দেয়। কেননা এটি হালকা জিনিস, কিন্তু সুগন্ধযুক্ত।’ (মুসলিম : ২২৫৩)। আবার হাদিয়া ফিরিয়ে নেওয়াও জঘন্য কাজ। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে দান করে তা প্রত্যাহার করে নেয়, তার দৃষ্টান্ত এমন কুকুরের মতো, যে বমি করে ফের তা খেয়ে নেয়।’ (বোখারি : ২৫৮৯)।

হাদিয়াকে আমরা অনেক সময় ঘুষের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলি। কিন্তু হাদিয়া ও ঘুষের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। হাদিয়া স্বেচ্ছায়, সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রাখতে দিয়ে থাকে। এতে পার্থিব কোনো উদ্দেশ্য থাকে না। কোনো বিশেষ স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে হাদিয়া দেওয়া হয় না। কিন্তু ঘুষ তার ঠিক বিপরীত। ঘুষ জোর করে আদায় করা হয়। এটা পার্থিব উদ্দেশ্যের জন্যই দেওয়া হয়। এটা সম্প্রীতি নয়; বরং শত্রুতা বৃদ্ধির কারণ। ইসলামিক শরিয়া আইনের দৃষ্টিতে হাদিয়া থেকে কিছু আত্মসাৎ ও হাদিয়ার নামে ঘুষÑ উভয় সমপর্যায়ভুক্ত। ঘুষ ইসলামে হারাম, পক্ষান্তরে হাদিয়া ইসলামে সম্মানিত হালাল। তাই দুইটাকে একসঙ্গে তালগোল পাকানোর কোনো মানেই হয় না। যদিও বর্তমানে ঘুষকে কেউ হাদিয়া বলে, কেউ উপহার, উপটৌকন, সম্মানীসহ বিভিন্ন নামে গ্রহণ করছে।

আবু হুমায়দ সা’ইদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সা.) আযদ গোত্রের ইবনু উতবিয়া নামের এক লোককে সদকা সংগ্রহের কাজে নিযুক্ত করেছিলেন। তিনি ফিরে এসে বললেন, এগুলো আপনাদের আর এগুলো আমাকে হাদিয়া দেওয়া হয়েছে। রসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, সে তার বাবার ঘরে কিংবা তার মায়ের ঘরে কেন বসে থাকল না। তখন সে দেখতে পেত, তাকে কেউ হাদিয়া দেয় কি দেয় না? যাঁর হাতে আমার প্রাণ, সেই সত্তার কসম, সদকার মাল থেকে স্বল্প পরিমাণও যে আত্মসাৎ করবে, সে তা কাঁধে করে কেয়ামাত দিবসে উপস্থিত হবে। সেটা উট হলে তার আওয়াজ করবে, আর গাভি হলে হাম্বা হাম্বা রব করবে, আর বকরি হলে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করতে থাকবে। অতঃপর রসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর দু’হাত এই পরিমাণ উঠালেন যে, আমরা তার দুই বগলের শুভ্রতা দেখতে পেলাম। তিনি তিনবার বললেন, হে আল্লাহ! আমি কি পৌঁছে দিয়েছি। হে আল্লাহ আমি কি পৌঁছে দিয়েছি? (বোখারি : ২৫৯৭)। রাসুল (সা.) বলেন, প্রশাসনের ব্যক্তিরা হাদিয়া কবুল করলে চুরি বলে গণ্য হবে। (অর্থাৎ হারাম হবে) (মুসনাদে আহমাদ খ. ৫, পৃ. ৪২৪)। রাসুল (সা.) আরও বলেন, রাজা-বাদশাহদের হাদিয়া গ্রহণ করা ঘুষের অন্তর্ভুক্ত। (খতিবে বাগদাদী রচিত তালখীসুল মুতাশাবিহ খ. ১, পৃ. ৩৩১)।

আবার পারিশ্রমিককে হাদিয়া বলা যাবে না। পারিশ্রমিক হচ্ছে শ্রমের মূল্য আর হাদিয়া হচ্ছে খুশির সঙ্গে যা দেওয়া হয়। আবার পারিশ্রমিক এত বেশিও চাওয়া যাবে না, যা দেনেওয়ালা ব্যক্তির ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। আবার দেনেওয়ালা ব্যক্তিকেও পারিশ্রমিকের পরিমাণ খুবই সতর্কতার সঙ্গে ঠিক করতে হবে, যাতে দেওয়ার আগেই যেন শ্রমদানকারী ব্যক্তি চাইতে বাধ্য না হয়। আল্লাহতায়ালা আমাদের যথার্থ বোঝার ও আমল করার তৌফিক দিন। আমিন!

লেখিকা : শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত