পৃথিবীর প্রকৃত স্বরূপ

শায়খ ড. ফয়সাল বিন জামিল গাজাবি

প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দুনিয়ার অবস্থা তুচ্ছ। এর মর্যাদা নগণ্য। এখানে বিপদাপদ আসতে থাকে। দুঃখ-কষ্ট নানাভাবে বাড়ে। স্বচ্ছতা মিশে থাকে মলিনতার সঙ্গে। মিষ্টতা অনুসরণ করে তিক্ততা। দুনিয়ার শুরু কষ্ট, শেষ ধ্বংস। আগমন প্রতারণা, আর বিদায় বেদনাদায়ক। সুখ-ভোগ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ফলাফল স্থায়ী। হালাল বিষয়ে হিসাব আছে, আর হারাম বিষয়ে আছে শাস্তি। এটি সেই দুনিয়া, যা দ্রুত ধ্বংসশীল। অচিরেই শেষ হয়ে যাবে। এর গড়া সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়। বাসিন্দারা মারা যায়। সৌন্দর্য মুছে যায়। আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে ও বিলীন হয়। সবুজতাও শেষ হয়ে যায়। তারপরও কত মানুষ এর প্রতি আকৃষ্ট হয় ও ভালোবাসে! নিজের জীবন বিক্রি করে সন্তুষ্টির জন্য। এর কামনার সাগরে ডুবে যায়। শুধু এর জন্যই বেঁচে থাকে। এর পরের জীবনের কথা চিন্তা করে না। ফলে সে থাকে স্থায়ী দুশ্চিন্তায় ও অবিরাম কষ্টে।

দুনিয়া মূল্যহীন : ওহির দুই উৎস- কোরআন ও হাদিস ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার প্রকৃত সত্য তুলে ধরেছে। আল্লাহ এর তুচ্ছতা ও গুরুত্বহীনতা বোঝাতে বলেছেন, ‘জেনে রেখ, পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক, পারস্পরিক গর্ব, ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততিতে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ছাড়া কিছুই নয়। এর উপমা বৃষ্টি, যা দিয়ে উৎপন্ন শস্যাদি কৃষকদের চমৎকৃত করে। এরপর তা শুকিয়ে যায়। ফলে তুমি তা পীতবর্ণ দেখতে পাও। অবশেষে তা খড়কুটায় পরিণত হয়। পরকালে রয়েছে কঠিন শাস্তি, আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। পার্থিব জীবন প্রতারণার সামগ্রী ছাড়া কিছুই নয়।’ (সুরা হাদিদ : ২০)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি দুনিয়ার মূল্য আল্লাহর কাছে একটি মশার ডানার সমানও হতো, তাহলে তিনি কোনো কাফেরকে এক ফোঁটা পানিও পান করাতেন না।’ (তিরমিজি : ২৩২০)।

নবীজির চোখে দুনিয়া : রাসুলুল্লাহ (সা.) একবার আলিয়া অঞ্চল থেকে মদিনায় আসার পথে এক বাজার পেরুচ্ছিলেন। এ সময় তার উভয় পাশে বেশ লোকজন ছিল। যেতে যেতে তিনি ছোট কানবিশিষ্ট একটি মৃত বকরীর বাচ্চা দেখলেন। তার কান ধরে বললেন, ‘তোমাদের কেউ কি এক রৌপ্যমুদ্রা দিয়ে কিনতে আগ্রহী?’ উপস্থিত লোকেরা বলল, ‘কোনো কিছুর বদৌলতে আমরা এটা নিতে আগ্রহী নই। এটি নিয়ে কী করব?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘বিনা পয়সায় তোমরা কি নিতে আগ্রহী?’ তারা বলল, ‘এ যদি জীবিত হতো, তবু এটা দোষী। কেননা, এর কান ছোট ছোট। আর এখন তো মৃত। কীভাবে নেব?’ এরপর তিনি বললেন, ‘আল্লাহর শপথ! এটা তোমাদের কাছে যতটা নগণ্য, আল্লাহর কাছে দুনিয়া এর তুলনায় আরও বেশি নগণ্য।’ (মুসলিম : ৭৩০৮)।

দুনিয়া ধ্বংসের স্থল : বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে স্পষ্ট দৃষ্টিতে দুনিয়ার মোহ ও সাজসজ্জা থেকে সাবধান থাকে। অন্যদেরও এর ফেতনা থেকে সতর্ক করে। ফেরাউনের পরিবারের এক মোমিন সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘পার্থিব জীবন তো অস্থায়ী উপভোগের বস্তু। আখেরাতই চিরস্থায়ী আবাস।’ (সুরা মোমিন : ৩৯)। রাসুলুল্লাহ (সা.) দুনিয়া নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ ও এতে আসক্ত হওয়া থেকে সতর্ক করে বলেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের জন্য দারিদ্র্যকে ভয় করি না; বরং আশঙ্কা করি, তোমাদের সামনে দুনিয়া উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য করা হয়েছিল। তখন তোমরা এর জন্য প্রতিযোগিতা করবে, যেমন তারা করেছিল। ফলে এটি তোমাদেরও ধ্বংস করবে, যেমন তাদের ধ্বংস করেছে।’ (বোখারি : ৪০১৫)।

 

দুনিয়া নির্ভরশীল স্থান নয় : ওসমান ইবনে আফফান (রা.) বলেন, ‘দুনিয়াকে সবুজ ও আকর্ষণীয় করা হয়েছে। অনেকেই এর প্রতি ঝুঁকে পড়ে। তাই তোমরা দুনিয়ার ওপর নির্ভর করো না। কারণ, এটি ভরসাযোগ্য নয়।’ হাসান বসরি (রহ.) বলেন, ‘দুনিয়া হলো স্বপ্নের মতো অথবা চলে যাওয়া ছায়ার মতো। বুদ্ধিমানরা এর মতো জিনিসে প্রতারিত হয় না।’ অনেকের হৃদয়ে দুনিয়া পুরোপুরি প্রভাব বিস্তার করেছে। তার অনুভূতি ও বুদ্ধিকে দখল করে নিয়েছে। ফলে সে দুনিয়ার কামনা-বাসনায় ডুবে এর উপত্যকায় ধ্বংস হয়ে গেছে। এদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা তাদের দীনকে ক্রীড়া-কৌতুকরূপে গ্রহণ করে আর পার্থিব জীবন যাদের প্রতারিত করে, তাদের সঙ্গ বর্জন কর।’ (সুরা আনআম : ৭০)। ভারসাম্যপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গি দরকার : মানুষ দুনিয়ায় উদ্দেশ্য, ইচ্ছা ও পরিণামের দিক থেকে দু’ভাগে বিভক্ত। আল্লাহ বলেন, ‘যে আখেরাতের ফসল কামনা করে, তার জন্য তার ফসল বাড়িয়ে দিই। আর যে দুনিয়ার ফসল কামনা করে, তাকে এরই কিছু দিই। আখেরাতে তার জন্য কিছুই থাকবে না।’ (সুরা শুরা : ২০)। তাই দুনিয়া সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি ভারসাম্যপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ হওয়া চাই। দুনিয়ার প্রকৃত বাস্তবতা বুঝে এতে অনাগ্রহী হওয়া মানে এ নয়, সংসার ত্যাগ করতে হবে, জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হবে। বরং মোমিনকে পৃথিবী গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তার জন্য পবিত্র রিজিক ভোগ করা বৈধ। শরিয়তের সীমার মধ্যে থেকে অপচয় ও অহংকার ছাড়া হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা ও তা ব্যবহার করা তার দায়িত্ব।

দুনিয়া পরকালের ভিত্তি ও ক্ষেত্র : দুনিয়ার প্রতি মোমিনের অনাগ্রহ তাকে সংস্কার সাধন করতে উৎসাহ দেয়। তাওহিদ, ইমান ও সুন্নাহ প্রচার করতে উদ্বুদ্ধ করে। শিরক, মন্দ ও ফেতনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে প্রেরণা দেয়। দুনিয়ার নিন্দা বিষয়ে যে বর্ণনাগুলো এসেছে, সেগুলোর উদ্দেশ্য দুনিয়ার জীবন, পৃথিবী বা সময়কে নিন্দা করা নয়; বরং এতে মানুষের খারাপ কাজ, অবাধ্যতা ও আল্লাহর আনুগত্য থেকে গাফেল হয়ে যাওয়াকে নিন্দা করা। ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেন, ‘বাস্তবে দুনিয়াকে নিন্দা করা হয় না; বরং এতে মানুষের কাজকেই নিন্দা করা হয়। অন্যথায় দুনিয়াই পরকালের ভিত্তি ও তার ক্ষেত্র। এখানেই মানুষ ইমান অর্জন করে, আল্লাহকে চেনে, তাঁকে ভালোবাসে ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য তাঁকে স্মরণ করে। জান্নাতে জান্নাতবাসীরা যে উত্তম জীবন পাবে, তা আসলে তারা এখানেই যা বপন করেছে তার ফল। এটাই এর প্রশংসা ও মর্যাদার জন্য যথেষ্ট।

ভাবনার বিষয় : রাতদিনের পালাবদল, মাস ও বছরের শেষ হয়ে যাওয়া বুদ্ধিমানদের জন্য বড় শিক্ষা। জনৈক জ্ঞানী বলেছেন, ‘কীভাবে কেউ দুনিয়া নিয়ে আনন্দিত হয়, যার এক দিন তার এক মাসকে কমিয়ে দেয়, এক মাস তার এক বছরকে কমিয়ে দেয়, আর এক বছর তার পুরো জীবনকে কমিয়ে দেয়? কীভাবে সে দুনিয়া নিয়ে আনন্দিত হয়, যার জীবন তাকে তার নির্ধারিত সময়ের মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাচ্ছে, আর তার বেঁচে থাকা তাকে মৃত্যুর দিকেই এগিয়ে দিচ্ছে?

২৬ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি মোতাবেক ১২ জুন ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন- আবদুল কাইয়ুম শেখ।