ইসলাম ও বিজ্ঞানে তাপদাহের রহস্য

জহির উদ্দিন বাবর

প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এ পৃথিবী আল্লাহর অপূর্ব সৃষ্টি। কুদরতের মহান নিদর্শন প্রকাশ পেয়েছে তাঁর সুনিপুণ সৃষ্টিতে। সে কুদরতের ইশারায় সুসজ্জিত হয়েছে জগতের প্রতিটি বস্তু। মহান স্রষ্টা যাবতীয় উপকরণের সমাবেশ ঘটিয়েছেন সৃষ্টিকুলের জন্য। সৃষ্টির সজীবতা বাড়ার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থাই করা হয়েছে। সৃষ্টির ধারাক্রম বজায় রাখতে তিনি দান করেছেন প্রকৃতি। আবহাওয়া, জলবায়ু, দিনরাত- এ সবকিছুই প্রাকৃতিক উপাদান। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী স্বাভাবিক গতিতে চলছে দুনিয়ার সবকিছু। তিনি যেভাবে নির্দেশ করেছেন সেভাবেই সবকিছু সম্পাদিত হচ্ছে। প্রকৃতিও তাঁর আয়ত্তের বাইরে নয়। প্রকৃতি তাঁর মহান সৃষ্টির ঐশী প্রজ্ঞার নিদর্শন। সৃষ্টি জগতের জন্য একটি নেয়ামতও বটে।

প্রকৃতিতে বৈচিত্র্য আল্লাহর দান : প্রকৃতিতে আল্লাহতায়ালা বৈচিত্র্য দান করেছেন, যেন একঘেঁয়েমি ও একপেশে মনে না হয়। রাতদিন, ঠান্ডা-গরম, আলো-অন্ধকার ইত্যাদি নানা অবস্থার সৃষ্টি করেছেন। প্রকৃতিতে এ বিচিত্রতা না থাকলে দুনিয়ার ভারসাম্য বজায় থাকত না। যেকোনো এক অবস্থা কখনও সুখকর নয়। অতিমাত্রায় কিছুই মঙ্গলজনক হয় না। পৃথিবীর গতিধারায় নিত্যনতুন অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার কারণে সৃষ্টিকুল তার জীবনের পরম সার্থকতা খুঁজে পেয়েছে। দিনরাতের যেমন পরিবর্তন ঘটে, তেমনি ঋতুরও পরিবর্তন হয়। আহ্নিক গতি ও বার্ষিক গতির ফলে আবহাওয়া ও জলবায়ুতে ভিন্নতা দেখা দেয়। এজন্য কোথাও ভীষণ ঠান্ডা, আবার কোথাও প্রচণ্ড গরম বিরাজ করে। পৃথিবীর সব স্থানে এক সঙ্গে একই অবস্থা হয় না। এক মেরুতে ঠান্ডা থাকলে অপর মেরুতে থাকে গরম। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর যখন গরমে মানুষ অতিষ্ঠ, তখন ইউরোপীয় দেশগুলোতে ঠান্ডার কারণে জমে যাওয়ার অবস্থা হয়।

বাংলার ঋতু ছয় ভাগে বিভক্ত : হয়তো আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের দৃষ্টির কারণে আমাদের বাংলাদেশের প্রকৃতি খুবই সহনীয়। এখানে নাতিশীতোষ্ণু প্রকৃতি বিরাজ করে। অতিমাত্রায় শীত ও গরম পড়ে না কখনও। আবহাওয়ার পরিবর্তন অনুসারে আমাদের দেশের ঋতুকে ছয়টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। পৃথিবীর অন্য কোথাও এ ষড়ঋতুর অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। তবে স্বাভাবিকভাবে দুটি ঋতুই আমাদের দেশে বেশি অনুভূত হয়ে থাকে- গ্রীষ্ম ও শীতকাল। গ্রীষ্মকালে গরম আর শীতকালে ঠান্ডা বিরাজ করে। শীতকালে যেমন কিছুদিন অত্যন্ত ঠান্ডা অনুভূত হয়, তেমনি গ্রীষ্মকালের কিছুদিন প্রচণ্ড গরম লাগে। তবে অন্যান্য দেশের মতো প্রান্তিক অবস্থার সৃষ্টি হয় না।

গ্রীষ্মে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় : বৈশাখ ও জৈষ্ঠ এ দু’মাস আমাদের গ্রীষ্মকাল। এ সময়ে সাধারণত তাপমাত্রা বেড়ে যায়। স্থানভেদে এর তারতম্য হয়। এ সময়ে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে, তখন দিন বড় থাকে। ভূপৃষ্ঠ অনেক সময় ধরে সূর্যের তাপ পায়। এতে জমিনের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থেকে কিছুটা বেড়ে যায়। ফলে প্রচণ্ড গরম পড়ে। বৃষ্টি না হলে এর পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। খরায় সবকিছু হাহাকার করতে থাকে। মানুষসহ অন্যান্য প্রাণী গরমে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। তাপদাহের কারণে মানুষ প্রচণ্ড তৃষ্ণা ও ক্লান্তি অনুভব করে। এতে মানুষের যে কষ্ট হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আবহাওয়া পরিবর্তনের ধর্মীয় ব্যাখ্যা : বৈজ্ঞানিকরা এ অবস্থার জন্য আবহাওয়ার পরিবর্তনের কথা বললেও এর ধর্মীয় একটি ব্যাখ্যা রয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘জান্নাত ও জাহান্নাম বছরে দু-বার তার নিঃশ্বাস ফেলে। ওই সময় অধিক ঠান্ডা ও প্রচণ্ড গরম অনুভূত হয়।’ এ হাদিসের আলোকে এ কথা স্পষ্ট, স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে অধিক ঠান্ডা কিংবা গরম জাহান্নামের নিঃশ্বাস। মূলত এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, জগদ্বাসীকে জাহান্নামের ভয়াবহতার সামান্য উপলব্ধি করানো। প্রকৃত জাহান্নামের অবস্থার চেয়েও হাজার গুণ বেশি।

ঋতুর পরিবর্তনে প্রকৃতি নিরূপণ : আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় আসমান ও জমিন সৃষ্টিতে এবং রাতদিনের আবর্তনে বোধসম্পন্ন লোকদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা আলে ইমরান : ১৯০)। ঋতুর পরিবর্তনে জ্ঞানীরা নিরূপণ করতে পারেন সৃষ্টির প্রকৃতি। ক্ষয়িষ্ণু জীবনের পরোক্ষ ইঙ্গিত রয়েছে এতে। গ্রীষ্মের তাপদাহ যে পরবর্তী সময়ে অনন্ত জীবনের ভয়াবহ অবস্থার সূক্ষ্ম ইঙ্গিত তা শুধু জ্ঞানীরাই অনুধাবন করতে পারে। এর থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা জীবনের প্রবাহকে সঠিক পথে পরিচালনা করার পাথেয় সংগ্রহ করতে পারেন। এ সূক্ষ্ম ইঙ্গিতকে কাজে লাগাতে পারলে গ্রীষ্মের এ তাপদাহ আমাদের জীবনের জন্য শুভ বার্তাই বয়ে আনে।

গ্রীষ্মকাল বড় নেয়ামত : গ্রীষ্মকাল আমাদের জীবনের জন্য বড় একটি নেয়ামত হিসেবে গণ্য হতে পারে। কারণ, এ ঋতুকে বলা হয় ফলের ঋতু। নানান ধরনের ফলমূল উৎপন্ন হয় এ ঋতুতেই। জান্নাতি খাদ্য ফল মহান আল্লাহর দেওয়া অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। এমন কোনো মানুষ পাওয়া দুষ্কর, যিনি ফল পছন্দ করেন না। বৈচিত্র্যময় অসংখ্য ফলের ডালি আল্লাহ আমাদের জন্য দান করেছেন। কোরআনে এসেছে, ‘তোমাদের জন্য খেজুর ও আঙুর বাগান সৃষ্টি করেছি। এতে তোমাদের জন্য প্রচুর ফল আছে এবং তোমরা তা থেকে খাও।’ (সুরা মোমিনুন : ১৯)।

গরমের তীব্রতায় ফল পাকে : আল্লাহর অফুরন্ত নেয়ামত এ ফলের সিংহভাগই উৎপন্ন হয় গ্রীষ্মকালে। আর ফল পাকার জন্য রোদ ও গরমের খুবই প্রয়োজন। গরমের তীব্রতা বাড়লে ফলগুলোও দ্রুত পেকে যায়। মানুষের জন্য আল্লাহর নেয়ামত ত্বরান্বিত হয়। সে হিসেবে গ্রীষ্মের তাপদাহ আমাদের জীবনের জন্য রহমত বলেই গণ্য হবে। এ ঋতুর কারণেই আমরা রসে ভরা সুস্বাদু ফলের স্বাদ আস্বাদন করতে পারি। আল্লাহ কোনো দিন-কালকেই অভিশপ্ত করেননি। সাময়িক দৃষ্টিতে কোনো কোনো সময়কে আমাদের জীবনের জন্য অভিশাপ মনে হলেও এতে রহমত নিহিত। গ্রীষ্মের তাপদাহও সে নেয়ামতের একটি।

লেখক : গবেষক, প্রাবন্ধিক ও গণমাধ্যমকর্মী