হুসাইনের খুনিদের পরিণাম
উবাইদুল্লাহ তারানগরী
প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

হুসাইন (রা.) নবীজির কলিজার টুকরো, আদরের নাতি, জান্নাতি যুবকদের সরদার। একটি নাম, একটি সংগ্রাম। একটি ইতিহাস। জাগ্রত বিপ্লবের চিরকালীন কণ্ঠস্বর। হকের ঝাণ্ডাবাহী। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য ও শোকের বিষয়, কারবালার প্রান্তরে তাকে পরিবারসহ নির্মমভাবে শাহাদতের অমীয় সুধা পান করতে হয়। যুগ যুগ ধরে কারবালার সেই লাল স্মৃতি মানুষকে কাঁদাচ্ছে, কাঁদাবে। তার গৌরবময় ত্যাগ আলোকবর্তিকা হিসেবে চিরকাল ইতিহাসের পাতায় ভাস্বর হয়ে থাকবে। জুলুমের ইতিহাস জুলুমের ভাষা বলে : ৬১ হিজরির ১০ মহররমের বেদনাবিধুর সেই ঘটনার হোতা ও খুনিদের কী চরম শিক্ষা ও পরিণতি হয়েছিল, তা অনেকেরই অজানা। শাসক ইয়াজিদ থেকে নিয়ে সর্বনিম্ন সংশ্লিষ্ট সৈন্যও পর্যন্ত এ হত্যাকাণ্ডের দায় কখনোই এড়াতে পারে না। জুলুমের ইতিহাস জুলুমের ভাষায়ই কথা বলে। আল্লাহও তার সৃষ্টিজীবের মধ্যে এমন লোক তৈরি করেন, ফাসেক হলেও তারা শত্রুদের থেকে প্রতিশোধ নেয়। যেমন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ মন্দ লোকের মাধ্যমেও এ দীনের সাহায্য জোগাবেন।’ (বোখারি : ৪২০৩)।
মোখতার বিন আবু উবাইদ সাকাফি : মুখতার সাকাফি কুফায় ঘোষণা করেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত হুসাইন (রা.)-এর হত্যাকারীদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও হত্যা করে ভূমি পবিত্র না করা হবে, ততক্ষণ আমার জন্য পানাহার হারাম। এরপর শুরু হয় ঐতিহাসিক অ্যাকশন। আহলে বাইতের (বিশেষ করে, কারবালাপ্রান্তরে ইমাম হুসাইন ও তার পরিবার) হত্যাকারীদের দুনিয়ায় অত্যন্ত করুণ পরিণতি ও পরকালে কঠিন শাস্তির কথা ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় বর্ণনায় পাওয়া যায়।
দুনিয়াবি পরিণতি : মুখতার কাউকে জীবিত জ্বালিয়ে দেয়, কাউকে হাত-পা কেটে তড়পানো অবস্থায় ছেড়ে দেয়, কাউকে তির ছুড়ে ঝাঁঝরা করে ফেলে।
শিমার বিন জিল জাওশান : সে বসরায় পালিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু মুখতারের লোকজন তাকে খুঁজে বের করে। হাত-পা কেটে ও শিরচ্ছেদ করে নিধন করা হয়। তার মৃতদেহ কুকুরকে খাওয়ানো হয়।
খাওলি বিন ইয়াজিদ : এ নির্দয় পাপিষ্ঠ হুসাইন (রা.)-এর মাথা কেটেছিল। লোকেরা তার বাড়ি হামলে পড়ে। সে এক পর্যায়ে টুকরির নিচে আত্মগোপন করে। ফলে মুখতার তাকে জীবিত জ্বালিয়ে দেয়।
হাকিম বিন তোফায়েল : এ নরাধম আব্বাস (রা.)-এর শরীর থেকে পোশাক খুলে নিয়েছিল। ইমাম হুসাইনের প্রতি তির নিক্ষেপ করেছিল। তাকেও হত্যা করা হয়েছিল। তার মাথা বর্শার সামনে তুলে মুখতার সাকাফির সামনে আনা হয়।
জায়েদ বিন রেকাত : এ জালিম আবদুল্লাহ ইবনে মুসলিম ইবনে আকিল (রা.)-এর কপালে তির নিক্ষেপ করেছিল। তাকে ধরে এনে জীবিত জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।
আমর বিন সাবি : এ লোক গর্ব করে বলত, ‘আমি হুসাইনের কোনো সাহাবিকে হত্যা করার সুযোগ পাইনি বটে, কিন্তু তির নিক্ষেপ করে অনেককে জখম করতে সক্ষম হয়েছি।’ একে ধরে সবার সামনে বর্শার আঘাতে হত্যা করা হয়।
উবাইদুল্লাহ ইবনে জিয়াদ : ইচ্ছা করলেই সে সংঘাত এড়িয়ে চলতে পারত। অতি উৎসাহী হয়ে কালো অধ্যায় রচনায় ভূমিকা রেখেছিল। ৬৭ হিজরিতে সেনাপতি ইবরাহিম কর্তৃক সে নিহত হয়। মাথা ছিন্ন করে কুফা নগরীতে মুখতারের কাছে তাকে পাঠানো হয়। ইমাম তিরমিজি (রহ.) বলেন, ‘যখন মুখতারের সামনে ইবনে জিয়াদের কাটা মাথা রাখা হয়, তখন হঠাৎ একটি সাপ এসে তিনবার ইবনে জিয়াদের নাকের ভেতর ঢুকে পড়ে। প্রতিবার কিছুক্ষণ ভেতরে থেকে মুখ থেকে বেরিয়ে আসত।’ ইয়াজিদ ইবনে মুআবিয়া : সে যদি মুআবিয়া (রা.)-এর উপদেশ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালন করত, ইতিহাস হয়তো অন্যভাবেই লেখা হতো। সাহাবি ও মহান ব্যক্তিদের সঙ্গে নমনীয় আচরণের নির্দেশ ছিল, কিন্তু ইয়াজিদ তা মানেনি। ফলে পরোক্ষভাবে হলেও কারবালার ঘটনার মূল নির্দেশদাতা ইয়াজিদ অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এক অজ্ঞাত রোগে যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুবরণ করে। ঐতিহাসিকদের মতে, তার মৃত্যুর পর অনুসারীরা রাতের আঁধারে তাকে এমনভাবে অজ্ঞাত স্থানে কবর দেয়, যার চিহ্ন আজ পর্যন্ত কেউ পায়নি।
লেখক : ইমাম ও খতিব, ছোট দেওড়া পূর্বপাড়া জামে মসজিদ, জয়দেবপুর, গাজীপুর
