গিবত যখন হারাম নয়
মাহমিয়া আলম শান্তা
প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে?’ (সুরা হুজুরাত : ১২)। পবিত্র কোরআনের এ প্রশ্নের মাধ্যমে গিবতের ভয়াবহতা এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যা মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়। ইসলামে গিবত শুধু একটি সামাজিক অপরাধ নয়; এটি এমন নৈতিক অবক্ষয়, যা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। তাই মুসলিম সমাজে গিবতকে ঘিরে এক ধরনের ভীতি ও সতর্কতা সবসময়ই বিদ্যমান। গিবতের সীমারেখা বোঝার প্রয়োজনীয়তা : ইসলামের কোনো বিধানই প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। যেমন- মিথ্যা সাধারণভাবে হারাম, কিন্তু কারো জীবন রক্ষার প্রয়োজন দেখা দিলে কিছু ব্যতিক্রম তৈরি হয়। তেমনি গিবতও মূলত হারাম হলেও শরিয়ত এমন কিছু পরিস্থিতির স্বীকৃতি দিয়েছে, যেখানে কারো দোষ বা ত্রুটি উল্লেখ করা শুধু বৈধই নয়, কখনও কখনও প্রয়োজনীয়ও। কারণ, ইসলামের উদ্দেশ্য কেবল ব্যক্তির সম্মান রক্ষা নয়; বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, সমাজকে অনিষ্ট থেকে রক্ষা করা এবং সত্যকে সংরক্ষণ করাও। বর্তমান সময়ে এ বিষয়টি নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে। কারণ, আমরা একদিকে এমন এক সংস্কৃতির মধ্যে বাস করছি, যেখানে মানুষের ব্যক্তিগত ভুল নিয়ে প্রকাশ্য চর্চা, ট্রল ও চরিত্র হননকে বিনোদনে পরিণত করা হয়েছে; অন্যদিকে আবার এমন অনেক মানুষও আছেন, যারা যেকোনো সমালোচনাকেই ‘গিবত’ বলে আখ্যা দিয়ে নিজেদের জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে রাখতে চান। ফলে গিবতের প্রকৃত সীমারেখা বোঝা জরুরি।
জুলুমের বিরুদ্ধে কথা বলা গিবত নয় : ইসলাম প্রথমেই অত্যাচারিত মানুষের কথা বলার অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ মন্দ কথা প্রকাশ করা পছন্দ করেন না; তবে যে অত্যাচারিত হয়, তার কথা ভিন্ন।’ (সুরা নিসা : ১৪৮)। একজন মজলুম যদি তার ওপর সংঘটিত জুলুমের কথা প্রকাশ করতে না পারেন, তবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথই বন্ধ হয়ে যাবে। এজন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হকদারের জন্য কথা বলার অধিকার আছে।’ (বোখারি : ২৩০৬; মুসলিম : ১৬০১)। একজন কর্মচারী তার নিয়োগকর্তার অন্যায় আচরণের অভিযোগ করবেন, একজন নারী তার স্বামীর নির্যাতনের কথা আদালতে বলবেন, একজন নাগরিক রাষ্ট্রীয় অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলবেন। এসব গিবত নয়; বরং অধিকার প্রতিষ্ঠার বৈধ প্রচেষ্টা।
প্রকাশ্য পাপাচারীর সমালোচনা বৈধতার কারণ : ইসলামি শরিয়তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বেশি ভুল বোঝাবুঝির শিকার ব্যতিক্রমগুলোর একটি হলো প্রকাশ্য পাপাচারীর সমালোচনা। একজন মানুষ যদি গোপনে কোনো গোনাহ করে এবং সে তার জন্য লজ্জিত থাকে, তাহলে তার সেই পাপ মানুষের সামনে তুলে ধরা হারাম। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি নিজেই তার পাপকে জনসম্মুখে নিয়ে আসে, সেটিকে স্বাভাবিক বা আকর্ষণীয় হিসেবে উপস্থাপন করে, অন্যদের সেই পথে উৎসাহিত করে কিংবা সমাজে তার মাধ্যমে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, তখন বিষয়টি আর নিছক ব্যক্তিগত থাকে না; বরং সামাজিক হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর কাছে মর্যাদায় নিকৃষ্ট সেই ব্যক্তি, যার অশালীন ব্যবহার থেকে বাঁচার জন্য মানুষ তার সংসর্গ পরিত্যাগ করে।’ (বোখারি : ৬০৫৪; মুসলিম : ২৫৯১)। এ হাদিসের আলোকে ইমাম বোখারি একটি অধ্যায়ের শিরোনাম দিয়েছেন ‘ফাসাদ ও সংশয় সৃষ্টিকারীদের গিবত বৈধ’।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি রয়েছে। ইসলাম কাউকে অপমান করার জন্য তার দোষ বলার অনুমতি দেয়নি; বরং মানুষকে তার অনিষ্ট থেকে রক্ষার জন্য অনুমতি দিয়েছে। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি যদি প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়ায়, প্রতারণা করে, ধর্ম নিয়ে উপহাস করে, মাদককে সংস্কৃতির অংশ হিসেবে প্রচার করে বা অন্য কোনো পাপকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করে, তাহলে তার সেই প্রকাশ্য কাজের সমালোচনা করা গিবত নয়; বরং সমাজকে সতর্ক করার একটি দায়িত্ব। আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এ নীতির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ, এখন অনেকেই নিজেদের ব্যক্তিগত পাপকে ব্যক্তিগত রাখেন না; বরং অনুসারী বাড়ানোর জন্য, জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য কিংবা তথাকথিত প্রগতিশীলতার পরিচয় দেওয়ার জন্য প্রকাশ্যে গোনাহ প্রচার করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাপকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন সেটিই আধুনিকতা, স্বাধীনতা বা ব্যক্তিত্বের প্রতীক। এ পরিস্থিতিতে নীরব থাকা অনেক সময় সমাজের জন্য আরও ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।
মানুষকে সতর্ক করার জন্য দোষ বর্ণনা : মানুষকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তির ত্রুটি উল্লেখ করাও বৈধ। বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর সম্পর্কে পরামর্শ চাইলে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি গোপন করা ইসলামের শিক্ষা নয়। ফাতেমা বিনতে কায়েস (রা.) যখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে বিয়ের পরামর্শ চাইলেন, তখন তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন, ‘একজন প্রস্তাবদাতা স্ত্রীকে প্রহার করার স্বভাবের অধিকারী এবং অন্যজন আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল।’ (মুসলিম : ১৪৮০)। নবীজি (সা.) এটিকে গিবত হিসেবে দেখেননি; বরং প্রয়োজনীয় নসিহত হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তদ্রূপ কোনো প্রতারক ব্যবসায়ী, খেয়ানতকারী, কর্মচারী বা বিভ্রান্তিকর বক্তার ব্যাপারে মানুষকে সতর্ক করাও বৈধ হতে পারে। ইসলামের ইতিহাসে হাদিস সংরক্ষণের জন্য যে ‘জারাহ ওয়া তাদিল’শাস্ত্র গড়ে উঠেছিল, সেখানে হাজারো বর্ণনাকারীর দোষ-গুণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল না কাউকে ছোট করা; বরং দীনের বিশুদ্ধতা রক্ষা করা। বৈধ সমালোচনা ও চরিত্র হননের পার্থক্য : এটিই সবচেয়ে বড় সতর্কতার জায়গা। কারণ, বৈধ গিবতের বিধানকে অনেক মানুষ নিজেদের বিদ্বেষ চরিতার্থ করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। মুসলিম বিশেষজ্ঞরা তাই স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘কোনো সমালোচনা তখনই বৈধ হবে, যখন তা সত্যভিত্তিক, প্রয়োজন সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং কল্যাণমূলক উদ্দেশ্যে করা হবে।’ ধরা যাক, একজন ব্যক্তি প্রকাশ্যে মদ্যপান করে। তাকে নিয়ে মানুষকে সতর্ক করা বৈধ হতে পারে। কিন্তু সেই অজুহাতে তার পারিবারিক জীবন, ব্যক্তিগত দুর্বলতা কিংবা অপ্রাসঙ্গিক ত্রুটি নিয়ে আলোচনা করা আর বৈধ থাকবে না। একজন আলেমের আকিদাগত ভুলের সমালোচনা করা যেতে পারে; কিন্তু তার চেহারা, পরিবার বা ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কটূক্তি করা যাবে না। একজন অত্যাচারীর জুলুম প্রকাশ করা যেতে পারে; কিন্তু তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া যাবে না। কারণ, ইসলাম সব ক্ষেত্রেই ইনসাফ ও সংযমের শিক্ষা দেয়।
সমাজের বাস্তবতা ও আফসোস : দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজে দু’ধরনের চরমপন্থা দেখা যায়। একদল মানুষ যেকোনো সমালোচনাকে গিবত বলে উড়িয়ে দেন। ফলে অন্যায় ও বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে আরেকদল মানুষ ‘সত্য কথা বলছি’র অজুহাতে মানুষের সম্মান নিয়ে খেলেন, অপমান করেন এবং চরিত্র হননে লিপ্ত হন। অথচ ইসলামের অবস্থান এ দু’প্রান্তের মাঝখানে। যেখানে সত্য বলা হবে, কিন্তু ন্যায় ও শালীনতার সীমা অতিক্রম করা হবে না। গিবত হারাম, এটি ইসলামের মৌলিক নীতি।
কিন্তু এটিও সত্য, গিবত সবসময় হারাম নয়। যখন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, সমাজকে সতর্ক করা, বিভ্রান্তি প্রতিরোধ করা কিংবা প্রকাশ্য অনিষ্টের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার প্রশ্ন আসে, তখন শরিয়ত কিছু ব্যতিক্রমের অনুমতি দেয়। তবে সেই অনুমতির চাবিকাঠি হলো নিয়তের বিশুদ্ধতা, সত্যনিষ্ঠা ও ইনসাফ।
লেখক : শিক্ষার্থী, তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
