ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাই হবেন ব্যাংকের মালিক : নতুন অধ্যাদেশ জারি
প্রকাশ : ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমকে আরও সুসংহত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের মালিকানা নিশ্চিত করতে ‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। নতুন এই আইনের ফলে এখন থেকে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতারা শুধু গ্রাহক হিসেবেই নয়, বরং ব্যাংকের মালিক হিসেবেও অংশীদারিত্ব পাবেন। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ বিভাগ থেকে গতকাল এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশিত হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার আইন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম এ তথ্য জানান।
নতুন অধ্যাদেশ বলে দেশে ৫০০ কোটি টাকা অনুমোদিত মূলধনে গঠিত হবে ‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক’, যার অন্তত ৬০ শতাংশ মালিকানা থাকবে সাধারণ ঋণগ্রহীতাদের হাতে। একই সাথে এই বিশেষ আইনের মাধ্যমে ব্যাংকটিকে একটি ‘সামাজিক ব্যবসায়’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে, যেখানে ব্যক্তিগত লভ্যাংশের পরিবর্তে অর্জিত মুনাফা পুনরায় সামাজিক ও দারিদ্র্য বিমোচন খাতে ব্যয় করতে হবে। এই অধ্যাদেশ মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৬ নামে অভিহিত হবে।
ব্যাংক প্রতিষ্ঠা ও মূলধন কাঠামো : ব্যাংক প্রতিষ্ঠা ও মূলধন বিষয়ে অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের (লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ) কাছে থেকে লাইসেন্স গ্রহণ করে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার জন্য এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা যাবে। ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন হবে ৫০০ কোটি টাকা আর প্রারম্ভিক পরিশোধিত মূলধন হবে অন্যূন ২০০ কোটি টাকা।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, এই ব্যাংকের অন্তত ৬০ শতাংশ মূলধন আসবে ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে। তবে দেশে গঠিত কোনো ‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক’ স্টক এক্সচেঞ্জ ব্যবসায় তালিকাভুক্ত হতে পারবে না।
পরিচালনা পর্ষদ যেমন থাকবে : পরিচালনা বোর্ডের কাঠামো বিষয়ে অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ড হবে ৯ সদস্যের। এর মধ্যে ৪ জন পরিচালক ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হবেন। এছাড়া ৩ জন মনোনীত পরিচালক, ২ জন স্বতন্ত্র পরিচালক এবং ভোটাধিকারবিহীন একজন পদাধিকারবলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকবেন। কোনো পরিচালক একাদিক্রমে দুই মেয়াদের বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।
অধ্যাদেশে এই ব্যাংককে একটি ‘সামাজিক ব্যবসায়’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। সামাজিক ব্যবসায় ও লভ্যাংশ নীতি বিষয়ে অধ্যাদেশে আরও বলা হয়েছে, বিনিয়োগকারীরা তাদের মূল বিনিয়োগের অতিরিক্ত অর্থ লভ্যাংশ হিসেবে পাবেন না। তবে সাধারণ ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষেত্রে এই বিধিবিধান শিথিলযোগ্য রাখা হয়েছে, যাতে তারা বিনিয়োগের সুফল পেতে পারেন। অবশিষ্টাংশ নীট মুনাফা সামাজিক খাতে ব্যবহারের বিধান রাখা হয়েছে।
এই ব্যাংকের প্রধান কার্যাবলী নিয়ে অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, নতুন উদ্যোক্তাদের আত্মণ্ডকর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনে ঋণ দেওয়া হবে; আমানত গ্রহণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় বিনিয়োগের জন্য ‘উদ্যোগ মূলধন’ প্রদান; ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বিনা ফিতে কারিগরি ও প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান এবং শিল্প ও কৃষিজাত পণ্য, গবাদিপশু এবং যন্ত্রপাতির জন্য ঋণ সহায়তা দেওয়া হবে। ঋণ আদায় বিষয়ে অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, খেলাপিঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে এই ব্যাংক ‘অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩’ অনুসরণ করতে পারবে। তবে ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে সামাজিক সংবেদনশীলতা রক্ষা করতে হবে এবং কোনো প্রকার জবরদস্তি বা অবমাননাকর পদ্ধতি অবলম্বন করা যাবে না।
অধ্যাদেশে অনুযায়ী? বাংলাদেশ ব্যাংক এই ব্যাংকের লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করবে এবং প্রয়োজনে এর পরিচালনা বোর্ড বাতিল বা চেয়ারম্যান-পরিচালককে অপসারণের ক্ষমতা রাখবে।
ব্যাংকের সকল কার্যক্রম ‘ব্যাংক-কোম্পানী আইন, ১৯৯১’ এবং ‘মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি আইন, ২০০৬’ এর সংশ্লিষ্ট বিধানাবলি দ্বারাও নিয়ন্ত্রিত হবে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে সরকার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই অধ্যাদেশটি কার্যকর করার তারিখ নির্ধারণ করবে বলে অধ্যাদেশে উল্লেখ রয়েছে।
