ঢাকা বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

হারিয়ে ফেলা প্রাণ

তাবাসসুম মাহমুদ
হারিয়ে ফেলা প্রাণ

জীববৈচিত্র্যের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিলুপ্ত হচ্ছে নানা প্রজাতির প্রাণী। অস্তিত্ব সঙ্কট ও হুমকির মধ্যে রয়েছে প্রাণীসম্পদ। গত ২০০ বছরে বিলুপ্ত হয়েছে অন্তত ৩০০ প্রজাতির প্রাণী। ঝুঁকিতে আছে আরও শ’খানেক। প্রকৃতির প্রতি মানুষের শাসন, পরিবেশ দূষণ ও পরিবর্তিত জলবায়ুর কারণে পরিবেশ বিপর্যয় জোরালো হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। হারিয়ে যেতে পারে অতি পরিচিত প্রাণীও। আগামী কয়েক বছরে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ প্রাণী বিলুপ্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। কয়েক দশক ধরেই ধারাবাহিকভাবে কমেছে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা। ১১ বছরে ৩৩৪টি বাঘ কমেছে। বর্তমানে এ সংখ্যা ১০৬। ১৯৮০ সালের পর এ পর্যন্ত সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে ৭০টি বাঘ মারা গেছে। মানুষ-হাতি দ্বন্দ্ব বা খাদ্যের অভাবে কমেছে হাতির সংখ্যাও। সবমিলিয়ে সারাদেশে ২০০’র বেশি হাতি নেই।

বিলুপ্ত হচ্ছে নানা প্রজাতির প্রাণী : প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাকারী শকুন প্রায় বিলুপ্তির পথে। টিকে থাকা শকুনের সংখ্যা কোনোক্রমেই ৩০০’র বেশি হবে না। বৃষ্টিভেজা রাতে ঘরের পাশে এখন আর আগের মতো শোনা যায় না ব্যাঙের ডাক। ক্রমাগত বিলুপ্ত হচ্ছে ব্যাঙের নানা প্রজাতি। কমেছে কাছিমের সংখ্যাও। হারিয়ে যাচ্ছে জাতীয় পাখি দোয়েল। এখনও সুন্দরবনে অবৈধভাবে হরিণ শিকার হয়। ফলে বাঘের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতে, সংরক্ষণ ও আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবে মোট বন্যপ্রজাতির ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ আগামী কয়েক বছরে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। তাদের মতে, বিদ্যমান পরিবেশের সঙ্গে খাপ খেয়ে যে হাজারখানেক প্রজাতির বন্যপ্রাণী টিকে আছে, যারা পরিবর্তিত পরিবেশে বিপন্ন। অর্ধেক প্রজাতিই এখন কোনো না কোনো ধরনের হুমকির সম্মুখীন।

বিলুপ্তির পথে রয়েল বেঙ্গল টাইগার : বাংলাদেশের গর্বের প্রতীক রয়েল বেঙ্গল টাইগার এখন বিলুপ্তির পথে। প্রতিবছরই আশঙ্কাজনক হারে কমছে বাঘের সংখ্যা। সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে মাত্র ১০৬টি বাঘ রয়েছে। ২০০৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪৪০টি। ১১ বছরেই বাঘের সংখ্যা কমেছে ৩৩৪টি। বনবিভাগের তথ্যানুযায়ী, ১৯৮০ সাল থেকে এ পর্যন্ত চোরা শিকারি ও বনদস্যুদের হামলা, গ্রামবাসীর পিটুনি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সুন্দরবনের প্রায় ৭০টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। তাদের রেকর্ড অনুযায়ী, ১৯৮২ সালে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ৪৫৩টি। ২০০৪ সালে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৪৪০টি। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বাঘের সংখ্যা ১০৬। অন্যদিকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা পরিচালিত এক জরিপের তথ্যে বলা হয়, বাংলাদেশে বাঘের সংখ্যা ৩৬৯টি। বন সংরক্ষকদের তথ্যমতে, ক্যামেরা ক্যাপচার পদ্ধতির জরিপে বাংলাদেশ এবং ভারতীয় সুন্দরবনে ৮৩ থেকে ১৩০টি বাঘের সন্ধান পাওয়া গেছে। গড় হিসেবে বাংলাদেশ অংশে প্রকৃত বাঘের সংখ্যা সর্বোচ্চ ১০৬।

জীববৈচিত্র্যের ওপর রয়েছে যাদের প্রভাব : বন বিভাগের তথ্যমতে, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ১৪টি প্রাণীর প্রজাতি বিলুপ্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- ডোরাকাটা হায়েনা, গ্রে উলফ (ধূসর নেকড়ে), বারাশিঙা বা কাদা হরিণ, ব্ল্যাকবাক (হরিণ জাতীয়), নীলগাই, গাওর, বানটেং (এক ধরনের বুনো মোষ), বন্য জলমহিষ, সুমাত্রান গণ্ডার, জাভান গণ্ডার, ভারতীয় গণ্ডার, দেশি ময়ূর, পিঙ্ক হেডেড ডাক (পাখি) ও মিঠা পানির কুমির। প্রাণীর প্রতি মানুষের অনুভবের স্থান সেভাবে তৈরি না হওয়ায় প্রাণী হারিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। প্রাণীর প্রতি মানুষের অনুভবের জায়গা সেভাবে তৈরি হয়নি। পাখি, সাপ বা ব্যাঙ দেখামাত্রই তার দিকে ঢিল ছোড়ার প্রবণতা রয়েছে। রয়েছে শিকারের মনোবৃত্তি। প্রাণীর খাবার বা আবাসস্থল কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ মানুষ। মানুষের প্রয়োজনে প্রাণী একদিকে খাবারে পরিণত হচ্ছে, অন্যদিকে হচ্ছে ভোগ-বিলাসের সামগ্রীতে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীববৈচিত্র্যের ওপর মানুষই প্রভাব ফেলছে। দেশে কৃষিজমি বৃদ্ধি করতে বন উজাড় করা হচ্ছে। মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবেশে অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে। এ ছাড়া আবাসস্থল ও খাদ্য সঙ্কটের কারণে কমছে নানা প্রজাতির প্রাণীর সংখ্যা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত