যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা প্রভাব ফেলছে বিশ্ববাজারে

* হামলার কারণে কিছু বড় তেল কোম্পানি ও শীর্ষ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হরমুজ প্রণালী দিয়ে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবহন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে

প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

গত শনিবার ইরানে যৌথ হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল, যার লক্ষ্য ছিল দেশটির নেতৃত্ব। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য নতুন সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, এই হামলা একটি নিরাপত্তা হুমকি দূর করবে এবং ইরানিদের তাদের শাসকদের অপসারণের সুযোগ দেবে। এই হামলার ফলে তেল-উৎপাদনকারী উপসাগরীয় আরব দেশগুলো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে এবং উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। তেহরান পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। ইরান একটি বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ এবং তেলসমৃদ্ধ আরব উপদ্বীপের বিপরীতে প্রণালী হরমুজ অবস্থিত। বিশ্বব্যাপী প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ এই প্রণালী দিয়েই যায়। সংঘাতের কারণে সরবরাহ সীমিত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যেতে পারে।

ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেল গত শুক্রবার ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৩ ডলারে লেনদেন হয়, যা এ বছর এরই মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। গত শনিবার বিভিন্ন বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান সূত্র জানায়, হামলার কারণে কিছু বড় তেল কোম্পানি ও শীর্ষ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হরমুজ প্রণালী দিয়ে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবহন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে।

ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের প্রধান উদীয়মান বাজার অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম জ্যাকসন বলেন, সংঘাত সীমিত থাকলেও ব্রেন্টের দাম প্রায় ৮০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে, যা গত জুনে ইরানের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় সর্বোচ্চ ছিল। তবে সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন ঘটলে তেলের দাম ১০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ০.৬ থেকে ০.৭ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে।

সর্বত্র তীব্র ওঠাণ্ডনামা : এই সংঘাত বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়াতে পারে। এ বছর ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং প্রযুক্তি খাতের বড় পতনের কারণে বাজার এরই মধ্যে ব্যাপক দোলাচলে রয়েছে। ওয়াল স্ট্রিটের ভীতির সূচক ভিআইএক্স সূচক এ বছর এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছে এবং মার্কিন বন্ডের অস্থিরতাও প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে। মুদ্রাবাজারও প্রভাবমুক্ত থাকবে না বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। জুনের যুদ্ধে ডলার সূচক প্রায় ১ শতাংশ কমেছিল, যদিও কয়েক দিনের মধ্যে তা পুনরুদ্ধার হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং তেল সরবরাহ ব্যাহত হলে মার্কিন ডলার অধিকাংশ মুদ্রার বিপরীতে শক্তিশালী হতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানির নিট রপ্তানিকারক দেশ, ফলে তেলের উচ্চমূল্য থেকে তারা উপকৃত হতে পারে। তবে জাপানি ইয়েন ও সুইস ফ্রাঁর মতো নিরাপদ মুদ্রা তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে থাকতে পারে। ইসরায়েলের শেকেলও বড় ওঠাণ্ডনামার মুখে পড়তে পারে। অতীতে সংঘাতের সময় শেকেল দ্রুত পড়ে গেলেও পরে দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তবে বাজারে ঝুঁকির প্রিমিয়াম দীর্ঘস্থায়ী হলে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।

নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝোঁক : সংকটকালে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝোঁকে। সুইস ফ্রাঁ, যা অস্থিরতার সময় নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত, আরও শক্তিশালী হতে পারে। এতে সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের জন্য চাপ তৈরি হতে পারে। এ বছর এটি ডলারের বিপরীতে ৩ শতাংশ বেড়েছে। স্বর্ণের দাম ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ২২ শতাংশ বেড়েছে এবং রূপার দামও ঊর্ধ্বমুখী। মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের চাহিদা বাড়তে পারে, যা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কমছিল।

অন্যদিকে, বিটকয়েনকে এখন আর নিরাপদ সম্পদ হিসেবে দেখা হয় না। গত শনিবার এটির দাম ২ শতাংশ কমেছে এবং গত দুই মাসে এক-চতুর্থাংশের বেশি মূল্য হারিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের বাজারের দিকে নজর : গতকাল

রোববার সৌদি আরব ও কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের শেয়ারবাজারে লেনদেন বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের প্রাথমিক ইঙ্গিত দেবে। যদিও এসব বাজার তেলের দামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত, সংঘাত তীব্র হলে অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত অব্যাহত থাকলে উপসাগরীয় শেয়ারবাজার ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত পড়তে পারে। সৌদি আরবের প্রধান শেয়ার সূচক এরই মধ্যে টানা দুই সপ্তাহ পতনে রয়েছে। দুবাইয়ের প্রধান বাজারও গত দুই সপ্তাহে নিম্নমুখী ছিল।

বিমান ও প্রতিরক্ষা খাত : গত শনিবার বৈশ্বিক বিমান সংস্থাগুলো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ফ্লাইট বাতিল করেছে। সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে এবং আরও আকাশপথ বন্ধ হলে এ খাতের শেয়ার চাপে পড়তে পারে। অন্যদিকে, ইউরোপীয় অস্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের চাহিদা বাড়তে পারে। এ বছর প্রতিরক্ষা খাতের শেয়ার এরই মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে।

সারসংক্ষেপ : যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাত বিশ্ববাজারে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তেলের দাম, মুদ্রা বাজার, স্বর্ণ, বন্ড, মধ্যপ্রাচ্যের শেয়ারবাজার, বিমান ও প্রতিরক্ষা খাত- সবখানেই অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। সংঘাত কতটা বিস্তৃত ও দীর্ঘস্থায়ী হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ।