আল কোরআনের চ্যালেঞ্জ ও উম্মি নবী
মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান
প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আল কোরআন আরববাসীকে সে বিষয়ে চ্যালেঞ্জ করেছে, যে বিষয়ে তাদের পাণ্ডিত্য ও শ্রেষ্ঠত্ব ছিল। যেন চ্যালেঞ্জটি সমান এবং ভারসাম্যপূর্ণ হয়। এ চ্যালেঞ্জ অর্থহীন হতো, যদি তা আরবদের বিশেষত্ব ও সক্ষমতা থেকে দূরে থাকত। তাই আল কোরআন তাদের অনুরূপ একটি কোরআন রচনা করার জন্য চ্যালেঞ্জ করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘বল যদি আল কোরআনের অনুরূপ কোরআন রচনার জন্য মানুষ এবং জিন সমবেত হয় এবং যদি তারা একে অপরকে সাহায্য করে তবুও এর অনুরূপ কোরআন রচনা করতে পারবে না।’ (সূরা ইসরা : আয়াত-৮৮)।
অপর একটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারা কি বলে এ কোরআন তার [মুহাম্মদ] রচনা? বরং এরা অবিশ্বাসী। যদি এরা সত্যবাদী হয় তাহলে এর সমকক্ষ কোনো রচনা উপস্থিত করুক না। (সূরা তুর : আয়াত-৩৩, ৩৪)। তারা অনুরূপ কোরআন রচনা করতে অক্ষম হয়ে গেল। তারপর চ্যালেঞ্জকে প্রথম দাবি কৃতবস্তু থেকে আরও অধিকতর সহজ বিষয়ের দিকে পরিবর্তন করা হলো।
অতঃপর আল কোরআনের অনুরূপ ১০টি সুরা রচনা করতে বলা হলো। এবারও তারা ব্যর্থ হলো। আল্লাহর বাণী, ‘তারা কি বলে সে এটা নিজে রচনা করেছে? বলো, তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে তোমরা এর অনুরূপ ১০টি সুরা রচনা করো এবং আল্লাহ ব্যতীত অপর যাকে পারো সাহায্যের জন্য ডেকে লও। যদি তারা তোমাদের ডাকে সাড়া না দেয়, তবে জেনে রাখো, এটি তো আল্লাহর ইলম মোতাবেক অবতীর্ণ আর তিনি ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই। তাহলে তোমরা আত্মসমর্পণকারী হবে কি?’ (সুরা হুদ : আয়াত-১৩, ১৪)।
সর্বশেষ তাদেরকে আল কোরআনের অনুরূপ একটি সুরা রচনা করতে বলা হলো। অর্থাৎ যা দ্বিতীয় চাহিদা থেকে আরও অধিকতর সহজ। তারা এবারও ব্যর্থ হলো। আল্লাহ বলেন, ‘আমি আমার বান্দার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি, তাতে তোমাদের কোনো সন্দেহ থাকলে তোমরা এর অনুরূপ কোনো সুরা রচনা করো এবং যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত তোমাদের সব সাহায্যকারীকে ডাকো। যদি তোমরা এর অনুরূপ একটি সুরা রচনা করতে না পারো, তবে কখনোই তা রচনা করতে পারবে না। তবে সে আগুনকে ভয় করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, কাফেরদের জন্য যা প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ২৩, ২৪)।
অপর একটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন : ‘তারা কি বলে সে এটি রচনা করেছে? বলো, তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সুরা রচনা করো এবং আল্লাহ ব্যতীত অপর যাকে পারো সাহায্যের জন্য আহ্বান করো, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’ (সুরা ইউনুস : আয়াত-৩৮)।
সুতরাং এই চ্যালেঞ্জ যেমনটি উল্লিখিত হয়েছে কোনো বস্তুগত চ্যালেঞ্জ ছিল না। বস্তুত তা ছিল জ্ঞান ও চিন্তাগত বিষয় সংক্রান্ত। আর এই চ্যালেঞ্জ আরবদের মাঝে তিনটি স্তরে অতিক্রান্ত হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে কোরআনের অনুরূপ একটি পূর্ণাঙ্গ কোরআন, দ্বিতীয় পর্যায়ে ১০টি সুরা, তৃতীয় পর্যায়ে মাত্র একটি সুরা রচনা করতে বলা হয়েছে। আরববাসীরা ফাসাহাত, বালাগাত এবং ইলমুল বয়ান প্রভৃতিতে শীর্যস্থানীয় হওয়া সত্ত্বেও তারা না ব্যক্তিগতভাবে আর না দলগতভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়। আর যদি তারা এই চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে সক্ষম হতো, তাহলে ওহি অবতরণের দীর্ঘ ২৩ বছর পর্যন্ত চুপচাপ বসে থাকত না। অথচ এ সময়েই ইসলামের শান-শওকত ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ চ্যালেঞ্জটি এমন ইঙ্গিতসহ বর্ণিত হয়েছে যে, রিদ্দা যুদ্ধোত্তর সময়ে মিথ্যা নবুয়তের দাবিদারদের পক্ষ থেকে কোরআন অনুকরণ করার কিছু কিছু ব্যর্থ ও অর্থহীন প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়েছে। আর তা খুব দ্রুতই নিঃশেষ হয়ে যায়। কারণ মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সব আরববাসী এমন প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ ও অনর্থক বলে অভিহিত করেছে। সে সময়কার আরববাসীরাই যখন এই কোরআনি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে ব্যর্থ, তখন অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠী তো আরও উত্তমভাবেই ব্যর্থ। তারপরও এই চ্যালেঞ্জ ছিল এবং কেয়ামত অবধি সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য বিদ্যমান আছে এবং থাকবে। এ জন্যই চ্যালেঞ্জ নিম্নোক্ত কারণে আল কোরআনের বিস্ময় প্রকাশের ক্ষেত্রগুলোর অন্যতম একটি ক্ষেত্র।
১. এ চ্যালেঞ্জ শুধু আরববাসীর জন্য নয়, বরং সমগ্র জাতির জন্য উন্মুক্ত।
২. এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার প্রয়োজন ছিল। আর প্রয়োজনীয় উপকরণ বিদ্যমান এবং একে প্রতিহত করার একান্ত প্রয়োজনও ছিল।
৩. এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার কোনোরূপ বাধা-নিষেধ ছিল না।
৪. যারা এই চ্যালেঞ্জপ্রাপ্ত হয়েছিল তারাই এর মোকাবিলা বর্জন করেছিল। সুতরাং উপরোক্ত কারণে আল কোরআন মানব রচিত কোনো গ্রন্থ নয়, এটি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানি কিতাব। তাই আল কোরআন বিস্ময়কর গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত। (ই’যাজুল কোরআন বাকিল্লানী, পৃ-১৮-২০, ২৫০-২৫২)।
রাসুল মুহাম্মদ (সা.) উম্মি ছিলেন। যখন তার ওপর ওহি অবতীর্ণ হয় তখন তিনি না পড়তে পারতেন আর না লিখতে পারতেন। তার ওপর সর্বপ্রথম অবতীর্ণ সুরা আল্লাহর বাণী, ‘পড় তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে আলাক থেকে। পড়, আর তোমার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে তা, যা সে জানত না।’ (সূরা আলাক : আয়াত-১-৫)।
যখন জিবরাইল (আ.) রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সঙ্গে কথোপকথন করেন, তখন তিনি তার কাছে পড়া তলব করেন। ‘আমি পড়তে জানি না’ রাসুলুল্লাহ (সা.) উত্তর দিলেন। প্রমাণাদি দ্বারা রাসুলুল্লাহ (সা.) এর মু’জিযাগুলো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ও দলিলগুলো অধিকতর শক্তিশালী করাই তার উম্মি হওয়ার অন্তর্নিহিত হেকমত ও রহস্য।’ (তাফসির আল-কুরতুবি, পৃ-১২১, খ--২০)।
আল কোরআনের একাধিক স্থানে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি (সা.) উম্মি ছিলেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, যারা অনুসরণ করে বার্তাবাহক উম্মি নবীর, যার উল্লেখ তাওরাত ও ইঞ্জিলে, যা তাদের কাছে আছে, তাতে লিপিবদ্ধ পায়। (সুরা আরাফ : আয়াত-১৫৭)।
আর যে লিখতে ও পড়তে পারে না তাকেই উম্মি বলা হয়। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রহ.) বলেন, ‘তোমাদের নবী (সা.) উম্মি ছিলেন। না পড়তে পারতেন, আর না লিখতে পারতেন। এমনকি গণনাও না।’ (তাফসির আল-কুরতুবি, পৃ-২৯৮, খ--৭)।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তুমি তো এর আগে কোনো কিতাব পাঠ করোনি এবং স্বহস্তে কোনো কিতাব লিপিবদ্ধ করোনি যে, মিথ্যাবাদীরা সন্দেহ পোষণ করবে। (সুরা আনকাবুত : আয়াত-৪৮)।
এই আয়াতটি তার নবুয়তের একটি প্রামাণ্য দলিল। কারণ তিনি না লিখতে পারতেন আর না পড়তে পারতেন। এমনকি কোনো আহলে কিতাবের সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। এতদসত্ত্বেও তিনি অতীত নবী-রাসুলুল্লাহ ও তাদের জাতি-সম্প্রদায়গুলোর সংবাদ প্রদান করেছেন। এতেই সব সন্দেহ-সংশয় দূরীভূত হয়ে যায়। যদি রাসুলুল্লাহ (সা.) লিখতে ও পড়তে পারতেন, তা হলে কিতাবিরা অবশ্যই সন্দেহ পোষণ করত। (তাফসির মাফাতিহুল গায়ব, রাযী, পৃ-৪৯৮, খ--৬)।
একজন উম্মি ব্যক্তির বেলায় এ কথা কী করে বিবেকসম্মত হতে পারে যে, সে নিজেই এ কোরআন রচনা করেছে। অথচ এ সময় আরবরা তার বিরুদ্ধে অপ্রত্যাশিত বিষয় প্রকাশ করতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত ছিল। যদি কোরআন ওহি না হতো, তা হলে তাতে অন্তর্ভুক্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানের তথ্যগুলো কীভাবে অবগত হলেন, যা শিক্ষা গ্রহণ ব্যতীত অবগত হওয়া অসম্ভব। এ জন্যই আল্লাহ তায়ালা বলেছেন : ‘তুমি তো এর আগে কোনো কিতাব পাঠ করোনি এবং স্বহস্তে কোনো কিতাব লিপিবদ্ধ করোনি যে, মিথ্যাবাদীরা সন্দেহ পোষণ করবে।’ (সুরা আনকাবুত : আয়াত-৪৮)।
অপর একটি সুরায় আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, তিনি উম্মিদের মাঝে একজন রাসুল পাঠিয়েছেন তাদের মধ্য থেকে, যে তাদের কাছে আল্লাহর আয়াতগুলো তেলাওয়াত করে এবং তাদের পরিশুদ্ধ করে এবং শিক্ষা দেয় কিতাব ও হেকমত; এর আগে তো এরা ছিল ঘোর বিভ্রান্তিতে। আর এটাই তার নবুয়ত এবং কোরআন যে তার কাছে প্রেরিত ওহি, তার প্রমাণ। (সূরা জুমা : আয়াত-২)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কাছে ওহি প্রেরণের বিষয়টি অস্বীকার করা সব নবী-রাসুলের কাছে ওহি আসাকে অস্বীকার করার নামান্তর। আর যে ব্যক্তি মুহাম্মদ (সা.) এর নবুয়তকে অস্বীকার করল, সে মূলত হজরত ইবরাহিম (আ.), হজরত নুহ (আ.), হজরত মুসা (আ.), হজরত ঈসা (আ.) সহ সব নবী-রাসুলকে অস্বীকার করল। সুতরাং কোরআনি বর্ণনার আলোকে একথা দৃঢ়ভাবে নিশ্চিত করতে পারি যে, আল্লাহর কাছ থেকে ওহির অস্তিত্ব সব নবী-রাসুলের নবুয়তের অস্তিত্বের বড় প্রমাণ। এ ছাড়া আল কোরআনের অনুসৃত রচনাশৈলী আল হাদিসে অনুসৃত রচনাশৈলী থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ কথা আরব-অনারব, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছেন।
সুতরাং এই কোরআন যা উম্মি নবী প্রচার করেছেন তা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। এ কারণেই আল কোরআন মু’যিজ বা বিস্ময়কর গ্রন্থ। (ই’যাজুল কোরআন, বাকিল্লানী-পৃ-৩৪, ১৩৬, ১৩৭)।
