সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আমাদের করণীয়
হাফেজ মো. আল-আমিন কাজী
প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২০, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষ শান্তিপ্রত্যাশী জীব, সমাজে সুখ, শান্তি ও পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ বজায় রেখে বসবাস করতে চায়, তাই মহান আল্লাহ তায়ালা রাসুল (সা.) এর মাধ্যমে ইসলাম নামক একটি শান্তিময় জীবন ব্যবস্থা গঠন করে দিয়েছেন। এ জীবন ব্যবস্থা জীবনের সব সমস্যার সমাধান করে মানব জীবনে বয়ে আনে অনাবিল সুখ-শান্তি। পৃথিবীতে এমন মানব সমাজ নেই যে, সুন্দর জীবনযাপন করে ভালোভাবে বেঁচে থাকতে চায় না। প্রতিটি মানুষই সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে উন্নত জীবনযাপনের স্বপ্নে থাকে বিভোর।
একটি সুখী পরিবার, সুন্দর সমাজ, সুশৃঙ্খল রাষ্ট্র ব্যবস্থা উপহার দিতে কার মন দোলা না দেয়? আমাদের প্রিয় দেশটিকে শত্রুমুক্ত করে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অসংখ্য মায়ের সন্তান জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন মাতৃভূমির জন্য, তাদের রক্তের বিনিময়ে পেয়েছি প্রকৃতির সৌন্দর্যে ঘেরা প্রিয় দেশকে, তাই তো এই মাটিতে মিশে আছে অসংখ্য মনোরঞ্জন স্বপ্নের ইতিকথা। অন্যদিকে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পৃথিবীর দিগি¦দিকে পশ্চিমা বিশ্বসহ অসংখ্য সামাজিক সংগঠন, মানবাধিকার সংস্থা কাজ করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু তারপরও দেখা যায় শান্তির আবহ মিলেছে না, বরং এর বিপরীত চিত্র দেখা যায়। রাজনৈতিক নিপীড়ন, শোষণ, দুর্নীতি, সংঘাত, লুটপাট, চাঁদাবাজি টেন্ডারবাজি, অন্যায় অবিচার, বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-, মানুষের অধিকার হরণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, মাদক সেবন, ক্ষমতার অপব্যবহার, সামাজিক অবক্ষয় ইত্যাদি, যা সভ্য মানব সমাজ কখনোই এই পশুত্বপ্রবণ চিত্র দেখতে চায় না। অথচ আজ আমাদের চারপাশে এই পরিস্থিতিগুলোর কোনো না কোনোভাবে সম্মুখীন হতে হচ্ছে, মুখোমুখি হতে হচ্ছে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার, যা শান্তি প্রতিষ্ঠার মূল অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
ইসলামি মূল্যবোধের আলোকে সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনতে সবধরনের অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজন সৎসাহসী, প্রতিবাদী, প্রত্যয়ী কিছু তরুণ। কারণ, যে সমাজে অন্যায়ের প্রতিবাদ হয় না, সে সমাজে মানবতার ওপর নেমে আসে ভয়াল অন্ধকার, অন্যায়-অবিচার মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে যায়, যা থেকে শান্তি বিনষ্ট হয়।
হজরত ওমর ফারুক (রা.) ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা মনোনীত হওয়ার পর মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলেছেন, ‘আমি যদি তোমাদের আল্লাহর পথে পরিচালিত না করি, তাহলে তোমরা কী করবে?’ একবার-দুইবার-তিনবারের পর একজন যুবক উঠে দাঁড়িয়ে তরবারি উঁচিয়ে বলল, ‘এই তরবারি আপনাকে সোজা করবে।’ হজরত ওমর (রা.) শুকরিয়া আদায় করে বলেন, ‘ওই জাতি কখনও পথভ্রষ্ট হবে না, যে জাতির মধ্যে এমন সৎসাহসী তরুণ রয়েছে।’ হ্যাঁ, এটাই অন্যতম মন্ত্র। সমাজশুদ্ধির জন্য তরুণদের মধ্যে সততা, সৎসাহসিকতা ও নৈতিকতা জাগ্রত করার বিকল্প নেই। সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আরও যেসব কাজ করা যেতে পারেÑ
ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া : পবিত্র কোরআন এবং হাদিসে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন জোরদার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা এসেছে, আর তা হলোÑ শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইসলামি ভ্রাতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্য বজায় রাখতেই আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই মোমিনরা পরস্পর ভাই ভাই।’ (সুরা হুজরাত : ১০)।
দেশ-কাল-ভাষা-বর্ণের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে এ ভ্রাতৃত্ব ছড়িয়ে পড়ে দূর-বহুদূর। কোনো পূর্বপরিচিতি নেই, একজন অন্যজনের ভাষাও বোঝে নাÑ এমন দু’জন মোমিনও যখন ঈমানের দাবিতে একত্রিত হয়, তখন মুহূর্তেই যেন তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও ভালোবাসা। ভাষার সীমাবদ্ধতা, দেশের ভিন্নতা এক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, পবিত্র কোরআনের ঘোষণাÑ কোরআনুল কারিমে বলা হয়েছে, ‘তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো : তোমরা ছিলে পরস্পর শত্রু এবং তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতির সঞ্চার করেন, ফলে তার অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই হয়ে গেলে।’ (সুরা আলে ইমরান : ১০৩)।
সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করা : একটি সমাজকে অনুপম সৌন্দর্যের চাদরে আবদ্ধ করতে হলে সৎকাজে আদেশের বিকল্প নেই, অন্যদিকে অসৎকাজের প্রতি উৎসাহ প্রদান করলে সমাজে জুলুম-অনাচার বেড়ে সমাজের শৃঙ্খলাবোধ বিনষ্ট হয়, এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেনÑ ‘এখন তোমরাই দুনিয়ায় সর্বোত্তম দল। তোমাদের কর্মক্ষেত্রে আনা হয়েছে মানুষের হেদায়েত ও সংস্কার সাধনের জন্য। তোমরা ভালো কাজের নির্দেশ দিয়ে থাকো, দুষ্কৃতি থেকে বিরত রাখো এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনো।’ (আলে ইমরান : ১১০)। মোমিনের গুণাবলির মধ্যে এটি অন্যতম, নিজেও সৎকাজ করবে এবং মানুষকেও সর্বদাই সত্যের পথে আহ্বান করবে।
কারও ওপর জুলুম না করা : ন্যায়বিচারের বিপরীত হলো জুলুম, অর্থাৎ কারও প্রতি অবিচার করাই হলো বড় জুলুম। অবিচারের মাধ্যমে নিরপরাধ ব্যক্তিদের তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। ইসলামে জুলুম মস্তবড় অন্যায় বলে বিবেচিত। ইসলাম সব সময় জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ইসলাম বলেছে, আল্লাহর হক আদায় না করলে আল্লাহ ক্ষমা করলেও বান্দার হক বিনষ্টকারীকে আল্লাহ কখনও ক্ষমা করবেন না যতক্ষণ না যার ওপর জুলুম করা হয়েছে, সে ক্ষমা করে দেয়। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে আমার বান্দা, আমি নিজের ওপর জুলুম হারাম করেছি এবং তোমাদের জন্যও একে হারাম করেছি। অতএব তোমরা একে অপরের ওপর জুলুম করো না।’ (মুসলিম : ৬৭৪০)।
ইনসাফ করা : ইসলামের পরিভাষায় কোনো বস্তু তার হকদারদের মধ্যে এমনভাবে বণ্টন করে দেওয়া, যাতে কারও ভাগে বিন্দুমাত্র কম-বেশি না হয়। এর নাম আদল বা ন্যায়বিচার। আর আদল বা ন্যায়বিচার করার প্রক্রিয়াটাকেই বলে ইনসাফ। অর্থাৎ ন্যায়বিচার করাটাই হলো ইনসাফ। এই সম্পর্কে পবিত্র কোরআনুল কারিমে বলা হয়েছে, ‘হে ঈমানদাররা, তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সঙ্গে সাক্ষ্যদানকারী হিসেবে সদা দ-ায়মান হও। কোনো কওমের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদের কোনোভাবে প্ররোচিত না করে যে, তোমরা ইনসাফ করবে। তোমরা ইনসাফ কর, তা তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় তোমরা যা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।’ (সুরা মায়েদা : ৮)।
জবাবদিহিতার মানসিকতা তৈরি করা : সমাজে প্রতিটি মানুষকে তার কর্মফলের জন্য নিজেই দায়ী হবে। পার্থিব জীবন শেষে কেয়ামতের মাঠে প্রত্যেককে নিজ নিজ কর্মের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে। ঠিক তেমনি দুনিয়ায়ও যে কোনো বিষয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হলে যথাযথভাবে তা আদায় করতে হবে। দায়িত্বের মধ্যে কোনো ধরনের গাফিলতি এবং অনাকাক্সিক্ষত ভুল করলে জবাবদিহিতার মানসিকতা তৈরি করতে হবে, তবেই আশাব্যঞ্জক হারে অপরাধপ্রবণতা কমতে থাকবে। একজনের অন্যায়, অপকর্মের জন্য অন্য কাউকে দায়ী করা যাবে না। যেমনÑ আত্মীয়স্বজন, বংশপরম্পরা। মানুষকে নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য অত্যন্ত সুষ্ঠু ও স্বচ্ছতার সঙ্গে যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
সুশিক্ষার বিস্তার ঘটানো : সমাজকে সুন্দরভাবে গড়তে হলে আগে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। আদর্শ মানুষ তৈরি করতে শিক্ষার বিকল্প নেই। তাই একজন মুসলমানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো সে নিজে এলেম শিখে তদনুযায়ী আমল করবে।
কারণ এলেম শেখার সঙ্গে ইসলামি নৈতিক শিক্ষা অর্জন হয়। মহান আল্লাহ তায়ালা দ্বীনি শিক্ষাকে সব নর এবং নারীর ওপর ফরজ করে দিয়েছেন। হাদিস শরিফে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনÑ ‘যে কেউ ইলমের খোঁজে কোনো পথে চলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।’ (মুসনাদে আহমদ : ১৪/৬৬)।
উপরোল্লেখিত মৌলিক করণীয়গুলো যদি সঠিকভাবে আমরা পালন করি, তবে আশা করা যায় আমাদের মাঝে সুদিন আবারও ফিরে আসবে। সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে সবাইকে একযোগে সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণার্থে কাজ করে যেতে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের উপরোক্ত আলোচনা বুঝে আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : শিক্ষার্থী, বিএ অনার্স (ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ), চাঁদপুর সরকারি কলেজ
