প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২২
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ দ্বীন বা জীবন-দর্শন। বিদায় হজে আরাফার দিন আল্লাহতায়ালা মহানবী (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ করেছেন : ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করে দিলাম। (সুরা মায়েদা : ৬)। এরপর রাসুল (সা.) প্রায় তিন মাস জীবিত ছিলেন। কিন্তু বিধান সম্বলিত কোনো আয়াত উক্ত সময়ে আর নাজিল করা হয়নি। এই ঘোষণার মাধ্যমে সব উম্মতের ওপর উম্মতে মুহাম্মদ্দীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করা হয়েছে। কেননা, এতে ইংগিত রয়েছে আল্লাহতায়ালা এ উম্মতের জন্য দ্বীনকে এমনভাবে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন যে, কেয়ামত পর্যন্ত এই দ্বীনের মাঝে আর কোনো রকমের পরিবর্তন-পরিবর্ধনের প্রয়োজন নেই। যা এর আগে অন্যান্য উম্মতদের বেলায় ঘটেছিল।
তথাপি যুগে যুগে বিকৃত মস্তিষ্কের অধিকারী তথাকথিত মুক্তমনা কিছু লোক এর মধ্যে পরিবর্তন-পরিবর্ধনের চেষ্টা করে আসছে। তারা বলার চেষ্টা করছে, সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গান-বাদ্য, নিত্যচর্চার বিকল্প নেই এবং সমাজে এর প্রচার-প্রসার ঘটাতে হবে। তাদের বক্তব্যটি শুনতে মুখ রোচক হলেও প্রকৃতই এটি ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনায় তুলে ধরা হলো :
আল কোরআনে গানের প্রসঙ্গ :
এক : আল্লাহতায়ালা সুরা লুকমানে, আখেরাত প্রত্যাশী মোমিনদের প্রশংসা করার পর দুনিয়া-প্রত্যাশীদের ব্যাপারে বলেছেন, ‘আর একশ্রেণির লোক আছে, যারা অজ্ঞতাবশত খেল-তামাশার বস্তু ক্রয় করে, বান্দাকে আল্লাহর পথ থেকে গাফেল করার জন্য।’ (সুরা লুকমান : ৬)।
উক্ত আয়াতের শানে নুজুলে বলা হয়েছে যে, নজর ইবনে হারিস বিদেশ থেকে একটি গায়িকা বাদি খরিদ করে এনে তাকে গান-বাজনায় নিয়োজিত করল। কেউ কোরআন শুনার ইচ্ছা করলে তাকে গান শুনানোর জন্য সে গায়িকাকে আদেশ করত এবং বলতো; মুহাম্মাদ (সা.) তোমাদের কোরআন শুনিয়ে নামাজ, রোজা এবং ধর্মের জন্য প্রাণ বিসর্জন দেয়ার কথা বলে। এতে শুধু কষ্টই কষ্ট। তার চেয়ে বরং গান শোন এবং জীবনকে উপভোগ কর। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহতায়ালা উক্ত আয়াত নাজিল করেন। (মাআরিফুল কোরআন ৭/৪)।
সাহাবি ও তাবেয়ীদের এই আয়াতের ব্যাখ্যা :
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-কে উক্ত আয়াতের ‘লাহ ওয়াল হাদিস’-এর ব্যাখ্যা জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, তা হলো গান। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) একই কথা বলেন। তাবেয়ী সায়ীদ ইবনে যুবাইর থেকেও অনুরূপ মত বর্ণিত হয়েছে। বিখ্যাত তাবেয়ী হাসান বসরী (রহ.) বলেন, উক্ত আয়াত গান ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপারে নাজিল হয়েছে, যা বান্দাকে কোরআন থেকে গাফেল করে দেয়। (তাফসিরে ইবনে কাসির ৬/৩৪৮)।
দুই : আল্লাহতায়ালা অন্য এক আয়াতে এরশাদ করেন, আ‘র তুই (শয়তান) তাদের মধ্যে যাকে পারিস, তোর ডাকের দ্বারা বিভ্রান্ত কর।’ (সুরা ইসরা : ৬৪)। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, যে সববস্তু পাপাচারের দিকে আহ্বান করে, তাই ইবলিসের আওয়াজ। বিখ্যাত তাবেয়ী মুজাহিদ (রহ.) বলেন, ইবলিসের আওয়াজ বলতে এখানে গান ও বাদ্যযন্ত্রকে বোঝানো হয়েছে। আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, যেসব বস্তু পাপাচারের দিকে আহ্বান করে তার মধ্যে গান-বাদ্য অন্যতম। এজন্য একে ইবলিসের আওয়াজ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। (তাফসিরে ইবনে কাসীর ৫/৯৮)।
তিন : অন্য এক স্থানে আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন, ‘তোমরা কি এ কথাতেই বিস্ময় বোধ করছ? এবং হাসছ? কাঁদছ না? আর তোমরা ক্রীড়া কৌতুকে লিপ্ত আছ’ (সুরা নাযম : ৫৩-৫৯)।
উক্ত আয়াতে আরবি ‘ছামীদুন’ শব্দ ব্যবহার হয়েছে। এর ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, এর অর্থ হলো গান বাজনা। বিখ্যাত তাবেয়ী ইকরামা (রহ.) থেকেও অনুরূপ মত বর্ণিত হয়েছে। (তাফসিরে কুরতুবী ১৭/১২৩)।
সাহাবি ও তাবেয়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী গান ও বাদ্যযন্ত্র দ্বারা যেসব গোনাহ হয় :
(ক) নিফাকের উৎস। (খ) ব্যভিচারের প্রেরণা জাগ্রতকারী। (গ) মস্তিষ্কের ওপর আবরণ। (ঘ) কোরআনের প্রতি অনিহা সৃষ্টিকারী। (ঙ) আখিরাতের চিন্তা নির্মূলকারী। (চ) গোনাহের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টিকারী। (ছ) জিহাদি চেতনা বিনষ্টকারী। (ইগাছাতুল লাহফান ১/১৮৭)।
হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী গান :
গান-গায়িকা এবং এর ব্যবসা ও চর্চাকে হারাম আখ্যায়িত করে রাসুল (সা.) এরশাদ করেন- এক. তোমরা গায়িকা (দাসি) ক্রয়-বিক্রয় করো না এবং তাদেরকে গান শিক্ষা দিও না। এসবের ব্যবসায় কোনো কল্যাণ নেই। জেনে রেখ, এর প্রাপ্ত মূল্য হারাম। (তিরমিজি : ১২৮২)।
দুই. প্রিয়নবী রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো এরশাদ করেন, আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পরিবর্তন করে তা পান করবে। আর তাদের মাথার ওপর বাদ্যযন্ত্র ও গায়িকা রমণীদের গান বাজতে থাকবে। আল্লাহতায়ালা তাদের জমিনে ধ্বসিয়ে দেবেন। (সুনানে ইবনে মাজহ : ৪০২০)।
তিন. হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, আমি রাসুূল (সা.) কে বলতে শুনেছি তিনি বলেন, পানি যেমন ভূমিতে তৃণলতা উৎপন্ন করে, তেমনি গান মানুষের অন্তরে নিফাক সৃষ্টি করে। (আবু দাউদ : ৪৯২৭)।
উপরোক্ত বাণীর সত্যতা এখন দিবালোকের ন্যায় পরিষ্কার। গান-বাজনার ব্যাপক বিস্তারের ফলে মানুষের অন্তরে এ পরিমাণ নেফাক সৃষ্টি হয়েছে যে, সাহাবীদের ইসলামকে এ যুগে অচল মনে করা হচ্ছে এবং গান-বাদ্য, নারী-পুরুষের মেলামেশা ইত্যাদিকে হালাল মনে করা হচ্ছে।
চার. রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোক সৃষ্টি হবে ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল সাব্যস্ত করবে। (বোখারি : ৫৫৯০)।
পাঁচ. রাসুল (সা.) আরো এরশাদ করেন, আল্লাহতায়ালা আমাকে মোমিনদের জন্য হেদায়াত স্বরূপ প্রেরণ করেছেন এবং বাদ্যযন্ত্র, ক্রুশ ও জাহেলি প্রথা বিলোপ সাধনের নির্দেশ দিয়েছেন। (মুসনাদে আহমাদ)।
ছয়. হুজুর (সা.) এরশাদ করেন, যখন আমার উম্মত ১৫টি কাজ বেশি বেশি করতে থাকবে, তখন তাদের ওপর বিপদাপদ পতিত হতে থাকবে। সেগুলোর মধ্যে একটি হলো, নর্তকী এবং বাদ্যযন্ত্র ব্যাপক হয়ে যাবে। (তিরমিজি শরিফ : ২২১০)।
সাত. রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, দুনিয়া ও আখেরাতে দু’টি আওয়াজ অভিশপ্ত এক. গানের সঙ্গে বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ। দুই. বিপদণ্ডআপদের সময় বিলাপের আওয়াজ। (মুসনাদে বায্যার : ৭৫১৩)।
গান-বাদ্য হারাম হওয়ার ব্যাপারে এছাড়া আরো অসংখ্য হাদিস বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহতায়ালা আমাদের গান-বাদ্য মুক্ত জীবন গড়ার তৌফিক দিন- আমিন।