জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবায়ে কেরাম (রা.)

মুফতি মোজ্জাম্মেল হক রাহমানী

প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২২, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গোটা মানবজাতির মাঝে হজরত আম্বিয়ায়ে কেরাম (আ.) এর পর, মর্যাদার ক্ষেত্রে সবচেয়ে উঁচুস্থানে রয়েছেন হজরত সাহাবায়ে কেরাম (রা.)। যদিও তারা নবীদের মতো নিষ্পাপ নন, আল্লাহতায়ালার কর্মকুশলতা ও হেকমতে তাদের দ্বারা বিভিন্ন গোনাহ সংঘটিত হলেও, সেগুলো আল্লাহতায়ালা মাফ করে দিয়েছেন এবং তাদের জন্য স্বীয় সন্তোষ-সন্তুষ্টির পরোয়ানা ঘোষণা করেছেন। পবিত্র কোরআনের চার জায়গায় এসেছে, ‘আল্লাহতায়ালা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহ তায়ালার প্রতি সন্তুষ্ট।’ (সুরা মায়েদা : ১১৯, সুরা তওবা : ১০০, সুরা মুজাদালাহ : ২২, সুরা বায়্যিনাহ : ৮)।

রাসুলুল্লাহ (সা.) দশজন সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-কে জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করেছিলেন একই মজলিসে। তাদের বলা হয় আশারায়ে মুবাশশারা। হাদিস শরিফে এসেছে, হজরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ১. হজরত আবু বকর (রা.) ২. হজরত ওমর (রা.) ৩. হজরত উসমান (রা.) ৪. হজরত আলী (রা.) ৫. হজরত তালহা (রা.) ৬. হজরত জুবায়ের (রা.) ৭. হজরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) ৮. হজরত সায়াদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা.) ৯. হজরত সাঈদ ইবনে যায়েদ (রা.) ১০. হজরত আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ (রা.) জান্নাতবাসী। (আবু দাউদ : ৪৬৪৯, তিরমিজি : ৩৭৪৮)।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার হজরত জিবরাইল (আ.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! এখন খাদিজা আপনার জন্য তরকারি, খাবার বা পানীয়ের থালা নিয়ে আসছে, সে যখন আসবে তখন তার রবের পক্ষ থেকে এবং আমার পক্ষ থেকে সালাম জানাবেন এবং তাকে জান্নাতে মুক্তোর প্রাসাদের সুসংবাদ দেবেন, যেখানে কোনো শোরগোল থাকবে না এবং কোনো কষ্ট থাকবে না। (বোখারি : ৩৬০৯, মুসলিম : ২৪৩২)।

হজরত ফাতিমা (রা.) সম্পর্কে হাদিস শরিফে এসেছে, হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : হজরত ফাতিমা (রা.) হেঁটে আসছেন, তার হাঁটা ছিল হুবহু নবী (সা.)-এর মতো। নবী (সা.) বললেন : ‘আমার স্নেহের মেয়েকে মোবারাকবাদ।’ তারপর তিনি তাকে তার ডানে বা বামে বসালেন এবং তার সঙ্গে চুপিচুপি (কি যেন) কথা বললেন, (কথা শুনে) তিনি (ফাতিমা) কাঁদলেন, আমি (আয়েশা) তাকে জিজ্ঞেস করলাম : ‘তুমি কেঁদেছ কেন?’ অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.) তার সঙ্গে (আবার) চুপিচুপি (কি যেন) কথা বললেন, এবার (কথা শুনে) তিনি হাসলেন। আমি বললাম : আজকের মতো দুঃখ ও বেদনার সঙ্গে সঙ্গে আনন্দ ও খুশি আমি আর কখনও দেখিনি। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, রাসুলুল্লাহ (সা.) কী বলেছিলেন? তিনি বললেন : আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর গোপন রহস্য প্রকাশ করব না। পরিশেষে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর আমি তাকে আবার জিজ্ঞেস করলাম, তিনি কি বলেছিলেন? তিনি বললেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথমবার আমাকে বলেছিলেন, হজরত জিবরাইল (আ.) প্রতিবছর আমার সঙ্গে একবার কোরআন শরিফের দাওর করতেন (পরস্পর পাঠ করে শুনাতেন), এ বছর দু’বার দাওর করেছেন। মনে হয় আমার বিদায় কাল ঘনিয়ে এসেছে, এরপর আমার পরিবারের মধ্যে তুমিই সর্বপ্রথম আমার সঙ্গে মিলিত হবে। তা শুনে আমি কেঁদে দিলাম। দ্বিতীয়বার বলেছিলেন, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, জান্নাতবাসী মহিলাদের অথবা মোমিন মহিলাদের তুমি সরদার হবে। এ কথা শুনে আমি হেসেছিলাম। (বোখারি ৩৬২৩)।

হজরত হাসান ও হোসাইন (রা.) সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘হজরত হাসান ও হোসাইন (রা.) জান্নাতি জোয়ান-তরুণদের সর্দার-দলপতি হবেন।’ (তিরমিজি : ৩৭৬৮, নাসায়ী : ৩/৩৯০, ইবনে হিব্বান : ২২২৮, মুসনাদে আহমদ : ৩/১৬৬)।

বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবায়ে কেরাম (রা.) সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা তার নবীর ভাষায় ঘোষণা করেছেন, ‘তোমাদের যা ইচ্ছে আমল করো, আমি (আল্লাহ) তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি।’ (বোখারি : ৪৮৯০, মুসলিম : ২৪৯৪)।

হুদায়বিয়ার সন্ধিকালে যারা বাইয়াত গ্রহণ করেছিলেন, তাদের সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘আল্লাহতায়ালা মোমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, যখন তারা গাছের নিচে আপনার কাছে বাইয়াত গ্রহণ করল।’ (সুরা আল ফাতাহ : ১৮)।

হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘যারা গাছের নিচে (হুদায়বিয়ার সন্ধিকালে বাইয়াতে রিদওয়ানে) বাইয়াত গ্রহণ করেছিল, কেউই জাহান্নামে যাবে না। (আবু দাউদ : ৪৬৫৩, মুসলিম : ২৪৯৬)

এসব আয়াত এবং হাদিস থেকে এ কথা দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট যে, বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবায়ে কেরাম, বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারী সাহাবায়ে কেরাম, আশারায়ে মুবাশশারাহ ও বিভিন্ন সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবায়ে কেরাম (রা.) সবাই পেয়েছিলেন জান্নাতের সুসংবাদ। তবে একটি সংশয় থেকে যায় যে, তারা ব্যতীত অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম (রা.)ও কি জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন?

এ ব্যাপারে শাইখ আলী ইবনে খুযাইর (রহ.) লিখেছেন, ‘নির্ভরযোগ্য মতানুসারে সাহাবায়ে কেরাম (রা.) সবাই দুনিয়ায় থাকা অবস্থায় জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন। (আয্ জানাদ ফি শরহি লুমআতিল এ’তেক্বাদ : ১১৯)। এ অভিমতটিকে তিনি কয়েকটি দলিলের মাধ্যমে প্রমাণিত করেছেন।

(১) পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘আল্লাহতায়ালা সব সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-কে কল্যাণের (জান্নাতের) প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। (সুরা হাদীদ : ১০)। আল্লামা আব্দুর রহমান ইবনে নাছের আস্ সা’দী (রহ.) ওই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, এ আয়াত সাহাবায়ে কেরাম (রা.) সবার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বহন করে, আল্লাহতায়ালা তাদের ঈমানের সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং তাদের জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। (তাফসিরে সা’দী : ৯৮৯)।

(২) আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন, ‘সেদিন (কিয়ামতের দিন) আল্লাহতায়ালা নবী এবং তাঁর ঈমানদার সাথিদের (সব সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-কে) অপদস্থ করবেন না। (সুরা আত্তাহরিম : ৮)। এটা ছিল মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর জন্য আখেরাতের পূর্ণ সম্মাননা-উচ্চ মর্যাদার প্রতিশ্রুতি।

আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রহ.) লিখেছেন, হজরত হুমাইদ ইবনে জিয়াদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মুহাম্মদ ইবনে কা’বকে বললাম, হজরত সাহাবায়ে কেরাম (রা.) এর জমানার ফেতনা সম্পর্কে কিছু বলুন। তিনি বললেন, আল্লাহতায়ালা সব সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-কে ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং পবিত্র কোরআনে তাদের সবার জন্য জান্নাত ওয়াজিবের ঘোষণা দিয়েছেন। আমি বললাম, আল্লাহতায়ালা কোরআনে কারিমের কোন জায়গায় তাদের জন্য জান্নাত ওয়াজিবের ঘোষণা দিয়েছেন? তিনি বললেন কেন? তুমি সুরা তওবার এই আয়াত পড়নি? আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন, ‘মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা ঈমানে প্রথমে অগ্রগামী হয়েছে এবং যারা নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহতায়ালা তাদের সবার প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে, আল্লাহতায়ালা তাদের জন্য এমন উদ্যানরাজি তৈরি করে রেখেছেন, যার তলদেশে নহর বহমান। তাতে তারা সর্বদা থাকবে এটাই মহা সাফল্য।’

আল্লাহতায়ালা এই আয়াতে সব সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর জন্য বিনাশর্তে স্বীয় সন্তোষ-সন্তুষ্টির পরোয়ানা জারি করেছেন ও তাদের জন্য জান্নাত প্রস্তুতের ঘোষণা দিয়েছেন। তাবেয়িনদের জন্যও দিয়েছেন এই প্রতিশ্রুতি, তবে একটি শর্তসাপেক্ষে। ?হুমাইদ ইবনে জিয়াদ বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম শর্তটি কী? তিনি বলেন, তাবেয়িনদের জন্য আল্লাহতায়ালা নিষ্ঠার সঙ্গে সাহাবিদের পদাংক অনুসরণের শর্ত করে দিয়েছেন। হুমাইদ ইবনে জিয়াদ বলেন, তার কথা শুনে আমার মনে হচ্ছিল ইতিপূর্বে আমি কোনোদিন এই আয়াত পড়িনি, এর মর্মণ্ডব্যাখ্যা কোনোদিন শুনিনি, আজ মাত্র তার কাছ থেকে এ-আয়াতের মর্মণ্ডব্যাখ্যা বুঝতে পেরেছি। (আদ্ দুর্রুল মান্দুদ : ৪/২৭২)। হাফেজ ইবনে হাযম (রহ.) লিখেছেন, ‘সাহাবায়ে কেরাম (রা.) সবাই নিশ্চিতভাবে জান্নাতবাসী। (আল্ ইছাবাহ্ ফি মা’রিফাতিস্সাহাবাহ্ ১/১৯)।

সাহাবায়ে কেরামরা ছিলেন উম্মাহর শ্রেষ্ঠতম মহামানব প্রিয় নবীজি (সা.)-এর আদর্শের অবিকল নমুনা। তাঁর সংস্রব, সাহচর্য এবং ভালোবাসাধন্য। গোটা মানবজাতির জন্য হেদায়েতের অত্যুজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। হে আল্লাহ! তাদের দেখানো পথে, তাদের শেখানো মতে, তাদের ধারণকৃত পাহাড়সম বিশ্বাসের অতলান্তিকতায়, তাদের আচরিত কর্মের অবিকল সাধনায় নির্লিপ্ত থেকে আমাদেরও প্রিয় নবীজি (সা.) এর প্রিয়ভাজন হওয়ার তৌফিক দান করুন। হজরত সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের তৌফিক দান করুন। আমাদের এবং তাদের অধিষ্ঠিত করুন জান্নাতের সুউচ্চ মর্যাদায়। আমিন।

লেখক : সিনিয়র উস্তাদ, মদিনাতুল উলুম মাদ্রাসা, বসুন্ধরা, ঢাকা